চট্টগ্রাম বুধবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২০

৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ | ৩:৫২ পূর্বাহ্ন

চাই সুচিন্তিত পদক্ষেপ চ্যালেঞ্জে পোশাক খাত

দেশের প্রধান রপ্তানিখাত পোশাকশিল্প এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। দীর্ঘদিন বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রতাপপূর্ণ অবস্থানে থাকলেও নানা কারণে এখন সে প্রতাপ নেই। তৈরি পোশাক রফতানিতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজার চীনের পেছনে কিছুদিন আগেও বাংলাদেশের অবস্থান ছিল। এখন ভিয়েতনামের অবস্থান। আন্তর্জাতিক বাজারে এখন ভিয়েতনামের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। আগামিতে তৃতীয় অবস্থানটিও ধরে রাখা যাবে কিনা সন্দেহ আছে। কারণ ব্যবসায় অনবরত ক্ষতির মুখে পড়ে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ছোট-বড় বিভিন্ন পোশাক কারখানা। ফলে প্রতিদিনই কাজ হারাচ্ছে শ্রমিকরা। সব মিলিয়ে পোশাকখাতে এখন সুবাতাস বইছে না। বরং তীব্র প্রতিযোগিতায় পড়ে এবং বাজার ধরে রাখার লড়াইয়ে চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে পোশাকখাত। দৈনিক পূর্বকোণ আয়োজিত ‘সংকটে গার্মেন্টস শিল্প ও অনাকাক্সিক্ষত ঝুঁকি’ শীর্ষক টেবিল টক-এ গার্মেন্টসপণ্য রপ্তানিকারকদের কণ্ঠেও একই কথা ব্যক্ত হয়েছে। তৈরি পোশাকখাতের এমন চিত্র খুবই অপ্রত্যাশিত ও উদ্বেগকর।
বৃহস্পতিবার পূর্বকোণ সেন্টারের ইউসুফ চৌধুরী কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত টেবিল টকে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র বর্তমান ও সাবেক নেতারা বলেছেন, গত চার দশকের মধ্যে এবারই প্রথম গার্মেন্টসশিল্প এতো গভীর সংকটে পড়েছে। এর আগে সংকটে পড়লেও রপ্তানির হার নেতিবাচক ছিল না। গার্মেন্টসখাতের বর্তমান পরিস্থিতিকে আর সংকট বলার উপায় নেই। এখন বলতে হবে বেঁচে থাকার লড়াই। এবারের ‘ফল’ সিজনে অর্ডার পাওয়ার ব্যাপারেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, কারণটা হচ্ছে লিড টাইম।
সবগুলো অর্ডার চলে যাচ্ছে ভিয়েতনামে। দেশের তৈরি পোশাকখাতের এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী ব্যাংকিং সেক্টরের দুর্বলতার বিষয়সহ নানা দিকও আলোচনায় উঠে এসেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রপ্তানি ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ কমে গেছে। বছরের প্রথম ৯ মাসে বাংলাদেশের চেয়ে ভিয়েতনাম ৩২০ কোটি ডলারের পোশাক বেশি রপ্তানি করেছে। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধিতেও অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
কিছুদিন আগে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র নেতারা বলেছিলেন, বাংলাদেশ থেকে কিছু ক্রয়াদেশ স্থানান্তর হয়ে মিয়ানমার, ভারত, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামে চলে যাচ্ছে। দ্বিতীয় প্রতিযোগী দেশগুলোর স্থানীয় মুদ্রা ডলারের বিপরীতে দুর্বল হয়ে পড়ছে। এতে সেই দেশগুলো বাংলাদেশের চেয়ে প্রতিযোগিতামূলক দরে অর্ডার নিতে পারছে। আছে বিশ্বব্যাপী মন্দাভাবের প্রভাবও। মন্দাভাবের কারণে পোশাকের দর এখন কমতির দিকে। পোশাক বাজারে বৈশ্বিক চাহিদায়ও এক ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিদেশের ক্রেতারা এখন ভ্যালু এডেড পোশাকের দিকে ঝুঁকছেন। বিশ্ববাজারে এখন মেনমেইড ফাইবারের চাহিদা বাড়লেও বাংলাদেশ এখনো কটন ফাইবারের ওপর নির্ভরশীল। তাছাড়া ভালো লজিস্টিক সাপোর্ট, বন্দরসুবিধাসহ অন্যান্য কারণে রপ্তানি আদেশ ভিয়েতনামে বেশি যাচ্ছে। প্রযুক্তিগত কারণে ভিয়েতনামের শ্রমিকদের সক্ষমতাও বাংলাদেশের শ্রমিকের চেয়ে বেশি। আবার মিয়ানমার, ইথিওপিয়াসহ অন্য অনেক দেশও পরিবর্তিত বৈশি^ক চাহিদার আলোকে নিজেদের তৈরি পোশাকখাতে আধুনিকায়ন এনেছে, বাড়িয়েছে নানা ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা ও সুযোগ-সুবিধা। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের নতুন অর্ডার এসব দেশের দিকে চলে যাচ্ছে। এতেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাকখাতে চাপ তৈরি হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আগের থেকে কম অর্ডার নেয়া, দেশে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়াসহ আরো অনেক কারণও আছে।
আমরা মনে করি, তৈরি পোশাকখাতের সংকট নিয়ে আর নির্লিপ্ত থাকার সুযোগ নেই। এখনই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই খাতটির দুর্দশার বিষয়টি আমলে নিয়ে যুক্তিপূর্ণ প্রতিবিধান উদ্যোগ নেয়া জরুরি। মুখ থুবড়ে পড়ার আগেই বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে কীভাবে অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাকখাতকে বিশ^বাজারের কর্তৃত্বপূর্ণ অবস্থানে নেয়া যায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে সে ব্যাপারে সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিতে হবে। তৈরি পোশাকখাতে বর্তমানে ৪০ লক্ষ মানুষ কাজ করছে, যার ৮০ ভাগই নারীশ্রমিক। গাফিলতির কারণে খাতটি ধংস হয়ে গেলে জাতীয় অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্রেই এর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সব বিবেচনায় সরকারকে এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে এখনই বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।

The Post Viewed By: 37 People

সম্পর্কিত পোস্ট