চট্টগ্রাম সোমবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৩

২০ মে, ২০১৯ | ১:৪৫ পূর্বাহ্ণ

ডা. মোহাম্মদ ওমর ফারুক

স্বাস্থ্যের উপর রোজার প্রভাব ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

পবিত্র রমজান মাসে স্বাস্থ্যের উপর ঝুঁকি নেই বললেই চলে। অনেকের ভুল ধারণা, রোজা শরীরের উপর ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, এ ধরনের ধারণা ক্রমেই মিথ্যায় পর্যবসিত হয়েছে। আরবী রমজান মাসে সারা বিশ্বের কোটি কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমান দিনের বেলা উপবাসের মাধ্যমে সিয়াম সাধনা করে থাকেন।
উপবাস বা না খেয়ে থাকা-কে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় যে, দিনের বেলা পানাহার বা নিষিদ্ধ আহার থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা।
পবিত্র কালামে পাকে আল্লাহতায়ালার ঘোষণা, ‘হে মানুষ, তোমরা যারা ঈমান এনেছ, তোমাদের উপর রোজা ফরজ করে দেয়া হয়েছে, যেমনি করে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, আশা করা যায় তোমরা ( এর মাধ্যমে ) তাকওয়া অর্জন করতে পারবে’-সূরা বাকারা- ১৮৩। মহান আল্লাহতায়ালা অসুস্থ ব্যক্তির উপর রোজা হালকা করেছেন, যা পবিত্র কোরানের অকাট্য দলিল- ‘কেউ যদি অসুস্থ হয়ে যায় কিংবা কেউ যদি সফরে থাকে, তাহলে সেই ব্যক্তি সমপরিমাণ দিনের রোজা ( সুস্থ হয়ে অথবা সফর থেকে ফিরে এসে ) আদায় করে নেবে। যারা রোজা রাখার শক্তি রাখে ( কিন্তু রোজা রাখে না ), তাদের জন্য এর বিনিময়ে ফেদিয়া থাকবে ( এবং তা ) হচ্ছে গরিব ব্যক্তির ( তৃপ্তি ভরে ) খাবার দেয়া’।
অসুস্থ ব্যক্তি ছাড়াও যাঁরা সফরে থাকেন, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মহিলা, ঋতুস্রাব অবস্থায়, অশীতিপর বৃদ্ধ- এঁদের ক্ষেত্রেও রমজান মাসের রোজা হালকা করা হয়েছে। যেহেতু রোজাদারগণ ধূমপান থেকে বিরত থাকেন সেহেতু অনেকেই এ কু-অভ্যাস এ পবিত্র মাসে অনায়াসেই পরিত্যাগ করতে পারেন। অতএব, বোঝা গেল রমজানের রোজা সাধারণত শরীরের উপর কোন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না। বরং ফি বছর যারা পেটের পীড়ায় আক্রান্ত কিংবা পাকস্থলী থেকে অতিরিক্ত এসিড নিঃসরণ হয় তাদের ক্ষেত্রে রোজা প্রতিষেধক হিসাবে কাজ করে। আমাদের রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘রোজা ঢাল স্বরূপ। সুতরাং রোজাদার অশ্লীল কথা বলবে না বা বর্বর আচরণ করবে না’। পবিত্র রমজানের সময় দীর্ঘ উপবাসের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ডিহাইড্রেশন বা পানি-স্বল্পতা দেখা দিতে পারে। সাধারণত রমজানে রোজার সময় খাবারের ফ্রিকোয়েন্সি হ্রাস পায় যার প্রভাব পড়ে নিঃসরণের শক্তি, শরীরের ভর এবং শরীরের চর্বির উপর। অনেক স্বাস্থ্য গবেষক নিশ্চিত করেছেন যে, লিপিড, কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন এবং হরমোন বিপাকের পরিবর্তন উপবাসের সময় ঘটে। ১৯৮৮ সালে হ্যালাক এবং ওমনি নামক ২ জন স্বাস্থ্য গবেষক বিভিন্ন চর্বি এবং কার্বোহাইড্রেটের মাত্রার উপর গবেষণা করে দেখেছেন যে, ১৬ জন স্বাস্থ্যবান পুরুষের মধ্যে শুধুমাত্র অর্ধেক ক্ষেত্রে যাদের দিনে ২টি খাবার সীমাবদ্ধ ছিল তাদের ক্ষেত্রে উক্ত বিপাকের পরিবর্তন হয়েছে।
বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, শরীরের ভর, শরীরের চর্বি অথবা অন্তর্বর্তীকালীন আয় রোজগারের সময় শক্তিক্ষয়ের পরিমান হ্রাস পায়। রমজান মাসে রোজাদার ব্যক্তিদের মেজাজ এবং মনন-এর উপর যথেষ্ট প্রভাব পড়ে, যা দিনের বেলায় বৃদ্ধি পায়। রমজান মাসে রোজাদারগণের মাথা ব্যথা বেশি দেখা দেয়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, মাইগ্রেনের ১৪% ক্ষেত্রে টেনশন মাথা ব্যথার জন্য হয়ে থাকে। এতে দেখা গেছে ঘুমের অভাব, হাইপোগ্লাইসেমিয়া এবং ডিহাইড্রেশন এর কারণে মাথা ব্যথা হয়ে থাকে। রমজানে কায়িক পরিশ্রম কম থাকার কারণে শরীরের উপর চাপ কম হয়। রমজান রোজাদারগণের আধ্যাত্মিক ক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ওজন কমে যাওয়া, ইনসুলিন ঝবহংরঃরারঃু বেড়ে যাওয়া, মেটাবলিজম হার এর উপর প্রভাব ইত্যাদি রমজানে রোজার কারণেই হয়ে থাকে।
দীর্ঘক্ষণ উপবাস থাকার কারণে যখন ইফতার খাওয়া হয় তখন রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা বেড়ে যায়-এই ইনসুলিন শরীরের মাংসপেশী অথবা মস্তিকে গুøকোজ সরবরাহ করে এবং এর মাধ্যমে শক্তি সঞ্চিত হয়। অতিরিক্ত গ্লুকোজ লিভারে মষুপড়মবহ হিসাবে জমা হয়। উপবাস শুরু হওয়ার ৬ থেকে ২৪ ঘন্টা পর ইনসুলিন হঠাৎ কমে গিয়ে মষুপড়মবহ ভেঙ্গে যায়, ফলে গ্লুকোজ বের হয়ে শক্তি উৎপাদিত হয়।
গ্লাইকোজেন আনুমানিক ২৪ ঘন্টা জমা থাকে শরীরে। যে পদ্ধতির মাধ্যমে লিভার এমাইনো এসিড থেকে গ্লুকোজ উৎপাদন করে, তাকে বলা হয় মষঁপড়হবড়মবহবংরং, যেটি ২৪ ঘন্টা থেকে ২ দিনের মধ্যে হয়ে থাকে। তাত্ত্বিকভাবে এভাবে বিশেষায়িত করা যায় যে, নতুন গ্লুকোজ উৎপাদন।
পবিত্র রমজানে নন- ডায়বেটিক ব্যক্তিদের মধ্যে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যায়। কিন্তু সহনীয় পর্যায়ে থাকে। উপবাস থাকার ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে শবঃড়ংরং শুরু হয়। অতি সামান্য পরিমান ইনসুলিন শরীরের ষরঢ়রফ ভাঙ্গাকে তরান্বিত করে অর্থাৎ চর্বি ভেঙ্গে শক্তি উৎপাদিত হয়। এ উৎপাদিত জমে থাকা চর্বিকে বলা হয় ঃৎরমষুপবৎরফবং। ঃৎরমষুপবৎরফবং ভেঙ্গে গ্লিসারল উৎপন্ন হয় এবং তিনটি ফ্যাটি এসিড চেইন সৃষ্টি করে। মষঁপড়হবড়মবহবংরং এর জন্য গ্লিসারল এর প্রয়োজন পড়ে। ফ্যাটি এসিড শক্তি উৎপাদনের জন্য সরাসরি ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। শবঃড়হব নড়ফরবং-যেটা নষড়ড়ফ নৎধরহ নধৎরবৎ অতিক্রম করতে পারে। উপবাসে ৪ দিন অতিবাহিত হয়ে গেলেও ৭৫ ভাগ শক্তি, যেটা মস্তিষ্ক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়- তা শবঃড়হবং থেকে প্রাপ্ত। রামাদানের সময় শরীরে মৎড়ঃিয যড়ৎসড়হব এর আধিক্য দেখা দেয়। যে হরমোন সঁংপষব সধংং এবং ষবধহ ঃরংংঁবং কে নিয়ন্ত্রণ করে। ভধঃঃু ধপরফং ধহফ শবঃড়হবং থেকে প্রাপ্ত শক্তি নধংধষ সবঃধনড়ষরংস ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করে।

লেখক: সভাপতি, রাউজান ক্লাব
জুনিয়র কনসালটেন্ট (ইএনটি),
জেনারেল হাসপাতাল, রাঙ্গামাটি

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট