চট্টগ্রাম রবিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

সর্বশেষ:

১৫ মে, ২০১৯ | ১:৪৬ পূর্বাহ্ণ

আবসার হাবীব

রকমারি ইফতারির এবং রোজায় শহরের চিত্র

চলমান জীবন

রকমারি ইফতারির এবং রোজায় শহরের চিত্র
চলমান জীবন
আবসার হাবীব
রকমারি ইফতারির …….
মাসটি রোজার, তাই ঘরে ঘরে আয়োজন হয় রকমারি ইফতারি। প্রতিদিনই চাই নানান ধরনের বৈচিত্র্যে ভরা ইফতারি। কারণ, প্রতিদিন একই ধরনের ইফতারি খেতে ভাল লাগে না। তবে, পরিবারের সকলে মিলে ইফতারি করার আনন্দই আলাদা। ইফতারি বলতে সাধারণভাবে আমরা বুঝি, সারাদিন রোজা রাখার পর যে খাদ্য গ্রহণ করা হয় তাকে। কোন কারণে রোজা রাখতে না পারলেও ইফতারির সওয়াব আছে। এজন্য কোনো মানুষই ইফতারির সওয়াব হারাতে চায় না।
ইফতারির ছোট্ট একটি তালিকা : খেজুর, চনা, ছোলা, পিঁয়াজু, বেগুনী, আলুর চপ, জিলাপী, মুড়ি, হালিম, সালাদ, চিড়া-কলা-দই, শাকপুড়ি, নুডলস, সেমাই, পরোটা, কাবাব, চিকেন টিক্কা, চটপটি, কাটলেট, সমুচা, হালুয়া, শরবত, পুডিং, ঈসবগুলের ভূসির সরবত, বেলের সরবত, আনারসের সরবত ইত্যাদি। এসবের সাথে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন ধরনের জুস-কমলা, আঙ্গুর ইত্যাদি।
ইফতারিতে একালে আগেকার দিনের পিঠাপুলি একেবারেই উঠে গেছে বললে ভুল হবে না। হাতে বানানো আগেকার দিনের নাস্তা দিয়ে ইফতারি করা এখন প্রায় গল্পের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মচমচে মুড়ি, টমেটো ও খিড়ার সালাদ ছাড়া ইফতারি যে জমে না – এটা অবশ্য বলারও অপেক্ষা রাখে না।
বেগুনি-পিঁয়াজু ……..
পেঁয়াজু-বেগুনি ছাড়া ইফতার হয়না বললেই চলে। তাই, রোজা আসলেই ডাল-বেগুনের দাম বাড়াতেই হবে। বাস্তবতা হচ্ছে বেগুনের দাম কখনো কখনো বেড়ে যাওয়াতে বেগুনের পরিবর্তে অনেকেই আলু ব্যবহার করে। বেগুনি তৈরীর বেসনসহ সমস্ত উপাদান সহকারে এই ইফতারির নামকরণ করেছে ‘আলুনি-বেগুনি’। বেগুনের স্বাধ মেটায় সাধারণ মানুষ কখনও কখনও এই মূল্য-সন্ত্রাসের যুগে আলু দিয়েও। আলুর দাম এখনো সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। ইফতারিতে বেগুনি-পেঁয়াজু না হলে ইফতারিই জমে না। তা ছাড়া এটা মানুষের দীর্ঘ দিনের অভ্যাস। এই অভ্যাসের পেছনের কারণ, হয়তো এক সময় এই দু’টো জিনিস অর্থাৎ বেগুন-পেঁয়াজের মূল্য ছিল কম। সারাদিন রোজার পর এসব ভাজাভুজি খেতে বেশ তৃপ্তিও লাগতো। অবশ্য, ভেজালের যুগে বিশেষ করে অতিরিক্ত তেলের কারণে খাদ্য তালিকা থেকে পেঁয়াজু-আলু-বেগুনি বাদ দিলে মন্দ হয় না।
রোজায় শহরের ভিন্নচিত্র ……
রমজান মাস আসলে রাস্তাঘাটের প্রতিদিনকার অতি চেনা পরিবেশও বদলে যায়। রাস্তায়-বাসে চলাচলরত মানুষের হাতে বিড়ি-সিগারেট থাকে না। হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলো থাকে নীরব। হৈ চৈ, কোলাহল নেই। পানের দোকানও বন্ধ। প্রকাশ্যে পানাহার একেবারেই বন্ধ। কিছু কিছু হোটেল-রেস্তোরাঁয় পর্দা ঝুলিয়ে বিক্রি হয় খাবার-দাবার, পর্দার আড়ালে। এসব দোকানে এই এক মাসে সারা বছরের লাভের চাইতেও বেশী