চট্টগ্রাম শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

২২ জুলাই, ২০১৯ | ১২:৫৫ এএম

মো. সেলিমুজ্জমান মজুমদার

পেশার জননী হবে শিক্ষকতা

পৃথিবীর ইতিহাসে সংঘটিত প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিল্প বিপ্লবে আমাদের অংশগ্রহণ ছিল না। কারণ, তখন আমরা পরাধীন ছিলাম। বর্তমানে আমরা স্বাধীন। বস্তুত এ মহান স্বাধীনতা সার্থক করার জন্য আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। তথ্য প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে গোটা পৃথিবীব্যাপী ব্যাপক বিপ্লব ঘটে গেছে যাকে আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বলছি। শোনা যাচ্ছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে সব পেশার জননী হবে শিক্ষকতা পেশা। একজন শিক্ষখ হিসেবে এ সংবাদ আমার নিকট বড় আনন্দের হলেও শঙ্কাও কম নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে সম্মান ও মর্যাদার সাথে গণ্য করা হয়, আমাদের দেশে শিক্ষকতা পেশাকে এক ও অভীন্ন দৃষ্টিতে দেখা হয়। তবে, বহুধা বিভক্ত বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকতা পেশা নানা কারণেই এখনো গণতান্ত্রিক ও সমাধিকার লাভ করতে পারে নি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় আমাদের দেশে শিক্ষকতা এখনো পূর্ণাঙ্গ পেশা হিসেবে গড়ে ওঠেনি। পাঠকদের সুবিধার্থে ছোট করে একটা সংজ্ঞা দেয়া দরকার বোধ করছি।
পেশা বলতে মূলত এমন একটি অর্থনৈতিক কর্মকা-কে বোঝায়, যা সম্পাদনের পূর্বে উক্ত বিষয়ের ওপর পেশাগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়, কার্যটি অর্থনৈতিকভাবে ব্যবহারের পূর্বে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক সংঘ বা সনদ প্রদানকারী সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং সম পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের দ্বারা গঠিত সংঘের সদস্য হতে হয় এবং উক্ত সংঘের অনুমোদিত সার্টিফিকেট গ্রহণ করে কার্য পরিচালনা করতে হয়। এ সংজ্ঞা থেকে আমরা পেশার বেশ কয়েকটি বিশেষ দিক খুঁজে পাই। যেমন : ১) বিশেষ জ্ঞান ২) ব্যবহারিক প্রয়োগ ৩) প্রতিনিধিত্বমূলক সংস্থা বা সংগঠন ৪) সার্টিফিকেট অর্জন ৫) নৈতিক আচরণ বিধি ৬) সামাজিক কর্তব্য ও দায়িত্ব পালন। বস্তুত এ সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্যের আলোকেই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অগ্রপেশা হিসেবে বিশ^ায়নের শিক্ষক তৈরির এখনই সময়। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষার মেরুদন্ড হিসেবে শিক্ষক এ দুটি মৌলিক উপাদানকে ঢেলে সাজানো দরকার। দেশ বিদেশে শিক্ষার ব্যাপক প্রচার প্রসার ও চাহিদা এবং দেশে প্রচুর জনশক্তি থাকা সত্ত্বেও আমরা কেন বিশ^মানের শিক্ষক তৈরী করতে পারছি না? ‘বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এখন মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশও। এমন কি পাশের দেশ ভারতও এখন দেশের শিক্ষার্থীদের অন্যতম গন্তব্য। দেশে মানসম্মত উচ্চ শিক্ষার সুযোগ কম। তাছাড়া সর্বাধুনিক শিক্ষা ও বৈশি^ক সুবিধা লাভের জন্য শিক্ষার্থীরা বিদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেখুন, দৈনিক ইত্তেফাক ১৫ আগস্ট ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ। উচ্চ শিক্ষায় বছরে বিদেশে যাচ্ছে হাজার পেরিয়ে লাখ লাখ শিক্ষার্থী। বিদেশে যাওয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা বিদেশ চলে যাচ্ছে। অথচ আমরা বিদেশ যাওয়া শিক্ষার্থীদের ফেরাতে পারি। এর জন্যে চাই সময়োপযোগী পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ। বিশ^মানের শিক্ষা ও শিক্ষক কিংবা পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে উন্নীত করা একটা চলমান প্রক্রিয়া। প্রক্রিয়াটিতে কয়েক ধাপে বিভক্ত করে প্রাথমিকভাবে প্রধান প্রধান ধাপ চিহ্নিত করে ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়নের পদক্ষেপ চালিয়ে গেলে শিক্ষকতা পেশাও হতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হাতিয়ার। আমাদের দেশেও শিক্ষার প্রতি মানুষের ঝুঁক আছে। সুতরাং দেশ বিদেশি এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে এদেশের শিক্ষা, শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষকতা পেশাকে জিইয়ে রাখতে হলে এর পেছনে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চালাতে হবে। জাতি হিসেবে বিশে^ টিকে থাকতে হলে শিক্ষকতা পেশাকে অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে।
যে কোন পেশাকে বিশ^মানে উন্নীত করতে চাইলে দরকার সঠিক পরিকল্পনা সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা। দরকার বিশ^মানের পেশা হিসেবে আত্মপ্রকাশের কতিপয় ধাপ বা পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সব পেশার জননী হবে শিক্ষকতা এটা সহজ কোন কাজ নয়। এটা একটা কঠিন কাজ। তবুও, এ কঠিন কাজটিই আমাদের করা দরকার। শিক্ষকতাকে মাদার অব প্রফেসন্স করার প্রাথমিক উদ্যোগ হিসেবে পেশার বৈশিষ্ট্যসমূহ অনুসরণ করে এসব ধাপসমূহ বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হওয়া দরকার। যেমন : ১) একথা আামদের মানতেই হবে যে, ‘যারা শেখে তারাই বিজয়ী।’ ২) শেখার জন্য দরকার – কঠোর পরিশ্রম অনুশীলন এবং বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ ৩) শেখার উৎস চিহ্নিতকরণ এবং উৎসসমূহের যথাযথ ব্যবহার ৪) নিজেকে সমৃদ্ধ করা এবং নিজের সর্বনাশ নিয়ন্ত্রণ। ৫) পেশার বাইরে আওতা বহির্ভূত বিষয় নিয়ে অহেতুক ভেবে সময় অপচয় না করা।
সুপ্রিয় সহকর্মীবৃন্দ, উপরে উল্লেখিত ৫টি শর্ত বা ধাপ অনুসরণ করার চেষ্টা করুন এবং শিক্ষকতায় নিজেকে সফল করে তুলুন। মানুষের জীবনে পেশাগত সফলতা অর্জনের ভূমিকা বিরাট। পেশাগত জীবনে সফলতা অর্জন করতে না পারলে গোটা জীবনটাই ফিকে হয়ে যায় – অতৃপ্তি নিয়েই জীবন কাটাতে হয়। তাই সময় ও সুযোগ থাকতেই বিজয়ী হবার জন্য প্রচুর শিখতে হবে, শেখার ধারা প্রতিনিয়ত অব্যাহত রাখতে হবে এবং কর্তৃপক্ষকে ুএকজন শিক্ষককে শেখার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। দ্বিতীয় শেখার জন্য একাগ্রতা, কঠোর সাধনা, অনুশীলন ও বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা থাকা চাই। কর্তৃপক্ষকে এখাতে আর্থিক-অনার্থিক প্রেষণা দিয়ে এ ধাপটি সতেজ ও লোভনীয় করে তুলতে হবে এবং প্রত্যেক শিক্ষক-কর্মচারীকে বাধ্যতামূলকভাবে এ ধাপে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মা-বাবা, শিক্ষক-শিক্ষালয়, পাঠ্যপুস্তক পাঠ্যসূচী-সহ শিক্ষা কার্যক্রম, সহকর্মী, পাড়া-প্রতিবেশী, কম্পিউটার ইন্টানেট-এসবই ৩য় ধাপে শিক্ষার উৎস হিসেবে কাজ করে। তাই এসব উৎস থেকে ইতিবাচক ধারার শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। যে