চট্টগ্রাম বুধবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২০

২৯ নভেম্বর, ২০১৯ | ২:৩০ পূর্বাহ্ন

ডা. মোহাম্মদ ওমর ফারুক

প্রযুক্তির ব্যবহার-অপব্যবহার

বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের অধিকাংশের কাছেই রয়েছে এনড্রয়েড সেলুলার ফোন। পুরো বিশ্ব আমাদের হাতের মুঠোয় এখন। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তে দেখা যায় মেগা গ্লাস সমৃদ্ধ বড় বড় সেলুলার ফোন, যার সংস্পর্শে সারা পৃথিবীর চিত্র পাওয়া যায়। একজন বিশেষজ্ঞ হিসাবে বলতে চাই, চেম্বারে অধিকাংশ রোগী কানের প্রচ- ব্যথা নিয়ে আসেন। ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার পর কোন কিছু খুঁজে পাই না, পরে জানতে পারি, সংশ্লিষ্ট রোগী অধিকাংশ সময় ব্যবসায়িক কাজে অথবা প্রবাসীদের সাথে কথোপকথন অথবা মিউজিক শোনা ইত্যাদির কারণে এ মারাত্মক ব্যথাটি হয়ে থাকে। শব্দ-তরঙ্গ বহিঃকর্ণের ভেতর প্রবেশ করে ঃুসঢ়ধহরপ সবসনৎধহব (যে পর্দা বহিঃকর্ণকে মধ্যকর্ণ থেকে পৃথক করে) হয়ে মধ্যকর্ণে অবস্থিত ৩টি ছোট ছোট অস্থির (সধবষষবঁং, রহপঁং, ংঃধঢ়বং) মাধ্যমে অন্তঃকর্ণে প্রবেশ করে। অন্তঃকর্ণে রয়েছে চবৎরষুসঢ়যধঃরপ এবং বহফড়ষুহঢ়যধঃরপ ভষঁরফ নামক এক ধরণের তরল পদার্থ, শব্দ-তরঙ্গ এ তরল পদার্থের সংস্পর্শে আসলে তা প্রকম্পিত হয়।

উক্ত তরল পদার্থের মাধ্যমে অসংখ্য ¯œায়ুরজ্জুর সাহায্যে শব্দ-তরঙ্গ কেন্দ্রীয় ¯œায়ুতন্ত্রে সংকেত পাঠায় আর তখনি সেই শব্দটা আমরা শুনতে পাই এবং এটি হয়ে থাকে কয়েক মিলিসেকেন্ড এর মধ্যে।

যারা অতিরিক্ত ফোনে কথা বলেন, তাঁদের মোবাইলের বষবপঃৎড়সধমহবঃরপ ধিাব সরাসরি ¯œায়ুতন্ত্রে শব্দ-তরঙ্গ পাঠায়। অতিকথন এর কারণে কেন্দ্রীয় ¯œায়ুতন্ত্রে অবস্থিত ঢ়ধরহ পবহঃবৎ বার বার ত্বরান্বিত হয়। ফলে সংশ্লিষ্ট মোবাইল ব্যবহারকারীর কানে প্রচ- ব্যথা অনুভূত হয় আর যারা রাতভর কানে হেড-ফোন দিয়ে গান শোনেন তাদের অবস্থা এর চেয়েও মারাত্মক হতে পারে। যেহেতু এনড্রয়েড ফোনে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের অপ্শন যেগুলো ব্যবহার করে বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকালাপ সম্পাদন করা বিচিত্র কিছুই নয়। ফলশ্রুতিতে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া ছাত্র-ছাত্রীরা গভীর রাতে ঘুমায় আর অনেক দেরীতে উঠে। এতে মেধা বিকাশ যেমন বাধাগ্রস্ত হয় তেমনি অসৎ পথে যাওয়ার প্রবণতাও বৃদ্ধি পেতে থাকে আর ধর্মীয় মূল্যবোধে দেখা দেয় চরম অবক্ষয়। একসময় দেখা যায়, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারকারীরা ংবহংড়ৎরহবঁৎধষ ফবধভহবংং-এ আক্রান্ত হয়। এ ধরণের বধিরতার চিকিৎসা হচ্ছে: কৃত্রিম শ্রবণযন্ত্র ব্যবহার অথবা পড়পযষবধৎ রসঢ়ষধহঃ প্রতিস্থাপন। ছাত্র-ছাত্রীদের অসৎ পথে যাওয়ার মূল কারণ: আধুনিক প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার, এ প্রযুক্তি যেমনি বিশ্বকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে-তেমনি অশান্তির দাবানলে পুড়ে ছারখার হচ্ছে সারাদেশ, সারা পৃথিবী।

