চট্টগ্রাম বুধবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৯

১৮ মে, ২০১৯ | ২:১৯ এএম

ড. প্রণব কুমার বড়–য়া

শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা

আজ শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা। বাংলা পঞ্জিকায় যা বৈশাখী পূর্ণিমা, বৌদ্ধদের তাই বুদ্ধ পূর্ণিমা। এই পবিত্র তিথিতে গৌতম বুদ্ধ খৃষ্ট পূর্ব ৬২৪ অব্দে নেপালের লুুম্বিনীতে জন্মগ্রহণ করেন। ভারতের বিহার রাজ্যের গয়ার উরুবেলা গ্রামে নিরঞ্জনা নদীর পশ্চিম তীরে অশ^ত্থবৃক্ষের নীচে বসে ধ্যানের মাধ্যমে বোধিজ্ঞান লাভ করেন এবং বুদ্ধ হন। এই পূর্ণিমা তিথিতে তিনি ৮০ বছর বয়সে ভারতের উত্তর প্রদেশের কুশীনগরে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। গৌতম বুদ্ধের জীবনের এই দিনে তিনটি প্রধান ঘটনা সংগঠিত হয়েছিলো বলেই এটি বুদ্ধ পূর্ণিমা।
বুদ্ধ পূর্ণিমা বৌদ্ধদের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন। এই দিনে বৌদ্ধধর্মালম্বীদের আবালবৃদ্ধ বনিতা সকালে ¯œান শেষে নতুন বস্ত্র পরিধান বা পরিচ্ছন্ন পোষাকে বৌদ্ধবিহারে সমবেত হয়। বুদ্ধপূজার সামগ্রী, বিভিন্ন দানীয় বস্তু ও ভিক্ষুদের জন্য খাবার তারা অর্পণ করেন। এ সময় উপাসক উপাসিকা’রা বুদ্ধপূজায় অংশ নিয়ে পঞ্চশীল- অষ্টশীল গ্রহণ করে ভিক্ষু সংঘকে পিন্ড দান করেন। এ সময় বুদ্ধপূজার তাৎপর্য নিয়ে ভিক্ষুসংঘ ও গৃহীরা আলোচনায় অংশ নেন।
দিবসের কর্মসূচির মধ্যে বিকেলে বুদ্ধের জীবন ও দর্শন নিয়ে বৌদ্ধস¤্রদায় ছাড়াও ভিন্নসম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ এমনকি মন্ত্রী এমপি’রাও অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে আলোচনা সভায় অংশ নেন। বিকেল অধিক সংখ্যায় বৌদ্ধেরা বিহারে সমবেত হন এবং বুুদ্ধমুর্তির সামনে বাতি জ¦ালান, আবারো শীলে প্রতিষ্ঠিত হন। সন্ধ্যায় থাকে ধর্মীয় গানের আসর। উল্লেখ্য এদিনে সংবাদপত্রে বুদ্ধের জীবন ও বাণী সম্বলিত প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, বেতার টেলিভিশনে থাকে বিশেষ অনুষ্ঠান। বুদ্ধপূর্ণিমা উপলক্ষে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাণী প্রদান করেন এবং তাদের সরকারি বাসভবনে বৌদ্ধদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন।
আজ বাংলাদেশের ত্রিশলক্ষ বৌদ্ধ নরনারী দেশের আড়াই হাজার বৌদ্ধ বিহারে এই উৎসব পালন করছে। বাংলাদেশ সা¤্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এদেশের বৌদ্ধধর্ম সুপ্রাচীন, গৌতমবুদ্ধের জীবদ্দশায় বাংলাদেশে এই ধর্ম প্রচারিত হয়। স্বয়ং বুদ্ধ বাংলাদেশের পুন্ড্রবর্ধনে (বগুড়া) এসেছিলেন এবং শিষ্যসমেত তিনমাস অবস্থান করেছিলেন। বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতির ইতিহাস। তার প্রমাণ সোমপুরী মহাবিহার, জগদ্দল বিহার, বাসু বিহার, শালবন বিহার, বিক্রমপুরী মহাবিহার এবং প-িত বিহার।
গৌতমবুদ্ধ ভারতের বিভিন্ন স্থানে ৪৫ বছর ধর্মপ্রচার করেছিলেন। সমগ্র বৌদ্ধ দর্শন চারিয়ার্য সত্য, আর্য অস্টাঙ্গিক মার্গ ও প্রতিত্যসমুৎপাত নীতির উপর দাঁড়িয়ে আছে। তার বাণী ও উপদেশগুলো ত্রিপিটকে লিপিবদ্ধ আছে। এগুলোর নির্বাস ধম্মপদেও পাওয়া যায়। তার বাণীর প্রধান দিক হলো মৈত্রী। তিনি বলেছেন সকল মানুষ সমান, মানুষের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নাই। তিনি মানুষের কল্যাণ কামনা করেছেন। কেবল মানুষ নয়, সকল জীবের সুখ ও মঙ্গল চেয়েছেন। তিনি বলেছেন জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক। তিনি আরো বলেছেন, জগতে শত্রুতাকে শত্রুতা দিয়ে জয় করা যায় না। শত্রুতাকে মৈত্রী দিয়ে জয় করতে হয়। এই মৈত্রী হলো হৃদয় নিঃসৃত মৈত্রী। মাতা যেমন তার রোগশয্যায় কাতর সন্তানের রোগমুক্তির জন্য স্বীয় জীবন দান করে ঠিক তেমনি সকল মানুুষের প্রতি অপরিমেয় মৈত্রী প্রসারিত করতে হবে।
তিনি মৈত্রী ছাড়াও করুণা, মুদিতা ও উপেক্ষার কথা বলেছেন। করুণা হলো, অপরের দুঃখে তার পাশে দাঁড়ানো, তার দুঃখ অবসানে সহায়তা করা। মুদিতা হলো, অপরের গৌরবে গৌরবাণি¦ত হওয়া, অপরের অভিনন্দন সাফল্যে জানানো। এটা শুদ্ধ মন ছাড়া কখনোই সম্ভব নয়। আজ মুদিতার চর্চা করাটা বড় বেশি প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ মানুষ সহজেই অপরকে বড় করতে চায় না, অথচ এর দ্বারা সে যে নিজেও বড় হচ্ছে, তা ভুলে যায়। তিনি উপেক্ষার কথা বলেছেন। সেটি হলো, লাভ-অলাভ, সত্য-মিথ্যা, যশ-অযশ, সুখ-দু:খ ইত্যাদিতে অবিচল থাকা অর্থাৎ লাভে উচ্ছ্বসিত না হওয়া আবার অলাভ বা ক্ষতিতে ভেঙ্গে না পড়া, এভাবে মনকে যে দৃঢ় করতে পারে সেই হয় আলোকিত মানুষ, সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। তিনি বলেছেন সকল প্রকার পাপ কর্ম থেকে বিরত থেকে পুণ্যকর্ম সম্পাদন করতে।
বুদ্ধের মহামুল্যবান আর এক উপদেশ হলো, তোমার কাছে তোমার নিজের জীবন যেমন প্রিয়, অন্যের কাছেও তার জীবন তেমন প্রিয়।এই বোধটাকে নিজেদের মধ্যে উপমা হিসেবে নিলে তখন সে অন্যকে আঘাত করতে পারে না, হত্যা করতে পারে না। তিনি বলেছেন আপনাকে দীপ করে জ¦ালো। তোমার নিজের মধ্যে যে বোধিশক্তি আছে তাকে জাগাও। তিনি এভাবে বলে দিয়েছেন নিজের মুক্তি, নিজের উন্নতি, নিজের সুখের জন্য নিজেকেই উদ্যোগী হতে হবে। তাই মনের আধারে যে সৎকর্ম, প্রেম-প্রীতি সুপ্ত আছে তাকে জ্ঞানের আলো দ্বারা জয় করো।
সবশেষে তিনি যে উপদেশ দিয়েছেন তার মধ্য থেকে একটিকে উল্লেখ করতে চাই। সেটা হলো, ক্রোধকে অক্রোধ দ্বারা, কৃপণকে দানের দ্বারা, মিথ্যাকে সত্যের দ্বারা জয় করো। বুদ্ধের বাণীগুলো ত্রিপিটকের ৮৪ হাজার শ্লোকের মধ্যে নিহিত আছে। বুদ্ধ সাম্যের প্রতীক জ্ঞানের প্রতীক, মহামৈত্রীর প্রতীক। বুদ্ধ মানুষকে সত্যের পথে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। আমরাও আজকের দিনে এই বাণী স্মরণ করছি। তার নির্দেশ বহু জনের হিত ও কল্যাণে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়। তার আহ্বান, এসো আমরা বৈরীদের মধ্যে অবৈরী হয়ে যারা দুঃখ প্রাপ্ত, ভয়প্রাপ্ত, শোকপ্রাপ্ত তাদের মাঝে দুঃখহীন, ভয়হীন ও শোকহীন হয়ে বসবাস করি।
পরিশেষে আমি দেশের সকলের প্রতি বুদ্ধ পূর্ণিমার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। আপনাদের সকলের শুভ ও কল্যাণ হোক। জগতের সকল প্রাণী সুখী হউক, বাংলাদেশ সমৃদ্ধশালী হোক।

The Post Viewed By: 215 People

সম্পর্কিত পোস্ট