চট্টগ্রাম বুধবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২০

৩০ নভেম্বর, ২০১৯ | ২:১২ পূর্বাহ্ন

জনকাক্সিক্ষত পদক্ষেপ নিন বাণিজ্যপ্রবণতায় বিপন্ন সবুজ চত্বর

ইট-কংক্রিটের এই নগরীতে আজ বৃক্ষ-তরুলতা ও সবুজের বড়ই অভাব। সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও জনসচেতনতার অভাবে আজ বিপন্নপ্রায় নগরীর প্রকৃতি ও পরিবেশ। সবুজবিনাশী নানা কর্মকা-ের পরিণামে আজ নগরীর বৃক্ষ ও তরুলতার সংখ্যা ও পরিমাণ নেমে এসেছে আশঙ্কাজনক পর্যায়ে। নগরীতে যে কয়টা সবুজ চত্বর ছিল তাও আজ নেই বললেই চলে। বাণিজ্যপ্রবণ চিন্তা-চেতনার শিকার হয়ে নগরীর অসংখ্য সবুজ চত্বরই হারিয়ে গেছে আজ। সেসব স্থানে গড়ে উঠেছে নানা বাণিজ্যিক স্থাপনা। এখনও যে কয়টা অস্তিত্বশীল আছে সেগুলোও বিপন্নতার প্রহর গুণছে। নগরপ্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের অবিবেচক সিদ্ধান্তের বলি হয়ে এসব সবুজ চত্বরও যে একদিন নাই হয়ে যাবে না, তা নিশ্চিত করে বলা দুষ্কর। অথচ বিষাক্ত কার্বন গ্রহণ করে প্রতিনিয়ত অক্সিজেন সরবরাহের মাধ্যমে নগরবাসীর শ্বাস-প্রশ্বাস সচল রাখতে এসব সবুজ চত্বরের ভূমিকা অনন্য। কিন্তু অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে ভাববার ফুরসত নেই নগরপ্রশাসনসহ কারো। এসব বিষয় উঠে এসেছে সার্কিট হাউস সংলগ্ন সবুজ চত্বরের বিলুপ্তি ও নগরপ্রশাসনের দায় নিয়ে গত বুধবার দৈনিক পূর্বকোণসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাঠকপ্রিয় পত্রিকায় একযোগে প্রকাশিত ‘অধরাই থেকে যাচ্ছে মধ্যনগরীতে সবুজ চত্বর, চসিকের কাছে বাণিজ্যিক স্বার্থই বড়!’ শীর্ষক অভিন্ন এক প্রতিবেদনে।

১৯৯২ খ্রিস্টাব্দেও সার্কিট হাউস সংলগ্ন বড় জায়গাটি ছিল খোলা সবুজ চত্বর। সাধারণ মানুষ সেখানে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে পারতো। কিন্তু তৎকালীন সিটি মেয়র রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ বিবেচনায় সার্কিট হাউস সংলগ্ন উন্মুক্ত সবুজ চত্বরটি শিশুপার্ক হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দের ২৮ নভেম্বর থেকে প্রতিমাসে ৭৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ‘ভায়া মিডিয়া বিজনেস সার্ভিসেস’ নামের একটি প্রতিষ্টানকে শিশুপার্কটি ২৫ বছরের জন্যে লিজ দেয়া হয়। কিছু নিম্নমানের রাইড নিয়ে চালু হয় শিশুপার্কটি। পরিবেশবাদীরা বিভিন্ন সময়ে শিশুপার্ক অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে সবুজ চত্বরটির আদি অবয়ব ফিরিয়ে দিতে প্রশাসওনের কাছে জোর দাবি জানালেও তা আমলে নেয়া হয়নি কখনো। তবে বর্তমান নগরপিতার পরিবেশবান্ধব মনোভাবের কারণে পরিবেশকর্মী ও সচেতন নগরবাসীর আশা ছিলো শিশুপার্কটির ২৫ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুনভাবে বরাদ্দ না দিয়ে জায়গাটিকে পূর্বের সবুজ চত্বরের রূপ ফিরিয়ে দেয়ার সুচিন্তিত পদক্ষেপ নেয়া হবে। সেখানে নগরীর সবচেয়ে বড়ো সবুজ চত্বর হিসেবে বিনির্মাণের উদ্যোগ নেবে চসিক। কিন্তু চলতি মাসের ২৭ তারিখ শিশুপার্ক হিসেবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যখন সার্কিট হাউস সংলগ্ন সবুজ চত্বরটির পূর্বরূপ ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে নগরপ্রশাসনের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি, উল্টো ফের ১৫ বছরের জন্য বরাদ্দ নবায়ন করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, তখন সচেতন নগরবাসী হতাশ না পারেন না। উল্লেখ্য, নির্বাচিত হয়ে বর্তমান সিটি মেয়র যখন ‘গ্রিন সিটি ক্লিন সিটি’ কনসেপ্ট বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন, তখন পরিবেশ সচেতন মানুষ আশান্বিত হয়েছিল এই ভেবে যে, এবার হয়তো বুঝি নগরীর সবুজ চত্বরগুলোর সুরক্ষা হবে, জোরদার হবে সবুজায়ন আন্দোলন। নগরপিতা কিছু পরিবেশবান্ধব কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নও করছেন। তবে তা যেভাবে হওয়ার কথা সেভাবে হচ্ছে না। বিশেষ করে বাণিজ্যিক প্রবণতায় হারিয়ে যাওয়া সবুজ চত্বরগুলোর পুনরুদ্ধারে নাগরিককাক্সিক্ষত পদক্ষেপ দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। এমনটি নাগরিক কাম্য নয়।

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চসিকের এস্টেট অফিসার দাবি করেছেন ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে প্রতিারক্ষা মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন প্রায় তিন একর আয়তনের এই জায়গাটি সিটি করপোরেশনকে বরাদ্দ দেয়া হয় পার্ক করার জন্য। তাই পার্ক ছাড়া অন্য কোনো কাজে তা ব্যবহার করা যাবে না। এই দাবিকে যুক্তিসংগত বলা দুষ্কর। জনস্বার্থে চসিক চাইলে শিশুপার্ক অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে জায়গাটিকে উন্মুক্ত বা সংরক্ষিত সবুজ চত্বর হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের প্রকাশিত সিডিএ’র ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানেও (ড্যাপ) পার্কটি সরিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে। এই স্থানটি উন্মুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে এবং তা সিভিক স্কয়ার হিসেবে রাখার প্রস্তাবনা রয়েছে। পরিবেশবাদীরা তো বটেই, নগরপরিকল্পনাবিদ, স্থপতি ও শিক্ষাবিদসহ সবাই জনস্বার্থে শিশুপার্কটি শিশুবান্ধব কোনো স্থানে সরিয়ে নিয়ে সবুজ চত্বরটির পূর্ব রূপ ফিরিয়ে দেয়ারর পক্ষে মত দিয়েছেন।

ব্যস্ত নাগরিক জীবনে একটুখানি সুযোগ মিললেই মানুষ ছুটে যেতে চান সবুজ সান্নিধ্যে; খুঁজে পেতে চান প্রশান্তির ছোঁয়া ও ছায়া। কাজেই বিষয়টি মাথায় রেখেই সব পদক্ষেপ নেয়া উচিত। সার্কিট হাউস সংলগ্ন সবুজ চত্বরকে সুপরিকল্পনায় পুনরুজ্জীবন দিলে, পাশাপাশি ইট-পাথরের এই নগরীতে নানা স্থানে খ- খ- সবুজ চত্বর তৈরি করে বিশুদ্ধ বাতাস গ্রহণের সুযোগ দিতে পারলে নগরজীবন তো গুণগতভাবে অনেক সুন্দর হবে, একইসঙ্গে নগরপিতার ‘গ্রিন সিটি ক্লিন সিটি’ কনসেপ্টের বাস্তবায়নও সহজতর হবে। মনে রাখা দরকার, নগর মানেই শুধু ইট, কাঠ, পাথরের বসতি বা যান্ত্রিকতা নয়। একটি নগরীর গড়ে ওঠা নগরবাসীর শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। একটি সুষ্ঠু সুন্দর পরিকল্পিত নগরী, সুস্থ ও দক্ষ মানবগোষ্ঠী গড়ে তুলতে সহায়ক। তাই সবুজ উদ্যানগুলোর সুরক্ষার পাশাপাশি নতুন নতুন সবুজ চত্বর গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দেয়া জরুরি। একইসঙ্গে নগরীর খেলার মাঠগুলোর সুরক্ষা এবং পর্যাপ্ত বিনোদনকেন্দ্র নির্মাণও অত্যাবশ্যক। আমাদের বিশ^াস, নগরপিতা নগরবাসীর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার কথা চিন্তা করে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপই নেবেন।

The Post Viewed By: 48 People

সম্পর্কিত পোস্ট