নিজেকে চিনেছে সে খোদাকে চিনেছে’ চতুর্থ ধাপে এ বাক্যটি পেশাগত উৎকর্ষ সাধনের মূলমন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত হওয়া উচিত। মানুষ নিজেই নিজের সর্বনাশ ডেকে আনে। অযথা সময়ের অপচয় করেন এবং বর্তমানে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে মানুষ নিজের সর্বনাশকে আরো ত্বরান্বিত করছে। মোবাইল, মিউজিক, মাদক, মানি, ফেসবুক, ইন্টারনেট – এর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার এর মাধ্যমে আমরা পেশাগত জীবনে পিছিয়ে পড়ছি। পঞ্চম ধাপটি হলো – ‘নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রা ভঙ্গঁ করা।’ গবেষণায় দেখা গেছে মানুষ পরচর্চা করতে স্বস্তিবোধ করেন। পেশাগত আওতা বহির্ভূত কাজই অনেকের নিকট মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠে। অথচ, এ সময়টুকু আমরা আমাদের পেশাগত জ্ঞান ভা-ার বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করতে পারি।
বাংলাদেশে সব পেশার জননী শিক্ষকতা পেশাটি সফল হয়ে ওঠার পেছনে অন্তরায় হিসেবে ‘শেখার জন্য চাই কঠোর পরিশ্রম, অনুশীলন এবং প্রশিক্ষণই দুষ্ট চক্র হিসেবে ক্রিয়াশীল। এখানেই আটকে আছে আমাদের শিক্ষার সাফল্য। সুশিক্ষা জাতির জন্য আশীর্বাদ যা একজন দক্ষ শিক্ষকই দিতে পারেন। কিন্তু দেশে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় প্যাটার্ন অনুযায়ী শিক্ষক নেই যা আছে তাদের প্রশিক্ষণ নেই। প্রশিক্ষণ আছে তো ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। প্রাইভেট, ট্রাস্ট, সংস্থা, কোম্পানী, এমপিওভুক্ত নন-এমপিওভুক্ত, সরকারি-বেসরকারী নানা কিসিমের শিক্ষকদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তিতেও আছে ভীন্নতা। মনে রাখা দরকার যে, পেশার রাজা শিক্ষকতায় কোনভাবেই জোড়াতালি দেয়ার মত খাত নয়। এছাড়া, সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে শিক্ষার ব্যয় বেড়েছে। বইপত্র, গাইড, খাতা-কলম, স্কুলের বেতন, প্রাইভেট কোচিং ফি সহ নানা আনুষঙ্গিক ব্যয় এতটাই বেড়েছে যে, অনেক অভিভাবক তা পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। বলা বাহুল্য যে, শিক্ষকরাই এখন নিজেদের ছেলেমেয়েদের লেখা-পড়ার খরচ চালাতে তাঁদের নাভিশ^াস ওঠছে। এছাড়ও সাধারণ প্রশাসন, আর্থিক প্রশাসন, একাডেমিক কার‌্যাবলি, সহ শিক্ষাক্রমিক কার‌্যাবলি ও ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট সমস্যা ও সীমাবদ্ধতাতো আছেই।
দেশে বিরাজিত শিক্ষকতা পেশাকে কীভাবে সময়োপযোগী করে তোলা যায় সে ব্যাপারে প্রয়োজনে সমন্বিত পরিকল্পনা। শিক্ষার বহুমাত্রিকতা, দর্শন ও সাংস্কৃতির প্রকৃত চর্চার মাধ্যমে মেধাশক্তি সম্পন্ন জাতি গঠনের মাধ্যমে শিক্ষকতা পেশাকে বিশ^ মানে উন্নীত করার উদ্যোগ দরকার। আগেই বলেছি যে, চতুর্থ-শিল্প বিপ্লবে সব পেশার জননী হবে শিক্ষকতা পেশা। তাই এ পেশায় অগ্রসৈনিক তৈরিতে প্রথমত পেশাকে গতিশীল করতে দেশে চলমান প্রক্রিয়াকে আরো দ্রুত ও কল্যাণকর করতে সকলে মিলেমিশে ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মপ্রয়াস চালাতে হবে তবেই শিক্ষকতা পেশা দেশের গ-ি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিম-লেও এর রেশ ছড়িয়ে পড়বে।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা বিষয়ক কলামিস্ট

The Post Viewed By: 329 People

সম্পর্কিত পোস্ট