চট্টগ্রাম বুধবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২০

৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ | ৩:৫২ পূর্বাহ্ন

তাপস কুমার নন্দী

আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস সবাই মিলে গড়ব দেশ, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ

দুর্নীতি একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। বর্তমান বিশ^ায়নের যুগে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন দেশে। দুর্নীতির আন্তর্জাতিক প্রভাব উপলব্ধি করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ১৯৯৬ সালে ঘুষ ও দুর্নীতিবিরোধী জাতিসংঘ ঘোষণা গ্রহণ করে। ২০০৩ সালের ৩ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দুর্নীতিবিরোধী সনদ প্রণয়ন করে, যা ২০০৩ সালের ৯ ডিসেম্বর মেক্সিকোতে স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এ কারণে ৯ ডিসেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস’ ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক এ সনদে অনুস্বাক্ষরের ফলে ২০০৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলাদেশ এ গুরুত্বপূর্ণ জাতিসংঘ সনদের অংশীদারি দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

সমাজের সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাধি হলো দুর্নীতি। বর্তমানে সারা বিশ্বজুড়েই দুর্নীতিকে মারাত্মক সামাজিক সংকট ও সমস্যা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তর, প্রতিটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান আজ দুর্নীতির শিকার।

সাধারণভাবে দুর্নীতি হলো যে কোনো নীতিবিরুদ্ধ কাজ। মানুষ যখন তার ন্যায়নীতি, আদর্শ আর মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়ে, আইন অমান্য করে কোনো কাজ করে তখন তাকে দুর্নীতি বলে। মানুষ তার ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত স্বার্থকে হাসিলের উদ্দেশ্যে নিজের নীতিকে বিসর্জন দিয়ে যে কর্মকা- করে সেগুলোই দুর্নীতি। বিশ্বব্যাংকের মতে- ‘ব্যক্তিগত লাভ বা গোষ্ঠীর স্বার্থের জন্য সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার হলো দুর্নীতি।’ অন্যভাবে বলা যায়, দুর্নীতি হলো মানুষের এমন ব্যবহার যা ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে কোনো বিশেষ দায়িত্বে মনোনীত বা নির্বাচিত ব্যক্তিকে তার কাজ যথাযথভাবে করা থেকে বিরত রাখে।

দুর্নীতির প্রকৃতি কিংবা প্রকারকে আমরা তিনটি দিক থেকে দেখতে পারি। প্রথমত, ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের দুর্নীতি। দ্বিতীয়ত সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারিদের দুর্নীতি। তৃতীয়ত: বেসরকারি দুর্নীতি। যখন কোনো দেশ ও সমাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়, মানুষের মধ্যে নীতি নৈতিকতার অভাব হয় তখন দুর্নীতি হয়। সমাজে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে এককভাবে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত এবং তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এককভাবে ক্ষমতা প্রাপ্ত হলেও সেখানে দুর্নীতি হয়। সমাজে জবাবদিহিতার অভাব থাকলে এবং রাষ্ট্রীয় কাজে কিংবা যে কোনো সাধারণ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের বেতন যখন পর্যাপ্ত নয় সেখানে দুর্নীতি হয়। দেশের শাসন, আইন ও বিচার বিভাগ দুর্বল হলে এবং সেখানে কোনো স্বচ্ছতা না থাকলে মানুষ দুর্নীতি করে। আবার যে সমাজে স্বাধীন-গণমাধ্যম থাকে না, সক্রিয় একটি সুশীল সমাজ থাকে না সেখানেও দুর্নীতি অনেক বেশি হয়। দুর্নীতি প্রতিরোধী সঠিক ও কার্যকরী আইনের প্রয়োগের অভাবেও দুর্নীতি হয়। এছাড়া মানুষের দারিদ্র্য আর অর্থনৈতিক অসচ্ছলতাও দুর্নীতির অন্যতম কারণ।

দুর্নীতি এখন সমাজের প্রত্যেক স্তরে প্রবেশ করেছে। তাই আজ প্রায়শই দেখা যায় একটি শিশু বেড়ে ওঠে তার বাবা-মায়ের দুর্নীতির টাকায়। এরপর সে একটি স্কুলে ভর্তি হয়। হয়তো সেখানেও তাকে পড়তে হয় ডোনেশনের আড়ালে ঘুষের দুর্নীতিতে। তারপর সে পাবলিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। ফাস হয়ে যাওয়া প্রশ্নপত্রের সুবাদে খুব ভালো ফলাফল করে। একই উপায়ে হয়তো ভর্তি হয় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে। হয়তো ভালো নম্বর কিংবা বাড়তি কোনো সুবিধা পাবার আশায় সে বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষক কিংবা অফিস কর্মচারিদের সাথে দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়। এরপর সে প্রবেশ করে কর্মজীবনে। তাও হয়তো মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে। এই যে দুর্নীতির চক্রে দুর্নীতির সংস্কৃতিতে সে বড় হয়ে ওঠে তাতে করে তার জীবনে দুর্নীতি স্থায়ী রূপ লাভ করে। সে প্রতিষ্ঠিত হয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে। একসময় সে নামে রাজনীতিতে। দেশ সেবার আড়ালে সে তখন আত্মসাৎ করে জনগণের টাকা, দখল করে সরকারি সম্পদ। ফলে দেখা যাচ্ছে পারিবারিক জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপেই মানুষ দুর্নীতিতে আক্রান্ত ও অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে।

দুর্নীতি সমাজের জন্য সব সময়ই নেতিবাচক। দুর্নীতির কারণে সমাজের সার্বিক উন্নতি ও প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে আমাদের জাতীয় অগ্রগতি বিঘিœত হয়। দুর্নীতির ফলে সমাজের সুবিধাবাদী ও ক্ষতিকর ব্যক্তিদের হাতে অর্থ ও সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়। ফলে এক সময় অর্থের প্রভাবে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব তাদের হাতে চলে যায়। এতে তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে সমাজের অর্থনীতি ও উন্নয়নকে নিয়ন্ত্রণ করে ও নিজেদের সুবিধামত ব্যবহার করে। দুর্নীতির ফলে দেশে কালো টাকার পাহাড় গড়ে ওঠে। যা বিদ্যমান অর্থনীতির উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। দুর্নীতিবাজরা দেশের অর্থসম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার করে। দুর্নীতির কারণে দেশে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। এতে পণ্যের সরবরাহ কমে যায় আর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায়। দুর্নীতি দেশকে আরো বেশি দরিদ্র করে ফলে। দেশের সামাজিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে।

দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধের জন্য অন্যান্য অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও আইন ও দুর্নীতি দমন কমিশন রয়েছে। দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭’ ও ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন-১৯৫৭’ আমাদের দেশে প্রচলিত। প্রথম আইনটি কেউ যেন দুর্নীতিতে জড়িত হতে না পারে সে জন্য করা হয়েছে। এতে দুর্নীতির জন্য শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে। পরের আইনটি দ্বারা অনুসন্ধানের ভিত্তিতে দুর্নীতিগ্রস্তদেরকে চিহ্নিত করা ও শাস্তি দেয়ার কথা বলা হয়েছে। দুর্নীতি দমনের লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন আইন ২০০৩ এর প্রেক্ষিতে ২০০৪ সালে গঠিত হয় দুর্নীতি দমন কমিশন। ২০০৭ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন অর্থাৎ দুদকের পুনর্বিন্যাস করা হয়।

দুর্নীতি যেমন প্রাচীন তেমনি এর শিকড়ও সমাজের অনেক গভীরে প্রথিত। দুর্নীতি আমাদের জাতীয় উন্নয়নে সবসময়ই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। দুর্নীতি যেমন আমাদের অর্থনীতির মেরুদ-কে বিপর্যস্ত করেছে তেমনি বিশ্বের কাছে সেরা দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে আমাদের ভাবমূর্তিকে নষ্ট করেছে। আর তাই এখন সময় এসেছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার। দুর্নীতিকে সমাজ থেকে চিরতরে দূর করার জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। আমাদেরকে তৈরি করতে হবে দুর্নীতি বিরোধী জাতীয় আন্দোলন। আর সচেতনভাবে সেখানে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তবেই আমরা দুর্নীতি প্রতিরোধে সক্ষম হতে পারব। তাই আসুন, দুর্নীতিকে ‘না’ বলার প্রত্যয়দীপ্ত অঙ্গীকার সামনে রেখে আমরা সম্মিলিতভাবে উচ্চারণ করি ‘সবাই মিলে গড়ব দেশ, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ।’

The Post Viewed By: 52 People

সম্পর্কিত পোস্ট