চট্টগ্রাম শনিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৩

সর্বশেষ:

৮ ডিসেম্বর, ২০২২ | ৭:৩৫ অপরাহ্ণ

নৈতিক শিক্ষা: আমাদের তরুণ প্রজন্ম

নৈতিকতা শব্দটির ইংরেজি হলো Morality । যার অর্থ হলো ভদ্রতা, উত্তম চরিত্র ও আচরণ। এটি মূলত: ভালো-মন্দ, উচিত-অনুচিত, ন্যায়-অন্যায়, ঠিক-বেঠিক, আসল-নকল-এর বোধ নির্ধারণকারী। নৈতিকতার উদাহরণ হলো: ‘আমার উচিত অন্যের সাথে সেভাবেই আচরণ করা যেমনটা আমি নিজে অন্যের নিকট থেকে আশা বা প্রত্যাশা করি।’

নৈতিকতাকে ন্যায্যতা কিংবা সঠিকতাও বলা যেতে পারে। ন্যায় কে ন্যায়, অন্যায় কে অন্যায়, সাদা কে সাদা, কালো কে কালো বলাও নৈতিকতা। আর এটি গড়ে ওঠে শিক্ষা আর নৈতিকতা সমান্তরালভাবে চললে।

শিক্ষা মানুষকে বিকশিত করে। গাছ যেমন ডালপালা ছড়িয়ে বড় আকার ধারণ করে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়, তেমনি শিক্ষা মানুষের ভেতর সুপ্ত অস্তিত্বকে জাগিয়ে তোলে। প্রতিটি স্তরে কেবল সেই মানুষের চিহ্ন থাকে, যার ভেতর সুশিক্ষা রয়েছে। আর নৈতিকতা এই শিক্ষাকে উঁচু স্তরে নিয়ে যায়। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করে। মূল্যবোধ হলো রীতিনীতি ও আদর্শের মাপকাঠি, যা সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। নীতি হলো এমন এক পেনসিল যা ভালোমন্দের মধ্যে একটা স্পষ্ট রেখা টেনে দেয়। তাই ভীত যদি নড়বড়ে হয়ে যায়, তাহলে সে সমাজ বা রাষ্ট্রের অনেক কিছুই ভারসাম্যহীন হয়ে হেলে পড়তে পারে।

ন্যায় আর সত্যের পথ অনুসরণ করে অন্যের ক্ষতি না করে যতটুকু সম্ভব উপকার করা, অপরের কল্যাণ করা প্রত্যেক মানুষেরই কাজ এবং এটিকে রুটিন ওয়ার্কের ভেতর নিয়ে আসা প্রজন্মদের মৌলিক দায়িত্ব হওয়া উচিত। যা আমাদের মন ও হূদয়কে নির্মল করবে। মানবজীবনের উন্নয়নে ও মানবকল্যাণের সব বিষয়ের প্রধান নির্ণায়ক হলো নৈতিকতা। আমাদের সামাজিক ও ব্যক্তিজীবনেও অনৈতিকতা ও আদর্শহীনতার ছোঁয়া লেগেছে। অন্যের সফলতা আমাদের সহ্য হয় না। তা-ই তো সুযোগ পেলেই কাউকে বিপদে ফেলতে এতটুকু দ্বিধা করি না। কারো বিপদে সাহায্য করি না। দাঁড়িয় তামাশা দেখি। সেলফি নিই, ভিডিও করি। অন্যের নামে কুত্সা রটানো, অপদস্থ করা, রাস্তাঘাট ও গণপরিবহনে নারীদের কটুক্তি করা, তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে মারামারি, ঝগড়া-ঝাটি কোনোটিই বাদ পড়ে না। ব্যাপারটা এমন হয়ে গেছে যে, আমিই ভালো, আমিই সফল হবো একা, সবকিছু আমারই হতে হবে, আমার থেকে অন্য কেউ ভালো থাকতে পারবে না, সেটা যেভাবেই হোক।

নৈতিক শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীর জীবনকে কোনো আদর্শের লক্ষ্যে পরিচালিত করে তার চরিত্রের উত্কর্ষ সাধন করে ব্যক্তি ও সমাজজীবনে তা প্রতিষ্ঠা করা এবং সত্য বলা, কথা দিয়ে কথা রাখা, মানুষ ও পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীলতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দেশপ্রেম, দয়া-করুণা, সহমর্মিতা, ত্যাগ, শান্তি, মানবাধিকার, পারস্পরিক অধিকার ও মর্যাদা দেওয়ার মানসিকতা অভ্যাস গড়ে তোলা।

সামাজিক কল্যাণমূলক ও দেশের মানোন্নয়নমূলক মানবীয় গুণাবলি প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে দেওয়া হয় নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা। একটি শিশুর প্রাথমিকভাবে নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার গুণাবলি তার পরিবারের মাধ্যমেই শুরু হয়। পরিবারে, বিশেষ করে মায়ের কাছ থেকেই সে প্রাপ্ত হয় বিশেষ নৈতিক শিক্ষা। তারপর তাকে শিক্ষা দেয় সামাজিক পরিবেশ এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। একজন প্রকৃত শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে নিয়মিতভাবে সেই সব শিক্ষা দেন, যা তাকে মূল্যবোধ তৈরি করতে সহায়তা করে। একজন শিক্ষকের একটু উত্সাহ-উদ্দীপনা ও নৈতিক মূল্যবোধের দিকনির্দেশনার ফলে একজন ছাত্রছাত্রী নিজের জীবন গঠন করে শুধু দেশের নয়, সমগ্র মানবতার কল্যাণে অবদান রাখতে পারে। শিক্ষকরা বিষয়ভিত্তিক পড়ানোর সময় নিজেদের মতো করে নৈতিক শিক্ষা দিতে পারেন। স্বাভাবিকভাবেই তা শিক্ষার্থীদের উপর প্রভাব পড়বে। নৈতিকতা জোর করে কাউকে গ্রহণ করাতে বাধ্য করা যায় না। ভালোবাসা আর প্রেম দিয়ে করতে হয়। পরিবেশ তৈরি করতে হয়। এ ক্ষেত্রে মা-বাবার দায়িত্ব অনেক। সন্তানের নৈতিক শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম মা। তিনি যতটা শেখাতে পারেন, শিক্ষক বা সমাজ ততটা পারেন না।

শৈশব থেকেই নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব বাড়ানো প্রয়োজন। পরিবারে মা-বাবার সঠিক নির্দেশনা পেলে একটি শিশু ছোট থেকেই ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। আর মা-বাবা যদি শিশুর বিকাশকালে তার আবেগ-মন-আচরণ সম্পর্কে অপরিপক্ব থাকেন, তাহলে সেই পরিবারে শিশুর বিপথগামিতার আশঙ্কা থাকে বেশি। এছাড়া বাবা-মা বা পরিবারের অন্য সদস্যদের অসদাচরণ, মিথ্যাচার, দুর্নীতিপরায়ণতা, ভারসাম্যহীন ব্যবহার শিশু-কিশোরকে বিপথগামী করে তোলে। কাজেই পরিবার থেকে শিশু-কিশোরদের নৈতিক শিক্ষা প্রদান শুরু করতে হবে বাস্তব জীবনে অনুশীলনের মাধ্যমে। আমাদের এমন শিক্ষাব্যবস্থা চাই, যে শিক্ষা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে জ্ঞানী, দক্ষ ও ভালোমন্দ বোঝার মতো করে গড়ে তোলার পাশাপাশি হূদয়বান, রুচিশীল, নান্দনিক, শৈল্পিক, নৈতিক ও মানবিক বোধসম্পন্ন দেশপ্রেমিক ও সর্বোপরি আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে।

প্রযুক্তির আগ্রাসন আর শত কাজের ব্যস্ততায় শিশুর চরিত্র গঠনে বর্তমানে আমরা প্রায় নিষ্ক্রিয় ভূমিকাই পালন করছি। কিন্তু যেসব মা-বাবা সচেতনভাবে এ লক্ষ্যে সন্তানদের সময় দিচ্ছেন তারা নি:সন্দেহে বুদ্ধিমান ও সফল। এ উদ্যোগ একদিকে যেমন তাদের সন্তানদের মধ্যে সহমর্মিতা, সহানুভূতি ও সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত হচ্ছে তেমনি এর ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সুস্থ, সত্ ও আত্মনির্ভরশীল নাগরিক সৃষ্টির মাধ্যমে উপকৃত হবে দেশ ও সমাজ।

শিক্ষা ক্ষেত্রে নৈতিক শিক্ষাকে এমনভাবে যোগ করতে হবে যাতে এই নৈতিক মূল্যবোধের বার্তা শিক্ষার্থীদের নিকট আরও সহজ, সরল ও আকর্ষণীয় উপায়ে পৌঁছাতে পারে।

এজন্যে ভালো বই, নৈতিকতা সম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, ও অন্যান্য মাধ্যমও ব্যবহার করা যেতে পারে। মানুষের জীবনে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও মর্যাদা প্রদানের জ্ঞান থাকলে তার ব্যক্তিগত জীবন তথা দেশ ও সমাজের শান্তিও বিরাজমান থাকবে।

 

লেখক: অধ্যাপক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিন,

রিচালক, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর। 

 

পূর্বকোণ/মামুন

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট