চট্টগ্রাম সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২০

২১ জানুয়ারী, ২০২০ | ৫:৫৩ পূর্বাহ্ন

ঘোষিত সময়েই কার্যকর হোক এক অঙ্কের সুদহার

গেল বছর নানা কারণে কার্যকর করতে না পারলেও বছরের সূচনাদিন থেকেই দেশের ব্যাংকগুলোতে ঋণের সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার কার্যকর করার কথা বলেছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। কিন্তু নানা কারণে তা সম্ভব হয়নি। এবার বেসরকারি ব্যাংকমালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী ১ এপ্রিল থেকেই ব্যাংকঋণে সিঙ্গেল ডিজিট সুদ হার কার্যকর হবে। ঋণ ও আমানতে সুদহার ৯ ও ৬ শতাংশ বাস্তবায়নে সরকার এবার কঠোর হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। এ ঘোষণায় হতাশ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হবে নিশ্চয়ই। সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার কার্যকর করা গেলে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি খেলাপী ঋণেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

অর্থমন্ত্রী ১ জানুয়ারিতে সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার কার্যকর করতে না পারার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, ব্যাংকঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশ এবং আমানতের সুদ ৬ শতাংশ বাস্তবায়নের বিষয়টি নতুন বছরের প্রথম দিন থেকেই ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে চেয়েছে সরকার। কিন্তু শুধু ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে ঋণে সুদহার ৯ শতাংশ বাস্তবায়ন করলে অনেক ইন্ডাস্ট্রি বাদ পড়ে যাবে, অনেক খাত বাদ পড়বে। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সফলতা পেতে সব ঋণগ্রহীতাকে একই সময় থেকেই একই সুবিধা দিতে বলেছেন। তাই সব পক্ষের সুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার কার্যকর করার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১ এপ্রিল। প্রসঙ্গত, বেসরকারি ব্যাংকের মালিকরা এখন সরকারের কাছ থেকে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা, নগদ জমার বাধ্যবাধকতা বা সিআরআর ১ শতাংশ কমিয়ে ৫.৫ শতাংশ করা, ঋণ আমানতের হার (এডিআর) সমন্বয়সীমার সময় বাড়ানো এবং রেপো রেট ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ করাসহ চার ধরনের সুবিধা নিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে আনতে ব্যাংকের কর্পোরেট ট্যাক্স আড়াই শতাংশ কমানো হয়েছে। ব্যাংকগুলোর অন্যান্য খরচও কমিয়ে আনার পদক্ষেপ আছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও এসব সুবিধা আমলে নিয়ে বেসরকারী ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স (বিএবি) ৯ শতাংশের বেশি সুদ না নেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিল। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপারটি হচ্ছে বিএবি’র সে সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। এখন আবার ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর করার কথা বলা হচ্ছে। তবে এই ঘোষণার যাতে টেকসই বাস্তবায়ন হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। উল্লেখ্য, ব্যাংকের উচ্চসুদহারের কারণে শিল্পখাত বিপাকে পড়ার প্রেক্ষিতে গত বছরের মাঝামাঝি সময়েও সুদহার এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকটের মুখে গত বছরের শেষদিকে সুদহার ১২ থেকে ২২ শতাংশে উঠে যায়। এবার যাতে সেরকম না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

ব্যাংকঋণের উচ্চসুদহার দেশে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এতোদিন। শিল্পঋণের বিপরীতে উদ্যোক্তাদের সুদ গুনতে হয় ১৪ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত। এ ছাড়া ঋণ নেয়ার সময় প্রক্রিয়াকরণ ফি সহ আরও অন্য যেসব ফি নেয়া হয়, তাতে এ হার ২০ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়। কোন কোন ব্যাংকের বিরুদ্ধে আরও বেশি সুদ নেয়ার অভিযোগও রয়েছে। গ্যাসসংকট, বিদ্যুতের ঘাটতি এবং ডলারের উচ্চমূল্যসহ নানা সমস্যার পাশাপাশি উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে প্রকৃত ও সৎ উদ্যোক্তারা করুণ অবস্থার মধ্যে আছে। যদি এপ্রিল থেকে সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার কার্যকর করা যায় তাহলে বিনিয়োগে সুদিন আসবে সন্দেহ নেই। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। তবে সুদহার কমানোর প্রেক্ষিতে যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে সেসব সমস্যা মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি থাকলে সিদ্ধান্তের টেকসই বাস্তবায়ন নিশ্চিত হবে। সাধারণত খেলাপি ঋণ ও অনিয়মের কারণেই ব্যাংকঋণে উচ্চসুদহার থাকে। বাংলাদেশে দিনদিন খেলাপির সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি নানা অনিয়ম-দুর্নীতি গ্রাস করছে ব্যাংকিং সেক্টরকে। এর খেসারত দিচ্ছেন সুঋণগ্রহীতারা। আবার আমানতকারীরাও পাচ্ছেন না যুক্তিসংগত সুদ। এসব বিষয়ে নজর দেয়ার সময় এসেছে।

সুদের হার কমানোর পর সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর অনিয়ম-দুর্নীতি রোধ করা গেলে খেলাপি ঋণও কমে আসবে। এর ফলে ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে বজায় রাখা সহজ হবে। এতে বিনিয়োগ বাড়বে। বাড়বে কর্মসংস্থান। ব্যাংকও লাভবান হবে। কেননা ঋণগ্রহীতারা সহজে ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন। দেশের অর্থনীতিতে এর সুফল অনুভূত হবে। তবে আমানতের সুদহার কম হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ সঞ্চয়বিমুখ হবেন কি না তাও ভেবে দেখতে হবে।

The Post Viewed By: 58 People

সম্পর্কিত পোস্ট