লাভ উঠে আসে। অসুখের কারণে কিংবা বার্ধক্যজনিত কারণে কেউ কেউ রোজা না রাখলেও, অনেকে আবার নানা উছিলায় রোজা রাখে না। কেউ কেউ ঘরে স্ত্রী কিংবা মা, কিংবা ছেলেমেয়ের ভয়ে বা মান-সম্মানের কারণে রাখলেও বাইরে গিয়ে ঐ পর্দার আড়ালে দিনের খাবার সারে। বিকেলে বাসায় ফিরে যথারীতি পরিবারের সাথে ইফতারি করতে বসে যায়। অবশ্য, এদের সংখ্যা খুবই কম। তবে, মেহনতি মানুষের কথা আলাদা। রোজা নিয়ে তাদের ভাবনা থাকলেও অনেকেরই কিছু করার থাকে না।
পুনশ্চ : ইফতার এবং সম্প্রীতি ……
বাংলাদেশে রমজান মাস আসলে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, ছেলেমেয়ের শ্বশুড়বাড়ি, নানার বাড়ি, খালার বাড়ি, বন্ধু-বান্ধবের বাড়ি প্রভৃতি জায়গায় ইফতারি পাঠানোর রেওয়াজটা চোখে পড়ার মতো। কেউ কেউ হয়তো এতে বিরক্ত হয়, অনেকে আবার আনন্দিত হয়। এই নেয়া-দেয়ার মধ্যে নিজেদের ভেতর এক ধরনের ভালোলাগাও ছড়িয়ে পড়ে।
মহল্লায় মহল্লায়, আবাসিক এলাকায় কিংবা পাড়ায় পাড়ায় বিকেলের পর থেকে তরুণ-যুবা-বৃদ্ধ এমন নানা বয়সের লোকজনকে পাত্র অথবা টিফিন কেরিয়ারে ইফতারি নিয়ে ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। আবার অনেকেই আছে অন্য ধর্মালম্বীদের ঘরেও নিয়মিত ইফতারি পাঠিয়ে থাকে, সম্পর্ক কিংবা সম্প্রীতির কারণে। এই সম্প্রীতি চর্চা মানুষের মধ্যে আন্তরিকতা ও সম্পর্ককে করে আরো গভীর। মানুষের এই সম্পর্কের বন্ধন যত দৃঢ় হবে, ততই সমাজে আলো ছড়াবে। এখন আমরা বড়ো বেশি অসহিষ্ণু সময় অতিবাহিত করছি। মানুষের মধ্যে প্রেমবোধ, ভালোবাসা ও সম্পর্কের ঘাটতিপূরণে রোজা সহায়কের ভূমিকা রাখে।
চট্টগ্রামের পুরানো মুসলিম পরিবারে বিশেষ করে বিত্তশালীদের মধ্যে মেয়ের বাড়িতে ইফতারি পাঠানোর ব্যাপারটা এখন আর ঐতিহ্য নয়, প্রতিযোগিতা কিংবা লোক দেখানোর ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই কয়েকদিন আগে এক প্রতিবেশির মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে ইফতার দেয়ার জন্য ট্রাক ভাড়া করে আনা হয়। জানতে চেয়েছিলাম এই গাড়ি কিসের জন্য? জানালো, মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে ইফতারি যাবে তাই। বিশ-ত্রিশ ধরনের ইফতারির এক দীর্ঘ তালিকাও সাথে রাখা হয়েছিল। যাতে কোনোটি মেয়ের বাড়ী নিয়ে যেতে ভুলে না যায়। আবার যে শালাশালী এসব ইফতারি নিয়ে যাবে তাদের জন্যও ছেলেপক্ষ দু’চার-পাঁচ হাজার টাকা বকশিস হাতের কাছে রাখে।
মেয়ে বা ছেলের বাড়িতে ইফতারি দেয়া এসব ছিলো আগেকার দিনের একটা রেওয়াজ। ছেলের শ্বশুর বাড়ি থেকে ইফতারি এসেছে এতে বাড়ির সকলে গর্ববোধ করতো। যে পরিমাণই পাঠানো হোক না কেন এটা ছিল সম্মান দেখানোর রীতি।
এতে ছেলের বউয়ের আলাদা একটা কদর হতো শ্বশুর বাড়িতে। বাপের বাড়ির ইফতারি আসলে মেয়েরও ভাল লাগতো। মুখ উজ্জ্বল হতো তার, বাপের বাড়ির ইফতারির বদৌলতে। এখন অবশ্য দিন পাল্টাচ্ছে। তবে, সম্পূর্ণ বদলে যেতে আরও অনেককাল সময় লাগবে।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট