চট্টগ্রাম সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ | ৪:১০ পূর্বাহ্ন

প্রফেসর ড. মো. আবু তাহের

বিশ^বিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং ও শিক্ষার মান

জ্ঞানচর্চা, জ্ঞান সৃষ্টি ও নতুনত্ব উদ্ভাবনের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হচ্ছে বিশ^বিদ্যালয়। তাই বিদগ্ধজন বিশ^বিদ্যালয়কে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের সূতিকাগার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সম্প্রতি লন্ডনভিত্তিক টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) নামক একটি সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমপেক্ট নিয়ে বিভিন্ন মানদ-ের আলোকে বিশে^র ৯২টি দেশের ১,৩০০টি বিশ^বিদ্যালয় নিয়ে একটি র‌্যাংকিং বা ক্রমতালিকা প্রকাশ করেছে, যেখানে ১,০০০টির মধ্যে বাংলাদেশের কোন বিশ^বিদ্যালয় স্থান পায়নি। এমনকি এশিয়ার ৪১৭ টি বিশ^বিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের একটি বিশ^বিদ্যালয়ের নামও নেই। অথচ উক্ত র‌্যাংকিং-এ ভারতের ৩৬টি, পাকিস্তানের ৭টি ও শ্রীলংকার ১টি বিশ^বিদ্যালয় জায়গা করে নিয়েছে। বাংলাদেশের বিশ^বিদ্যালয়ে চার দশকের অধিক সময় অধ্যয়ন, শিক্ষকতা ও শিক্ষাপ্রশাসনে জড়িত থাকার সুবাদে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, এতে আমি মোটেই বিস্মিত হয়নি, বাস্তবে যা হওয়ার তাই হয়েছে।

মূলত: টাইমস হায়ার এডুকেশন শিক্ষার পরিবেশ ৩০%, গবেষণার সংখ্যা ও মান ৩০%, গবেষণার ফলাফল সাইটেশন বা উদ্বৃতি ৩০%, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বা সংশ্লিষ্টতা ৭.৫% এবং গবেষণার ফলাফল বানিজ্যিকীকরণ ২.৫% এর পাঁচটি মানদ-কে বিভিন্ন চলকের ভিত্তিতে বিচার-বিশ্লেষণ করে প্রতিটি বিশ^বিদ্যালয়ের স্কোর নির্ধারণপূর্বক র‌্যাংকিং প্রকাশ করে থাকে। এ র‌্যাংকিং লন্ডনের একটি শিক্ষাবিষয়ক সাময়িকীতে প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায় অনেক লেখালেখি হয়েছে। কেউ দুষছেন রাজনীতিকে, কেউ দুষছেন শিক্ষকদের, আবার কেউ ছাত্রদের। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রণালয় কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আত্মপর্যালোচনার জন্য কোন বৈঠক করেছেন কিনা তা আমার জানা নেই। আমাদের বিশ^বিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং-এ নাম থাকে না এবং থাকলেও তলানিতে তা পর্যালোচনা করে আত্ম-উন্নতির জন্য আশু করণীয় পদক্ষেপ নেয়া অতীব জরুরী। অন্যথায় জিডিপি ডাবল ডিজিটে উন্নিত করেও উন্নয়নকে টেকসই করা যাবে না। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গবেষণার জন্য বিশ^বিদ্যালয় বাজেটে অপ্রতুল বরাদ্দ, শিক্ষা ও গবেষণার প্রতিকুল পরিবেশ, ছাত্র-শিক্ষকদের অতিমাত্রায় রাজনীতিকরণ বিশ^বিদ্যালয় জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞান সৃষ্টির কার্যক্রমকে অনেকাংশে বিঘিœত করেছে, যার জন্য আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং-এ বিশ^বিদ্যালয়ের অবস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। তাই শিক্ষাখাতে ইউনেস্কো সুপারিশ অনুযায়ী জিডিপি’র কমপক্ষে ৭ শতাংশ আর উচ্চশিক্ষায় জিডিপি ২ শতাংশ বরাদ্দসহ ছাত্র-শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রেখে শিক্ষা ও গবেষণার কাজকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের মেধা কোন অংশে উন্নত দেশের শিক্ষার্থীদের চেয়ে কম নয়। ক্ষেত্রবিশেষে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেলে তাঁরা প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছেন। পত্রিকান্তরে জানা গেল, ইদানিং বিশ^বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষকের, যোগ্যতা, নিষ্ঠা ও নৈতিকতার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতার পরিবর্তে স্বদলপ্রীতি, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি, পদোন্নতিতে গবেষণা ও প্রকাশনার শৈথিল্যতা, উন্নয়ন কর্মকান্ডের টেন্ডারে ছাত্র-প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সমন্বিত অসাধুপন্থা অবলম্বন ইত্যাদি ক্যাম্পাসে নিত্যনৈমিত্তিক অনুসর্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমতাবস্থায় জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও স্বাধীন চিন্তার অনুশীলন সম্ভব নয়।
বর্তমানে দেশে পাবলিক ও প্রাইভেট মিলে ১৩৪টি বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। আগামীতে এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হল উক্ত বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকতা করার জন্য এত যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক পাওয়া যাবে কি? যদি পাওয়া না যায় তবে পার্টটাইমার কিংবা নি¤œ যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক ¯œাতক ও ¯œাতেকোত্তর পর্যায়ে ক্লাস নেবেন। এতে শিক্ষার মান যাই হোক না কেন, ছাত্র-ছাত্রীদের সনদপ্রাপ্তিতে বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত ঘটবে না, যা ইতিমধ্যে দৃর্শ্যমান হচ্ছে।

টিএইচই র‌্যাংকিং সংক্রান্ত প্রতিবেদনটির বিষয়ে অদ্যাবধি বাংলাদেশের কোন বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জোরালো ভাবে বলেননি যে, ‘আমরা এ র‌্যাংকিংয়ের থোড়াই কেয়ার করি’। আমাদের বিশ^বিদ্যালয়ে অমুক গবেষক নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন, প্রতি বছর হাজার হাজার গবেষণাধর্মী পেপার পিয়ার রিভিউ জার্নালে প্রকাশিত হচ্ছে, এগুলো পেটেন্ট ইতিমধ্যে ফাইল করা হয়েছে। আমাদের অনেক শিক্ষক আন্তর্জাতিক মানের, তাঁরা বিভিন্ন জার্নালের এডিটর বা এডিটরিয়াল বোর্ডের সভাপতি, প্রতিবছর আমাদের শত শত পিএইচডি বের হয়, অনেক দেশ থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা আমাদের বিশ^বিদ্যালয়ে নিয়মিতভাবে পড়তে আসে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য আমরা এগুলোর কিছুই বলতে পারছি না। তাই সোস্যাল মিডিয়া, খবরের কাগজ নিত্যদিন প্রকাশিত গালমন্দ-অপমান আমাদের সহ্য করতে হচ্ছে। অবস্থাদৃষ্ঠে মনে হচ্ছে বহিঃবিশে^র সামনে আমাদের বিশ^বিদ্যালয়গুলো ধতর্ব্যরে মাঝেই নেই। প্রসঙ্গক্রমে ২০১৬ সালে বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষার মান নিয়ে কমনওয়েলথ অব লার্নিং এর উদ্যোগে পরিচালিত একটি প্রকল্পের কথা উল্লেখ করতে চাই। প্রকল্পটির নাম ছিল ঈড়সসড়হবিধষঃয ড়ভ খবধৎহরহম জবারবি ধহফ ওসঢ়ৎড়াবসবহঃ গড়ফবষ (ঈঙখ জওগ)। উক্ত প্রকল্পে আমি ওহঃবৎহধষ াবৎরভরবৎ এবং অস্ট্রেলিয়ার ঈযধৎষবং ঝঃঁধৎঃ টহরাবৎংরঃু এর চৎড়ভবংংড়ৎ উৎ. চযরষরঢ় টুং ছিলেন ঊীঃবৎহধষ াবৎরভরবৎ। উক্ত প্রকল্পে আমরা ৪৯ টি নির্দেশকের আলোকে বাউবি’র একাডেমিক প্রোগ্রামসমূহ পর্যালোচনা করি। পরবর্তীতে উক্ত নির্দেশকসমূহকে প্রধানত ছয়টি ভাগে-যেমন (১) শিক্ষার্থীসহ অংশীজনের সাথে যোগাযোগ (ঈড়সসঁহরপধঃরড়হ), (২) চাহিদামুখী প্রোগ্রাম ডিজাইন (ঘববফং ঙৎরবহঃধঃরড়হ) (৩) শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তিকরণ (খবধৎহবৎং ঊহমধমবসবহঃ), (৪) নুতনত্ব ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি (ওহহড়াধঃরড়হ ধহফ ঈৎবধঃরারঃু), (৫) বিশ^বিদ্যালয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি (ঈধঢ়ধপরঃু ইঁরষফরহম), এবং (৬) গুণগতমান ব্যবস্থাপনা (ছঁধষরঃু গধহধমবসবহঃ) বিভক্ত করে একাডেমিক প্রোগ্রামের মান উন্নয়নের জন্য ১৮টি সুপারিশ মালা উপস্থাপন করা হয় যা অন্যান্য বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য বলে আমি মনে করি। নি¤েœ উক্ত সুপারিশগুলো উল্লেখ করা হল।

