চট্টগ্রাম শনিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২০

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ | ৩:৪৫ পূর্বাহ্ন

অধ্যক্ষ এম সোলাইমান কাসেমী

বাঙালির গৌরবের স্মারক বিজয় দিবস

পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ, নির্যাতনের শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জিত হয়। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ করে বাংলাদেশ। এই দিনটি বাঙালি জাতির জীবনে সর্বোচ্চ গৌরবের একটি অবিস্মরণীয় দিন। জীবন দিয়ে যুদ্ধ করে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে এই বিজয় অর্জিত হয়। যতদিন পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ থাকবে, বাঙালি জাতি থাকবে ততদিন এই দিনটির গুরুত্ব ও সম্মান অক্ষুণœ থাকবে। এই শাসন-শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাঙালি একে একে গড়ে তোলে আন্দোলন-সংগ্রাম। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, ৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০ এর নির্বাচনে বিজয় লাভের মধ্য দিয়ে বাঙালি চূড়ান্ত বিজয়ের লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে তাৎক্ষণিকভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেন। এরপর পরই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। শুরু হয় রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাস ধরে চলে এই যুদ্ধ। পাক হানাদার বাহিনী বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে ভেঙে দিতে শুরু করে বর্বর গণহত্যা। গণহত্যার পাশাপাশি নারীনির্যাতন, ধর্ষণ, শহরের পর শহর, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় হানাদাররা।
এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে এগিয়ে আসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুক্তিকামী মানুষ। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হন। সম্ভ্রম হারান দুই লাখের বেশি মা-বোন। সর্বস্তরের মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও এদেশের কিছু মানুষ, জাতির কুলাঙ্গার সন্তান পাক হানাদার বাহিনীর পক্ষ নেয়। রাজাকার, আল বদর, আল সামস বাহিনী গঠন করে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠে তারা।
বাঙালি জাতির মরণপণ যুদ্ধ এবং দুর্বার প্রতিরোধের মুখে পাকহানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা পরাজয়ের চূড়ান্ত পর্যায় বুঝতে পেরে বিজয়ের দুই দিন আগে জাতির সূর্য সন্তান বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে হত্যা করে। এতেও সহযোগিতা ও সরাসরি অংশ নেয় এ দেশীয় রাজাকার, আল বদর, আল সামস বাহিনী ও শান্তি কমিটির সদস্যরা। বাঙালি জাতির ইতিহাস লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস, আত্মত্যাগের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের পথ ধরেই বাঙালি জাতি পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে। জিন্নাহের দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামক একটি অসম রাষ্ট্রকে বাঙালির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। শুরু হয় পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ, নির্যাতন। দিনের পর দিন বাঙালির ওপর অত্যাচার নির্যাতন ও শোষণ চালাতে থাকে পাকিস্তানি বর্বর শাসকগোষ্ঠী।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে বাঙালি জাতি ঐক্যের সুদৃঢ় দেয়াল রচনা করে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
৭ মার্চ ১৯৭১ সাল। একটি স্মরণীয় দিন। এই দিনে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন-‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। তারপর অতি দ্রুত ঘটনা ঘটতে থাকে এবং পঁচিশে মার্চের রাতে পাকবাহিনী বাংলার ঘুমন্ত মাুষের ওপর হায়নার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় মুক্তি সংগ্রাম। প্রতিরোধ-প্রতিবাদ রূপ নেয় সশস্ত্র সংগ্রামে। সে সংগ্রামের ইতি ঘটে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের ভিতর দিয়ে। বাঙালি জাতির বহুকালের স্বপ্ন এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ভিতর দিয়ে বাস্তবায়িত হয়। তাই এই দিনটিই আমাদের জাতীয় ইতিহাস বিজয় দিবস নামে চিহ্নিত। স্বাধীনতা লাভ করার জন্য মানুষ সংগ্রাম করে। শাসকের অত্যাচার, রক্তচক্ষু সবকিছু উপেক্ষা করে মুক্তিপাগল মানুষ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। জীবন দেয় দেশের জন্য, জাতির জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য। আমাদের দেশের মানুষ সুখে থাকতে চেয়েছিল। তাঁরা মর্যাদা চেয়েছিল। মানুষ হিসেবে আত্মবিকাশের অধিকার চেয়েছিল। কিন্তু সে অধিকার তারা পায়নি-পেয়েছে অবহেলা, বঞ্চনা আর নির্যাতন। তাই তারা আত্মমর্যাদা রক্ষা এবং জাতীয় জীবনে সুখ-শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তির লক্ষ্যে অন্যায়ের প্রতিবাদে মুখর হয়েছে-সংগ্রাম চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছে। নিরস্ত্র মানুষের ওপর অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে পড়ে যে অমানুষিক বর্বরতার পরিচয় পাকসেনারা দিয়েছিল তার তুলনা ইতিহাসে বিরল। তারই প্রতিবাদে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এদেশের মানুষ। সংগঠিত হয় এক পতাকাতলে। জয় বাংলা ধ্বনি তুলে এদেশের মানুষের চেতনায় রোপন করে দেয় স্বাধীনতা লাভের প্রত্যয়ী অঙ্গীকার। সে অঙ্গীকারের ফলশ্রুতিই হলো আমাদের স্বাধীনতা। দীর্ঘ নয় মাস এদেশের মানুষ শক্তিশালী পাক সেনাদের সাথে যুদ্ধ করেছে। যুদ্ধ করেছে এদেশের রাজাকার, আলবদর বাহিনীর বিরুদ্ধে। শেষে এই অসম যুদ্ধে বাঙালির সূর্যসৈনিকেরা জয় লাভ করে। পরাজিত হয় হানাদার বাহিনী। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনের এক চরম ঘটনা। এ যুদ্ধ ছিল আমাদের মরণ-বাঁচার যুদ্ধ। এ যুদ্ধে জয়লাভ করতে না পারলে বাঙালি জাতির অস্তিত্ব বিপন্ন হতো।

চিরকালের জন্য পরাধীনতার শিকল বাঁধা হয়ে যেত এ জাতির মেরুদ-ে। ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনী নয় মাস সংগ্রামের পর আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। তাই এই দিনটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসে বিজয় দিবস হিসেবে চিহ্নিত। বিজয় দিবস আমাদের জাতীয় জীবনে তাৎপর্যবাহী নানা কারণে। এই দিনে আমরা মুক্ত হই বিদেশী আধিপত্যবাদ থেকে, মুক্ত হই নির্যাতন থেকে। আমাদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নতুন পথ খুঁজে পায়।

আমাদের চেতনায় জন্ম দেয় জাতিসত্তার নবতর অনুভব। বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নেয় ‘বাংলাদেশ’ নামক একটি নতুন সার্বভৌম রাষ্ট্র। অতএব, আমাদের জীবনে বিজয় দিবস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন। অনেকগুলো দিন নিয়ে বছর। অনেক বছর নিয়ে যুগ, শতাব্দী। এ সব দিন অলক্ষ্যে চলে যায়। কিন্তু এর মধ্য থেকে একটি দিন স্মৃতিময় হতে থাকে, স্মরণে উজ্জ্বলতা দেয়। আমাদের বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বর তেমনি একটি দিন। এ দিনের স্মৃতি আমাদের মানসে চির উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। এ দিন বিজয়ের-এ দিন আনন্দের, গর্বের এবং বেদনারও।

অধ্যক্ষ এম সোলাইমান কাসেমী এমফিল গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

The Post Viewed By: 75 People

সম্পর্কিত পোস্ট