চট্টগ্রাম রবিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২১

১৭ মে, ২০১৯ | ২:০৭ পূর্বাহ্ণ

খাদ্য নির্বাচনে সচেতনতাই কিডনিকে সুস্থ রাখে

দেশে কিডনি সমস্যা আজ ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ফেলছে চরম নেতিবাচক প্রভাব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ কিডনি রোগীর প্রাদুর্ভাবে ১১তম পর্যায়ে রয়েছে। দুই কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর কিডনিজনিত রোগে মারা যাচ্ছে কমপক্ষে ৪০ হাজার মানুষ। এ হিসেবে কিডনি রোগে মৃত্যুর সংখ্যা প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৫ জন। প্রাপ্তবয়স্ক ১৮ ভাগ মানুষই দীর্ঘমেয়াদে কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়। নীরব ঘাতক কিডনি রোগের ভয়াবহতার এই চিত্র খুবই উদ্বেগকর বলতে হবে।
কিডনি রোগ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধির জন্যে জনসচেতনতার অভাব, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচার পরিবর্তনকে মূখ্য কারণ বিবেচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচার পরিবর্তনের ফলে মানুষ মুটিয়ে যাচ্ছে। ফলে ডায়াবেটিস এবং উচ্চরক্তচাপসহ নানা রোগব্যাধি হানা দিচ্ছে মানবশরীরে। পরিণামে কিডনি আক্রান্ত হচ্ছে। আবার ডায়রিয়াজনিত পানিশূন্যতা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে রক্তের চাপ কমে গিয়ে, সংক্রমণে, যেমন খোস-পাচরা, অপারেশন পরবর্তী ইনফেকশন, অতিরিক্ত ব্যথানাশক ওষুধ ও এন্টিবায়োটিক সেবনে আকস্মিক কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে। নেফ্রাইটিস, ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপের কারণে দেশের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ রোগীর ধীরে ধীরে কিডনি বিকল বা ক্রনিক কিডনি ডিজিস হয়ে থাকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দেশে কিডনি চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও সুযোগ-সুবিধা নেই। কিডনি প্রতিস্থাপনেও রয়েছে নানা আইনগত বাধা। কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠন বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশন বলছে, ২ কোটির বেশি কিডনি রোগীর বিপরীতে দেশে চিকিৎসকসংখ্যা নামমাত্র। আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী, ৫০ হাজার জনগোষ্ঠীর জন্য একজন নেফ্রোলজিস্ট থাকা দরকার। দেশে নেফ্রোলজিস্ট আছেন মাত্র ১৭০ জন। দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ধরা হলে ১০ লাখ মানুষের জন্য নেফ্রোলজিস্ট আছেন মাত্র একজন করে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মাত্র ৪৩টি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ডায়ালাইসিস সেবা দেয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের ডায়ালাইসিস শয্যা আছে মাত্র ৫৭০টি। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মতে, দেশে প্রায় ৩০-৪০ হাজার মানুষের ডায়ালাইসিসের দরকার পড়ে। সে হিসেবে এ সুবিধা খুবই নগণ্য বলতে হবে। আবার এটা খুবই ব্যয়বহুল। ফলে দরিদ্ররোগীদের পক্ষে এ ধরনের সেবা গ্রহণ প্রায় অসম্ভব। উল্লেখ্য, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে ভুগতে থাকলে চিকিৎসা হিসেবে ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপনকেই প্রধান বিকল্প হিসেবে বেছে নেন চিকিৎসকরা। কিন্তু ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে অধিকাংশ কিডনি রোগী ডায়ালাইসিসের এক বছরের মাথায় খরচ সামলাতে না পেরে ডায়ালাইসিস বন্ধ করে দেন।
অন্যদিকে আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে কিডনি প্রতিস্থাপন। নানা আইনগত জটিলতা ও হয়রানির মুখে পড়ে কিডনি রোগীরা।মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ১৯৯৯ অনুযায়ী শুধু রক্তের নিকটাত্মীয় ছাড়া অন্য কেউ কিডনি দিতে পারে না। মৃতব্যক্তির কিডনি সংগ্রহে আইন সংশোধনের দাবি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। ফলে চাহিদামতো কিডনি না পাওয়ায় ও ডায়ালাইসিস খরচ মেটাতে না পারায় রোগীরা মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। যাদের সামর্থ্য আছে তারা বিদেশে পাড়ি জমায়। এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, কিডনি প্রতিস্থাপনে আইনগত বাধা থাকায় বছরে ৩০০ কোটির বেশি টাকা চলে যায় বিদেশে। এ ধরনের চিত্র নাগরিক কাম্য হতে পারে না। এসব বিষয়ে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ দরকার।
কিডনি রোগ একবারে হয় না, পাঁচটি ধাপে হয়। প্রথম থেকে তৃতীয় ধাপ পর্যন্ত রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা নিলে রোগী সুস্থ হয়ে যায়। তাই কারও কিডনি রোগ শনাক্ত করতে বছরে অন্তত একবার পরিবারের সবাইকে কিডনিসংক্রান্ত পরীক্ষাগুলো করানো দরকার। প্রসঙ্গত, প্রথম দিকে কিডনি রোগের কোনো উপসর্গ থাকে না। কিন্তু যখন উপসর্গ ধরা পড়ে, ততক্ষণে কিডনির প্রায় ৭৫ ভাগই বিকল হয়ে পড়ে। তাই সচেতন এবং সুশৃঙ্খল জীবন যাপনের পাশাপাশি কিডনিসংক্রান্ত পরীক্ষার ব্যপারে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার বলিষ্ঠ কর্মসূচিও থাকা দরকার। কিডনি রোগ প্রতিরোধে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আটটি স্বর্ণালি সোপান মেনে চলার পাশাপাশি নিরাপদখাদ্য গ্রহণ, প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটা, অতিরিক্ত লবণ পরিত্যাগ, ফাস্ট ফুড, চর্বিজাতীয় ও ভেজাল খাবারসহ অবশ্যই ধূমপান বর্জন করাসহ সাধারণ স্বাস্থ্যবিষয়ক কিছু নিয়মকানুন মেনে চললে কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। সরকারের উচিত এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। স্বাস্থ্যসচেতনতা গড়ে উঠলে কিডনি রোগের প্রকোপ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 276 People

সম্পর্কিত পোস্ট