চট্টগ্রাম সোমবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৯

সর্বশেষ:

৮ মে, ২০১৯ | ৮:০৪ অপরাহ্ণ

ইমরান বিন ছবুর

ইয়ংওয়ানের সহযোগিতায় পড়ছেন এইউডাব্লিউতে

স্বপ্নপূরণ হচ্ছে ফিরোজার

মোছাম্মৎ ফিরোজা খাতুন। বাড়ি চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার বার ঘরিয়া ইউনিয়নে। চাপাইনবাবগঞ্জ জেলার কারবালা হাইস্কুল এন্ড কলেজ থেকে ২০০৬ সালে এসএসসি পাশ করেন তিনি। একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ২০০৮ সালে পাশ করেন এইচএসসি। এরপর বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ১ম বর্ষে। তবে সেই স্বপ্ন বেশিদিন টেকেনি। দরিদ্রতার কারণে ২০০৮ সালে পড়াশুনা ছেড়ে চাকরির খুঁজে চলে আসেন চট্টগ্রাম শহরে। কিছুদিন এক আত্মীয়ের বাসায় থাকার পর চাকরি নেন ইয়ংওয়ান গ্রুপে। মাসে বেতন ২ হাজার ৩০০ টাকা। কোয়ালিটি এশিউরেন্স বিভাগে চাকরি করেন টানা সাত বছর।
এরপরের গল্পটি একেবারে ভিন্ন। ফিরোজা খাতুন বর্তমানে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনসের (এইউডাব্লিউ) পলিটিক্স, ফিলোসোফি এবং ইকোনোমিক্স বিষয় নিয়ে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। দৈনিক পূর্বকোণের সাথে আলাপকালে এ তথ্য জানান ফিরোজা খাতুন নিজেই। তিনি বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের কারবালা হাইস্কুল এন্ড কলেজ থেকে ২০০৬ সালে এসএসসি এবং ২০০৮ সালে এইচএসসি পাশ করি। এরপর একই প্রতিষ্ঠানে বাংলা বিষয় নিয়ে স্নাতক ভর্তি হই। কিন্তু পরিবারের অর্থিক সংকটের কারণে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হয়নি। ২০০৮ সালের দিকে চাকরির উদ্দেশ্যে চলে আসি চট্টগ্রাম শহরে। কিছুদিন এক আত্মীয়র বাসায় থাকার পর চাকরি পাই ইয়ং ওয়ান গ্রুপে। মাসিক বেতন ২ হাজার ৩০০ টাকা। প্রায় সাত বছর কাজ করি কোয়ালিটি এশিউরেন্স বিভাগে। তিনি আরো বলেন, ২০১৬ সালের দিকে একদিন কাজ করার সময় ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র এক আপু বলেন, ইয়ংওয়ান আমাদের জন্য এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে একটি বৃত্তি বা স্কলারশিপ চালু করেছে। তোমার যেহেতু লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ আছে, তাই তোমার এপ্লাই করা উচিত। প্রথমে ভাবলাম, অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে অনার্সে ভর্তি হয়েও পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারিনি। তাহলে এখন আবার তা কিভাবে করবো। তখন আপু বলেন, ওখানে পড়তে কোনো টাকা লাগবে না। আর তাছাড়া, থাকা-খাওয়ার খরচ ছাড়াও তোমাকে মাসে মাসে কিছু টাকা দিবে যা তুমি পরিবারকে দিতে পারবে। এরপর আমি রাজি হই।
বিস্তারিত জানার পর ঘটনাটি আমি মায়ের সাথে শেয়ার করি। আমার বাবা মারা যান ২০১৫ সালে। তাই সব কিছু মা’র সাথে শেয়ার করি। মা বলেন, তুমি যদি ভালো মনে করো তাহলে তুমি পরীক্ষা দাও। তোমাকে আমরা পড়াতে পারিনি। এখন নিজে যদি কোনো সুযোগ পাও তাহলে কেন হাতছাড়া করবে। ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার জন্য ফরম নেই এবং ভর্তি পরীক্ষায় আমি টিকে যাই। লিখিত পরীক্ষায় টেকার কিছুদিন পর আমাকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হলো। ঠিকমত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছি। তখনও আমি ইয়ংওয়ানে কাজ করতাম। মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের কিছুদিন পর, একদিন কাজ করার সময় আমাদের ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র লুৎফা আপু বলেন, তোমাকে আর এখানে কাজ করতে হবে না। তখন আমি মনে মনে ভয় পেলাম। হঠাৎ এরকম কথা কেন বলছে আপু। এরপর আপু আমাকে নিয়ে আমাদের এইচ আর ডিপার্টমেন্টে যায়। তখন জানতে পারি, আমি এশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়েছি।
বর্তমানে এশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে পড়ার পাশাপাশি মাসে কিছু টাকা জমাচ্ছেন ফিরোজা। এখান থেকে স্নাতক শেষ করে ভালো কোন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ করবেন। এরপর সামাজিক কোন সংগঠনের সাথে কাজ করার ইচ্ছে তার। চেষ্টা করবেন যাতে তার মত আর কেউ পড়ালেখা থেকে মাঝপথে ছিটকে না পড়ে। লেখাপড়ার প্রতি সবসময় আগ্রহ ছিল ফিরোজা খাতুনের। কিন্তু সুযোগ ছিল না। চাকরি করার সময়ও পাশের বাসার বাচ্চাদের পড়াতেন তিনি।
ইয়ংওয়ানসহ ১৪টি গার্মেন্টেসের সহায়তায় বর্তমানে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটিতে ৬০ জনের বেশি আরএমজি
(রেডিমেড গার্মেন্টেস) শিক্ষার্থী বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। সর্বশেষ গতবছর ১২ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ রয়েছে এমন নারী শ্রমিকদের প্রতিবছর ভর্তির এই সুযোগ দিচ্ছে ইয়ং ওয়ান গ্রুপ।

The Post Viewed By: 347 People