১। বিশ^বিদ্যালয়ের বাজেটে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থের বরাদ্ধ নিশ্চিতকরণ; ২। দেশের কিছু বিশ^বিদ্যালয়কে জবংবধৎপয টহরাবৎংরঃুতে রূপান্তরের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ; ৩। উচ্চমান সম্পন্ন গবেষণাকর্ম প্রকাশের জন্য শিক্ষকদের প্রণোদনা প্রদান; ৪। ক্লাসে পাঠদান নিয়মিতকরণ, ক্লাসে ছাত্র-শিক্ষক উভয়ের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ এবং পাঠদান প্রক্রিয়াকে উপভোগ্য, আনন্দদায়ক ও অনুসন্ধিৎসাময় করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ; ৫। বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষাকে গবেষণাধর্মী করার জন্য ¯œাতক পর্যায়ে পাঠ্যক্রমে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ইনন্টার্নশীপ, কেসস্ট্যাডি, শিল্পসফর ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা; ৬। বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ যাতে দেশের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে গবেষণা করতে পারে সেজন্য সরকার কর্র্র্র্তৃক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ; ৭। গবেষণার ফলাফলকে বৃহত্তর সমাজের কল্যাণে বাণিজ্যিকিকরণ তথা ব্যবহার করা; ৮। বিশ^বিদ্যালয়ের সাথে গ্লোবাল একাডেমিক কমিউনিটির সমন্বয় ও সহযোগিতা বৃদ্ধিকরণ; ৯। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল উদ্যোগকে উৎসাহিতকরণ ও পুরষ্কৃত করা ; ১০। শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক ও মানবিক গুণাবলী বিকাশের স্বার্থে ক্রীড়া, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, ওয়ার্কশপ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ইত্যাদিতে অংশগ্রহণকে উৎসাহিতকরণ; ১১। বিশ^বিদ্যালয়ের আইনগত ক্ষমতার আওতায় নিয়মনীতি প্রয়োগ করে শিক্ষার্থীদের যতদূর সম্ভব দলীয় রাজনীতি দূরে রাখা; ১২। বিশ^বিদ্যালয়ের সাথে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, পেশাগত সংস্থা, কমিউনিটি এর সাথে সহযোগিতা স্থাপন করা; ১৩। শ্রেষ্ঠ শিক্ষক পুরষ্কার, শ্রেষ্ঠ গবেষক পুরষ্কার শ্রেষ্ঠ কর্মকর্তা পুরষ্কার, শ্রেষ্ঠ কর্মচারী পুরষ্কার ও শিক্ষার্থীদের জন্য ডিন্স এ্যাওয়ার্ড ইত্যাদি প্রবর্তন করা; ১৪। অভিজ্ঞ শিক্ষক কর্র্তৃক প্রশ্নপত্র প্রণয়ণ এবং মডারেশনসহ অভিন্ন প্রশ্নপত্রের (যেখানে একের অধিক সেকশান রয়েছে) সাহায্যে শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র মূল্যায়ণ করা; ১৫। শিক্ষকদের মানোন্নয়নের নিমিত্তে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য ঈবহঃবৎ ভড়ৎ ঞবধপযরহম ঊীপবষষবহপব স্থাপন করা; ১৬। মান নিশ্চিতকরণ কেন্দ্রের সহায়তায় মান নিশ্চিতকরণ ফ্রেইমওয়ার্ক প্রস্তুত ও তার বাস্তবায়ন নিশ্চিতকরণ; ১৭। শিল্প তথা পেশাগত সংস্থার প্রতিনিধিদের বিভাগের একাডেমিক/কারিকুলাম কমিটিতে অন্তর্ভুক্তিকরণের মাধ্যমে একাডেমিক প্রোগ্রামসমূহ নির্দিষ্ট সময় অন্তর পর্যালোচনাপূর্বক আধুনিকীকরণ করা, এবং ১৮। বিশ^বিদ্যালয়ে আধুনিক আইটি সমৃদ্ধ তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত এবং তাদের মূল্যায়ণ রিপোর্ট অভিভাবকদের নিয়মিত অবহিতকরণসহ বিশ^বিদ্যালয় সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যাদি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে বিস্তরণ করা।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সংখ্যাগত উন্নয়ন বেশ চমৎকার হয়েছে সত্য, কিন্তু মানের উন্নয়ন সেভাবে হয়নি। এমনকি বর্তমানে বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানের ক্রমাবনতি তার দায় ছাত্র-শিক্ষক ও সরকার কেউই এড়াতে পারবে না। তাই পরষ্পরকে দোষারোপ নয় বরং দায় স্বীকার করেই সমন্বিত নীতিমালা ও কৌশলগত পরিকল্পনা প্রনয়ণপূর্বক যথাযথ বাস্তবায়নে সকলকেই আরো সক্রিয় হতে হবে। এতে বিশ^বিদ্যালয়গুলো যেমন জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞান সৃষ্টির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হবে, তেমনি র‌্যাংকিংসহ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-৪ (ঝউএ৪) অনুযায়ী শিক্ষার মান বজায় রাখা সম্ভব হবে।

প্রফেসর ড. মো. আবু তাহের শিক্ষক, ম্যানেজমেন্ট বিভাগ; সাবেক ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

The Post Viewed By: 60 People

সম্পর্কিত পোস্ট