চট্টগ্রাম শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২০

সর্বশেষ:

১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ | ৪:০৩ পূর্বাহ্ন

অধ্যক্ষ এম সোলাইমান কাসেমী

বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত হোক মানবাধিকার

বিশ্বে অসহায়, নির্যাতিত, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর ৩০টি ধারা সম্বলিত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ জাতিসংঘে গৃহীত হয়েছিল। স্বীকৃত সেই ৩০টি ধারা বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে সমাজ বা রাষ্ট্রে শান্তি বিরাজ করবে।

যুগে যুগে দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার যেমন হয়ে আসছে তেমনি অত্যাচারীদের প্রতিরোধ করার জন্য মানবতাপ্রেমিরাও এগিয়ে এসেছে সর্বদাই। মানবতার কল্যাণে, অসহায়, নিপীড়িত, দুস্থ জনতার পাশে সহানুভূতি ও সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসাই মানবাধিকার কর্মীদের আদর্শ। মানবাধিকার কর্মী সকল বিবেকবান ও হৃদয়বানদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ে মানবাধিকার বাস্তবায়ন হোক বিশ্ব মানবাধিকার দিবসে। মানুষের অধিকার হরণের নিরন্তর খেলায় সারা দুনিয়া জুড়ে যুদ্ধ বিগ্রহ, শোষণ, নির্যাতন, নিষ্পেষণসহ-অস্থিরতা, হত্যা, অপরাধ সব বিষয়াদি দিনে দিনে বেড়ে চলছে।

আজ যদি আমরা পৃথিবীর দিকে চোখ ফেরাই তবে দেখতে পাবো দেশে দেশে যুদ্ধ চলছে। মিয়ানমারে মুসলমানদের পুড়ছে, ইরাক জ্বলছে, জ্বলছে আফগানিস্তান, সিরিয়াসহ অনেক দেশ। ধনীক শ্রেণি গরিব শ্রেণির উপর শোষণ আর নিষ্পেষণের যাঁতাকল চালাচ্ছে। শাসক শ্রেণি আইন ও বিচার বিভাগ কুক্ষিগত করে মানুষের ন্যায্য বিচার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করছে। ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সর্বত্র নানারূপে, নানা আঙ্গিকে আর নানা মাত্রায় বিরাজ করছে। মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাক স্বাধীনতা মৌলিক অধিকার। এই মৌলিক অধিকারগুলোর পাশাপাশি মর্যাদাসম্পন্ন স্বাভাবিক জীবন ও মৃত্যুর অধিকারও যদি সংযুক্ত করা হয়, তবে মানবাধিকার হয়। একজন মানুষ ভাতের অধিকার পাবে, শিক্ষার অধিকার পাবে, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের অধিকার পাবে, বাক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ধর্মীয় অধিকার পাবে। এটাই স্বাভাবিক, এটাই মানবাধিকার।
আমরা যদি আমাদের দেশের প্রেক্ষিতেও পর্যবেক্ষণ করি তবে দেখতে পাবো, ত্রিশ লক্ষ শহীদ আর দুই লক্ষ মা বোনের বলিদান, কোটি মুক্তিযোদ্ধার স্বপ্ন বাংলাদেশ এখনো দারিদ্র্যে আর ক্ষুধায় জর্জরিত এক দেশ, এখনো এদেশের প্রত্যেক শিশুর শিক্ষার ব্যবস্থা হয়নি, যুবকের চাকুরী ও কর্মসংস্থান হয়নি, এখনো মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়নি। মানুষ চায় মানুষের মতো মর্যাদা সম্পন্ন জীবন। আর এসব নিশ্চয়তার জন্য মানুষ সৃষ্টি করেছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রকেই তাই মানুষের অধিকার ও মানবাধিকারের রক্ষা কবচ হয়ে কাজ করতে হবে। আজ সারা পৃথিবীর মতো আমাদের দেশের মানুষ বিশেষত তরুণ প্রজন্ম মানবাধিকার বিষয়ে অনেক সচেতন হয়ে উঠেছে।

আজ দেশের জেলায় জেলায় দেখা যায়, অনেকেই মানবাধিকার সংগঠনের ব্যানারে মানুষের অধিকার আদায়ের ও মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য নানা কর্মকা-ের মাধ্যমে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের অধিকার সম্পর্কে ও মানুষের মর্যাদাসম্পন্ন জীবন যাপনের ন্যায্যতা সম্পর্কে সচেতনতা ও আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানবাধিকারের মূল কথা হলো ‘বাঁচো এবং বাঁচতে দাও’। নিজে মর্যাদা সম্পন্নভাবে বাঁচার অধিকার যেমন সব মানুষের আছে, তেমন অন্যের বাঁচার পথে যাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয় তার দায়-দায়িত্বও প্রত্যেক মানুষের রয়েছে।

যদি সকলে মানবাধিকারের এই প্রতিপাদ্য অনুধাবন করি, তবে অবশ্যই নিজের বেঁচে থাকা ও অপরের বেঁচে থাকার জন্য সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু অর্থ, ক্ষমতা আর ভোগবাদিতার কারণে বা এসবের লোভে আমরা অপরের বেঁচে থাকার অধিকার খর্ব করি এবং অপরকে স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে দিইনা ও অপরের বাঁচার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করি। এই প্রবণতা ও মানসিকতা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আমাদের আরো সৎ ও সাহসী হওয়া প্রয়োজন। আমরা সকলে জাগলে সকলেই চাইলে সকলের অধিকার তথা মানবাধিকার সুরক্ষিত হবে।

মানবাধিকার বিশ্বের কোনো দেশ, গোষ্ঠী, জাতি, ধর্ম ও বর্ণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বিশ্বব্যাপী সকল জাগতিক সম্পর্কের সীমানা পেরিয়ে সকল মানুষের চিরন্তন অধিকার। এই অধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ কারো নেই। শুধুমাত্র আইন তৈরী ও প্রয়োগ করে এ অধিকার রক্ষা করা কষ্টসাধ্য। এই অধিকার রক্ষা তথা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা, মানুষের প্রতি সহানুভূতি, আন্তরিকতা ও সহমর্মিতা।

অধ্যক্ষ এম সোলাইমান কাসেমী এম. ফিল গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

The Post Viewed By: 74 People

সম্পর্কিত পোস্ট