যুব সমাজকে আজকাল দেখা যায় না ফজরের জামাতে অথচ ফজরের নামাযের মাধ্যমে আকাশের মালিক মহান রাব্বুল-আ’লামিন ওই নামাজীর সারাদিনের জিম্মাদারী নিয়েছেন। কেয়ামতের কঠিন ময়দানে ৫টি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সব মানুষদের। এর মধ্যে অন্যতম প্রশ্ন হচ্ছে, ‘যৌবনকাল কিভাবে কাটিয়েছ?’ এ প্রশ্নের উত্তর আজকাল যে সমস্ত যুবক অসৎ পথে পদচারণা করছে তাদের কাছ থেকে মিলবে না। এর পেছনে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়ী অভিভাবকম-লী। এ অভিভাবকদের উদ্দেশ্য করে আল্লাহতায়ালা বলছেন, ‘হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা নিজেদের ও নিজেদের পরিবার পরিজনদের (জাহান্নামের সেই কঠিন) আগুন থেকে বাচাঁও, তার জ্বালানি হবে মানুষ আর পাথর, (সে) জাহান্নামের (প্রহরা যাদের) ওপর (অর্পিত), সেসব ফেরেশতারা হচ্ছে নির্মম ও কঠোর, তারা আল্লাহতায়ালার কোনো আদেশই অমান্য করবে না, তারা তাই করবে যা তাদের করার জন্যে আদেশ করা হবে’- সূরা আত্ তাহরীম আয়াত-৬। আরেকটি প্রশ্ন করা হবে কঠিন বিচারের দিনে-‘অর্জিত অর্থ কোন খাতে ব্যয় করেছ?’ এ কঠিন প্রশ্নের উত্তরও কেউ দিতে পারবে না সেদিন। আজ চারদিকে মাদকের যথেচ্ছ ব্যবহার, ইয়াবা সেবন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি-লুটতরাজ, ইভটিজিং যেন মহামারী আকারে ছড়িয়েছে আমার সোনার দেশে। আজ অভিভাবক, শিক্ষক, মুরব্বীদের প্রতি নেই কোন শ্রদ্ধাবোধ। অশ্লীলতা, বেহায়াপনা আর ব্যভিচারের কবলে এ দেশ। ব্যভিচারের কারণেই ঐশী নামক এক কলেজ ছাত্রী খুন করেছে তার পুলিশ কর্মকর্তা পিতা ও তার মাকে। তাবারানীতে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা.) বলেন, পাঁচটি পাপের পাঁচটি শাস্তি। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা.), কোন পাঁচটি অপরাধের কোন পাঁচটি শাস্তি? রাসূল (সা.) বললেন, (ক) যখনই কোন জাতি অঙ্গীকার ভংগ করবে, আল্লাহ তাদের শত্রুকে তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেবেন, (খ) যখনই কোন জাতি আল্লাহর নাযিল করা বিধান ছাড়া অন্য কিছু অনুসারে শাসনকার্য পরিচালনা করবে, আল্লাহ তাদের ভেতরে দারিদ্রকে সর্বব্যাপী করে দেবেন, (গ) যখনই কোন জাতির ভেতর অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও ব্যভিচারের প্রচলন ঘটবে, আল্লাহ তাদের মধ্যে মৃত্যু (অর্থাৎ অস্বাভাবিক ও অপরিণত বয়সে মৃত্যু) ব্যাপক করে দেবেন (কোন কোন বর্ণনায় মৃত্যুর পরিবর্তে ‘মস্তিষ্ক বিকৃতি’র উল্লেখ আছে), (ঘ) যখনই কোন জাতি মাপে ও ওজনে কমবেশী করবে আল্লাহ তাদেরকে দুর্ভিক্ষ ও অজন্মার কবলে ফেলবেন, (ঙ) যখনই কোন জাতি যাকাত দেয়া বন্ধ করবে আল্লাহ তাদেরকে অনাবৃষ্টির কবলে ফেলবেন।’

কেয়ামতের কঠিন বিচারের দিনে সারা মানবজাতিকে সর্বপ্রথম যে প্রশ্নটি করা হবে সেটি হল নামায। রাসূল (সা.) এর জীবনসায়াহ্নে যে দু’টি কথা হযরত আয়েশা সিদ্দিক (রা.) এর মাধ্যমে সারা দুনিয়ার মানবজাতির উদ্দেশ্যে বলে গেছেন, তা হল : ইয়া উম্মতি, ছালাত-ছালাত, ঘাম শুকানোর আগেই শ্রমিকদের মজুরি দিয়ে দাও। জাহান্নামে যাওয়ার জন্যে ৪টি জিনিসই যথেষ্ট : (হে জাহান্নামের অধিবাসীরা), তোমাদের আজ কিসে এ আযাবে উপনীত করেছে? তারা বলবে, আমরা নামাযীদের দলে শামিল ছিলাম না, অভাবী (ক্ষুধার্ত) ব্যক্তিদের আমরা খাবার দিতাম না, (সত্যের বিরুদ্ধে) যারা অন্যায় অমূলক আলোচনায় উদ্যত হতো আমরা তাদের সাথে যোগ দিতাম, (সর্বোপরি) আমরা আখেরাতকেও মিথ্যা প্রতিপন্ন করতাম- সূলা আল্ মোদ্দাস্রে আয়াত- ৪২, ৪৩, ৪৪, ৪৫ ও ৪৬। আজ চারদিকে নৈতিক স্খলন আর ধর্মীয় মূল্যবোধের চরম অবনতি আর এতে পিছিয়ে নেই মাদ্রাসার সুপার, শিক্ষক, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী, এনজিও কর্মী, গণমাধ্যমকর্মী, জনপ্রতিনিধি। সবাই যেন গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে বেড়াচ্ছে। অর্থের জন্যে সবাই ছুটছি পাগলের মতন। বিদেশী ফিটিংসের তৈরি টাইল্স নির্মিত সেই গোসলখানায় তো আমাদের কাফন হবে না- আমাদের কাফন হবে সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামলা সবুজের সমারোহ সেই গ্রামীণ বাড়ির ছোট্ট কুটিরের সামনে। কষ্টের পাহাড় মাড়িয়ে কিংবা অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থের টাকায় নির্মিত প্রাসাদসম ভবনে থাকার সুযোগটা আর ওই মৃত ব্যক্তি পাবে না। একটু চিন্তা করুন: আপনার মৃত্যুর পর খাটিয়া করে নিয়ে যাওয়া হবে দাফনের জন্যে কবরস্থানের দিকে-স্বজনরা কাঁদে, বিলাপ করে-দাফন শেষে সবাই চলে যাবে আপন আলয়ে। কেউ আর আপনার খবর রাখবে না। আপনার পুত্র সন্তান হয়তো কিছুদিন শোক বিহ্বল থেকে একদিন আপনাকেও ভুলে যাবে। শুধুমাত্র সারা জিন্দেগী নেক আমল সম্পন্ন গুণবতী স্ত্রী আপনার জন্যেই হাহাকার করবে। আপনি নির্জন আর একাকী। ৪০ কদম পেরুতেই শুরু হবে মুনকার-নাকিরের প্রশ্নমালা, তাদের প্রশ্নবানে জর্জরিত হবেন আপনি। দুনিয়াতে যদি নেক আমল করে থাকেন, ফেরেশতাদের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর যদি দিতে পারেন, তবে কবর হয়ে যাবে ৭০ হাত প্রশস্ত এবং সংযোগ হয়ে যাবে জান্নাতের সাথে। আপনাকে পরানো হবে রেশমী কাপড়ের তৈরি পোশাক। বাসর রাতের মতন কেয়ামত পর্যন্ত শান্তিময় ঘুমে আচ্ছন্ন থাকবেন। বেহেশ্তি সুবাসে উদ্ভাসিত হবেন আপনি-কারণ এ কবর কেয়ামতের প্রথম ধাপ আর ওদিকে আপনার আমল যদি হয় ইসলামবিরোধী, কোরআনবিরোধী আর রাসূল (সা.) বিরোধী, তখন আপনার উপর নেমে আসবে ফেরেশ্তাদের কঠিন নির্যাতন। আপনাকে কবরের দু’পাশ থেকে এমনভাবে চাপ দেয়া হবে যে, এক পাশের হাড় অন্য পাশে চলে যাবে আর যত সব ভয়ংকর আযাব-তা তো রয়েছেই। রাসূল (সা.) এর চরিত্রের মতন চরিত্রবান করাতে হবে নিজ সন্তানদের যিনি ছিলেন সদালাপী, বিনয়ী, ন¤্র, ভদ্র, বিশ্বস্ত আমানতদারী। মানুষ চিরঞ্জীব নয়-প্রত্যেক মানুষকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। ‘প্রতিটি জীবকেই মরণের স্বাদ গ্রহণ করতে হবে, (হে মানুষ), আমি তোমাদের মন্দ ও ভালো (এ উভয়) অবস্থার মধ্যে ফেলেই পরীক্ষা করি, অতপর (তোমাদের তো) আমার কাছেই ফিরিয়ে আনা হবে’- সূরা আল্ আম্বিয়া-আয়াত ৩৫। মৃত্যু কখন এসে হানা দেয় আপনি টেরও পাবেন না। কোরআন চর্চা আর গবেষণা করার এখনই মোক্ষম সুযোগ। কারণ কাল কেয়ামতের ময়দানে এই কোরআনই আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে। কোরআন আপনার বিপক্ষে কথা বলবে। কারণ এই কোরআনকে আপনি সযতেœ বুকসেল্ফে রেখে দিয়েছেন বছর বছর। কোরআন কি গাইড লাইন দিয়েছে তা আমলে নেননি আর তা বাস্তবায়নের ফিকিরও করেননি। আপনি যদি কোরআনকে ভালোবাসতেন, এ কোরআনই পরকালে আপনার নাযাতের উছিলা হিসাবে দৃশ্যমান হত। কোরআনের বিধান প্রতিষ্ঠা করার কোন প্রচেষ্টাই আপনি করেননি। ‘(হে মানুষ), আল্লাহতায়ালা তোমাদের জন্যে সে বিধানই নির্ধারিত করেছেন, যার আদেশ তিনি দিয়েছিলেন নূহকে এবং যা আমি তোমার কাছে ওহী করে পাঠিয়েছি, (উপরন্তু) যার আদেশ আমি ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে দিয়েছিলাম (এদের সবাইকে আমি বলেছিলাম), তোমরা (এ) বিধানকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং (কখনো) এত অনৈক্য সৃষ্টি করো না’ (অবশ্য) তুমি যে (দ্বীনের) দিকে আহ্বান করছো, এটা মোশরেকদের কাছে একান্ত দুর্বিষহ (মূলত) আল্লাহতায়ালা যাকেই চান তাকে বাছাই করে তাঁর নিজের দিকে নিয়ে আসেন এবং যে ব্যক্তি তাঁর অভিমুখী হয় তিনি তাকে (হেদায়াতের পথে) পরিচালিত করেন, সূরা আশ শূরা- আয়াত ১৩। যে ব্যক্তি প্রতিদিন এশার নামাযের পর সূরা মূলক অধ্যয়ন করেন-পরকালের কঠিন হিসাবের দিনে উম্মতের নাযাতের জন্য মহান আল্লাহতায়ালার সাথে সেটি তর্ক জুড়ে দেবে। বিশ্বনবীর আদর্শকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে নিতে হবে আপনার সন্তানদের। দুনিয়ার শিক্ষা আখেরাতে কোন কাজে আসবে না-কোরআনের শিক্ষার বড্ড বেশি প্রয়োজন হবে সেদিন। পঞ্চাশ হাজার বছর সূর্যের একহাত নিচে দাঁড়িয়ে সে আফসোসই করতে থাকবেন, কিন্তু সে সুযোগটা আর আপনি পাবেন না। এখনই আপনার সন্তানদের লাগাম টেনে না ধরলে তারা অচিরেই নিঃশেষ হতে বাধ্য আর কাল কেয়ামতের ময়দানে জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে আপনাকেই।

ডা. মোহাম্মদ ওমর ফারুক সভাপতি,
রাউজান ক্লাব; জুনিয়র কনসালটেন্ট (ইএনটি), জেনারেল হাসপাতাল, রাঙ্গামাটি।

The Post Viewed By: 40 People

সম্পর্কিত পোস্ট