চট্টগ্রাম সোমবার, ০১ মার্চ, ২০২১

সর্বশেষ:

১৮ নভেম্বর, ২০১৯ | ২:০৫ পূর্বাহ্ণ

মো. সেলিমুজ্জামান মজুমদার

ডিজিটাল মাল্টিমিডিয়া ক্লাসে সৃজনশীলতা বাড়ে

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন উইং কর্তৃক একুশ শতকের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষার গুণগত ও মানসম্মত শ্রেণি কার্যক্রম বজায় রাখার জন্য সরকারি-বেসরকারী স্কুল-কলেজ-মাদরাসাসহ কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করে পাঠ উপস্থাপন এবং তা’ ক্লাস চলাকালীন গগঈ অঢ়ঢ়ং এর মাধ্যমে মোবাইলে রিপোর্ট প্রদান করার জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। বিষয়টি আমাদের নিকট বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী বলেই মনে হচ্ছে যাকে আমরা স্বাগত জানাই। শিক্ষাদান এবং শিক্ষা গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শ্রেণিকক্ষ এমন একটি পবিত্র স্থান যেখানে বিধাতার রহমত, বরকত ও জ্ঞান হরদম বর্ষণ হয়। এ জ্ঞানময় স্থানটি তে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম কার্যক্রমযুক্ত হলে শ্রেণিপাঠদান, শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণ প্রক্রিয়ায় জাদুর সৃষ্টি হবে, এতে কোন সন্দেহ নেই সেজন্যই আমরা সরকারের এমন চমক সৃষ্টিকারী পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাই। কারণ, এ পদ্ধতিতে প্রত্যেকের সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়।

শিক্ষা মানুষের মেরুদন্ড যা ছাড়া মানুষের উন্নতি আশা করা যায় না। অথচ, এদেশের শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণ পদ্ধতি বিশেষ করে শ্রেণি পাঠদান পদ্ধতি মান্ধাতা আমলের ধারায় চলছিল বলে শ্রেণি পাঠদানে উৎকর্ষ সাধিত হয় নি। সাম্প্রতিককালে এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুলে দিয়েছে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুমে শ্রেণি পাঠদান ও পাঠগ্রহণ কার্যক্রম। সৃজনশীল প্রশ্নোত্তরের জন্য এ পদ্ধতি খুবই কার্যকর ও সময়োপযোগী যা অংশগ্রহণকারী মাত্রই উপলব্দি করতে পারবেন। আগেই বলেছি যে, শিক্ষাই মানবজাতির মেরুদন্ড। তাই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে প্রথমেই শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন যা কর্তৃপক্ষ করেছেন। মাল্টিমিডিয়া ক্লাস উপস্থাপনের জন্য ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করে পাঠ উপস্থাপন করতে হয়। তাই শিক্ষকের বক্তব্য বা লেকচার ভিডিও করে লেপটপের মাধ্যমে দেয়ালের সাদা পর্দায় প্রদর্শন করা যায়। এতে শিক্ষার্থীদের সহজেই মনোযোগ আকর্ষণ করা যায়। বলা বাহুল্য যে, কোন শিক্ষকের শারীরিক সমস্যা থাকলেও এ পদ্ধতিতে সহজে কাজ সমাধান করা যায়। ইন্টারনেট সংযোগ করে এ পদ্ধতিতে কম্পিউটারের মাধ্যমে ঘরে বসেও শিক্ষা গ্রহণ করা যায়। হাতের লেখা হিজিবিজি হলে কিংবা ছবি আঁকতে না জানলেও সমস্যা নেই। পাঠ্যবইকে যদি ওয়েবসাইটে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে নিজস্ব বই না থাকলেও লেপটপের মাধ্যমে তা পড়ে নেওয়া যায়। মজার বিষয় হলো, শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের ফলে শিক্ষাকে খুব সহজেই সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এতে করে, ঘরে বসেই যে কেউ সারা বিশে^র যেকোনো লাইব্রেরির যে কোনো বই পড়তে পারে। এ পদ্ধতিতে এককথায় দাদাগিরি করা যায়।

