চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

১৮ নভেম্বর, ২০১৯ | ২:০৫ পূর্বাহ্ণ

বৈশাখী বড়–য়া

শিশু সম্ভাবনাময় পূর্ণাঙ্গ মানব সত্তা

আজ যে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হলো, সে মূলত জন্ম নিয়েছিল আরও নয় মাস আগে। মাতৃগর্ভে সে এই নয় মাসে বেশ খানিকটা বেড়ে উঠেছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তিত্ব এবং অনেকগুলো সুপ্ত গুণ ও ক্ষমতা নিয়ে। অনেক যত্ন ও পরিচর্যার মধ্য দিয়ে এসব গুণের পরিস্ফুটন ঘটাতে হবে।
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-
‘কোলে তুলে লও এরে এ যেন কেঁদে না ফেরে,
হরষেতে না ঘটে বিষাদ
বুকের মাঝারে নিয়ে পরিপূর্ণ প্রাণ দিয়ে
ইহাদের কর আশীর্বাদ।’

কিন্তু বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। এখনো অনেকেই বলেন ‘যেদিন থেকে শিক্ষকের হাতের বেত উঠে গেছে সেদিন থেকে শিক্ষার মান কমে গেছে।’ তারা এও বলেন, আমাদেরকে মা বাবা মেরেছেন, শিক্ষক-শিক্ষিকা পিটিয়েছেন আমরা কি লেখাপড়া শিখিনি? এক্ষেত্রে আমার একটি প্রশ্ন এই আমাদেরই বিরাট একটা অংশ এখন চোর-ছ্যাচর থেকে শুরু করে সন্তানকে স্কুলে ভর্তিচ্ছুক মা কেও শুধুমাত্র সন্দেহের বশবর্তী হয়ে মেরে ফেলছি গণপিটুনি দিয়ে, কোথাও একজন ছিচ্কে চোর ধরা পড়লে তাকে বেঁধে পেটাতে আমরা ওস্তাদ, আমরা যে লেখাপড়া শিখেছি তা সত্যিই কি আমাদেরকে যথার্থ মানুষ করতে পেরেছে?

বলছিলাম শিশুর কথা। সাধারণভাবে একটা কথা অনেককেই বলতে শোনা যায়, শিশু হচ্ছে কাদামাটির মতো তাকে যে ছাঁচে ফেলা হবে সেভাবেই সে গড়ে উঠবে। অনেকের ধারণা শিশুরা অক্ষম ও অপরিপূর্ণ, সে কিছু বোঝে না। শিশুকে তারা তুলনা করেন ফাঁকা কলসির সাথে। অনেকে মনে করেন শিশুরা খালি স্লেট, তাদের গড়ে ওঠা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে পরিবেশের উপর। আবার কেউ কেউ বলেন শিশুদের কঠিন শাসন ও নিয়মের মধ্যে রেখে তাকে আদব-কায়দা ও সামাজিকতা শিখিয়ে তার শান্ত স্বভাব গঠন করতে হবে।

শিশু সম্পর্কে এই নেতিবাচক ধারণাগুলো মূলত খুবই প্রাচীন। আঠারো শতকে ফরাসী দার্শনিক জ্যাঁ জ্যাক রুশো একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণা প্রবর্তন করেন। তাঁর মতে, শিশুরা হচ্ছে নিষ্পাপ মানব সম্প্রদায় বা হড়নষব ংধাধমব শিশুরা তাদের নিজস্ব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং প্রবণতা নিয়েই জন্মগ্রহণ করে যা সময়ের সাথে সাথে প্রকাশ পেতে থাকে। শিশুরা বড়দের ছোট সংস্করণ নয়, বরং তারা একটি স্বতন্ত্র ও পরিপূর্ণ সত্তা। শিশুরা অবুঝ ও অশান্ত নয় বরং তারা অনেক বেশি সম্ভাবনাময়। সৃজনশীল ও সক্রিয়।

শিশুদের একটি নিজস্ব চেতনা ও নিজস্ব জগৎ রয়েছে। যা তাকে তার মতো করে ভাবতে ও কাজ করতে উৎসাহিত করে। প্রতিটি শিশুই তার এই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে একে অপরের থেকে আলাদা। শিশুর চিন্তা আচরণ ও চাহিদা ভেদে তাদের নিজস্ব কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। যেমন শিশুরা চঞ্চল, সৃজনশীল, আনন্দপ্রিয় ও কৌতুহলী হয়। এরা খেলা, খেলনা ও
নানারকম কাজ করতে পছন্দ করে। শিশুদের প্রধান দুটি চাহিদা হলো- ভালোবাসা পাওয়া ও বড়দের কাছে গ্রহণীয় হওয়া এবং অনুসন্ধান করা, নানারকম কাজ করা ও নিজস্ব সত্তাকে প্রকাশ করা।

আমাদের সবার শিশুদের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা রাখতে হবে। বয়স ও বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী শিশুর ভিন্নতাকে বুঝে সে অনুযায়ী শিশুর শিখন ও বিকাশকে নিশ্চিত করতে হবে। শিশু করতে করতে ও খেলতে খেলতে শেখে। নতুনকে জানার আগ্রহ বা কৌতুহল তার শিখনের মূল চালিকাশক্তি আর খেলা হলো সুখকর শিখন অভিজ্ঞতা। শেখার অত্যাবশ্যকীয় ও কার্যকরী উপায় হলো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিভিন্ন কাজ তথা পর্র্যবেক্ষণ, অনুসন্ধান, চিন্তা ও কল্পনা। শিশুরা সবচেয়ে ভালোভাবে কোন কিছু শেখে যখন সে একটি নিরাপদ, আরামদায়ক, আনন্দময় ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ পায়।

শিশুকে শেখানোর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তার সাথে যোগাযোগ স্থাপন। শিশুদের চোখে চোখ রেখে কথা বলা, নাম ধরে ডাকা, হাসিমুখে থাকা, সহজ ভাষায়, ধীরে ধীরে ও সরাসরি কথা বলা, শিশুর কথা বলার মাঝখানে কথা না বলা প্রভৃতি শিশুর সাথে ভাব বিনিময়ের প্রধান শর্ত। শিশুকে প্রশ্ন করার ব্যাপারেও কিছু বিষয় লক্ষণীয়। শিশুকে এমন প্রশ্ন করতে হবে যাতে সে চিন্তা করার সুযোগ পায়। যেমন তুমি কোথায় বেড়াতে যেতে চাও? এই জায়গাটা তোমার কেন ভালো লাগে? সর্বোপরি শিশুর বিকাশ হতে হবে সার্বিক ও সমন্বিত। প্রতিটি শিশুর সঠিক ও পরিপূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করা একটি উন্নত জাতি গঠনের প্রধান পূর্বশর্ত। কেননা শিশু অফুরন্ত সম্ভাবনাময় একটি পূর্ণাঙ্গ মানব সত্তা।

তথ্যসূত্র : ‘শিশু’-মোহাম্মদ ফেরদাউস খান,
খাতেমন আরা বেগম

লেখক : সহকারি শিক্ষক, বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 356 People

সম্পর্কিত পোস্ট