প্রযুক্তির আশির্বাদ কুঁড়িয়ে নেওয়ার জন্য ইচ্ছা, আগ্রহ, যোগ্যতা ও সামর্থ্য শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণ প্রক্রিয়াকে সমৃদ্ধ করতে পারে। পড়–য়াদের প্রয়োজনীয় উদাহরণ, চিত্র, তথ্য, প্রিয়বিষয় ও শিক্ষকের লেকচার, খবরপত্র, ম্যাগাজিন, কৌতুক, পাঠ্যক্রম তৈরি, ভর্তি ফরম, ভর্তি সংক্রান্ত তথ্য, শিক্ষক-শিক্ষক, ছাত্র-শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্র, ছাত্র-শিক্ষক অভিভাবক ও শহরের স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, বিশ^বিদ্যালয় এর সাথে গ্রাম/দেশ-বিদেশের সব শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের সাথে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে বসে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে।
এতে করে প্রত্যেকের দক্ষতার পরিধি বৃদ্ধি পাবে এবং আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলো মাল্টিমিডিয়া বান্ধব হয়ে উঠবে। ডিজিটাল মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম হলে প্রথমতঃ পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তুর ধারণা সম্প্রসারিত হবে দ্বিতীয়তঃ পাঠদান পদ্ধতিতে অর্জন ও বর্জন এবং গ্রহণ প্রক্রিয়ায় দ্রুততর হবে তৃতীয়তঃ অনলাইন ব্যবস্থায় পাঠদান ও ফল প্রকাশ করা সম্ভব হবে। চতুর্থতঃ শিক্ষকদের শিক্ষাদান পদ্ধতির ব্যাপক পরিবর্তন, সম্প্রসারিত ও দক্ষতার বৃদ্ধি পাবে পঞ্চমতঃ শিক্ষার্থীদের মেধার যথাযথ মূল্যায়ন হবে।

ডিজিটাল মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে ঘরে বসেই লেখা-পড়া করা সম্ভব হলেও ডিজিটাল ক্লাসরুমে শিক্ষকের সান্নিধ্যেই কেবল তা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠতে পারে। শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-শিক্ষক ও সহপাঠীদের একান্ত সান্নিধ্যে যা অনুভব উপভোগ ও বুঝাপড়া সম্ভব তা অন্য কোন উপায়ে সম্ভব হবে না। তাই এ পদ্ধতি টেকসই ও গ্রহণযোগ্য এবং দীর্ঘস্থায়ী পদ্ধতি। তবে, অদূর ভবিষ্যতে এত বইপত্র, খাতা-কলম এবং এত বিশাল আকৃতির দালান-কোঠা ও অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ এর আবেদন থাকবে কিনা তা’-এখনই চিন্তা ভাবনা করা দরকার। অবকাঠামো উন্নয়নখাতে রাশি-রাশি অর্থ কড়ির অঢেল বিনিয়োগ লাঠে উঠার সম্ভাবনা থাকলে তা খতিয়ে দেখার দরকার আছে। তাই শিক্ষালয়ে বিশালাকৃতির দালান-কোঠার পরিবর্তে স্বল্প পরিসরে মিলনায়তন প্রকৃতির বহুতল বিশিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণ করে বাকী বাজেট প্রযুক্তিগতখাতে বরাদ্দ করা যেতে পারে। এছাড়া ডিজিটাল মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের মাধ্যমে রসায়ন, পদার্থ, গণিত ইত্যাদি বিষয়সমূহ পাঠদানে অধিকতর কার্যকর। অপরাপর বিষয়সমূহ পর্দায় প্রদর্শনও করতে হয় আবার বোর্ডে লিখতেও হয়। বিশে^র উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষার সর্বস্তরে কম্পিউটারের ব্যবহার শুরু হলেও আমাদের দেশে তা সম্ভব হয় নি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে এর ব্যবহার নেই বললেই চলে। কোন কোন শিক্ষালয়ে স্বল্প পরিসরে শুরু হলেও তা যোগ্য শিক্ষকের অভাবে ছাত্র-ছাত্রীরা সঠিকভাবে শিক্ষা লাভ করতে পারছে না। এছাড়া, কম্পিউটারের উচ্চমূল্য, ব্যবহারিক ব্যয়, বিদ্যুৎ সংকট, চুরি কিংবা নষ্ট হওয়া, মেরামত খরচ, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ছাত্র-শিক্ষক উভয়েরই কম্পিউটার/ল্যাপটপ না থাকা, অপ্রস্তুত ছাত্র-শিক্ষক, যন্ত্রের প্রতি ভীতি ব্যবহারে অনীহা, শ্রেণিকক্ষের অভাব ইত্যাদি কারণে এ উদ্যোগ কার্যকরী হচ্ছে না।

ডিজিটাল মাল্টিমিডিয়া ক্লাস একজন শিক্ষকের মগজের তেল দিয়ে চলবে। তাই, শিক্ষালয়, কর্তৃপক্ষের উচিত দেশ-বিদেশী উদ্যোগে অথবা নিজেদের উদ্যোগে যেকোন উপায়ে শিক্ষকের হাতে ল্যাপটপ তুলে দিয়ে তাঁদের প্রশিক্ষিত করে তোলা। সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট বিষয়টি অধিকতর গুরুত্বের সহিত বিবেচনা করার জন্য আকুল আবেদন জানাই।

ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে পাঠদান কার্যক্রম উপস্থাপন এটা কোন ভাবাবেগ বিষয় নয় বরং এটা একটা বাস্তবধর্মী উদ্যোগ। সব বাঁধা অতিক্রম করে এ মহৎ উদ্যোগটি দেশের সর্বস্তরের শিক্ষালয়ে চালু হবে – এটাই আমাদের একান্ত কামনা। কারণ, এ পদ্ধতিতে সৃজনশীলতা বাড়ে।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা বিষয়ক কলামিস্ট

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 500 People

সম্পর্কিত পোস্ট