চট্টগ্রাম বুধবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২০

২৮ নভেম্বর, ২০১৯ | ৩:৪৬ পূর্বাহ্ন

অধ্যক্ষ ডা. রতন কুমার নাথ

প্রসবোত্তর পরিচর্যা ও সচেতনতা

সন্তান ধারণের মুহূর্ত থেকে প্রসব পর্যন্ত মহিলা দের শরীরে, বিশেষ করে প্রজনন সম্পর্কিত বিভিন্ন অঙ্গে, নানারকম পরিবর্তন ঘটতে থাকে। প্রসবের পর ক্রমশ এই সমস্ত অঙ্গ আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যায় মোটামুটি ছয় থেকে বারো সপ্তাহে। এই বিশেষ সময়টিকে প্রসবোত্তর কাল বলা হয়।
সাধারণত প্রসবের পরে নাড়ির গতি সামান্য বাড়ে। দ্বিতীয় দিন থেকে তা কমতে থাকে এবং তৃতীয় দিন থেকে স্বাভাবিক হয়ে যায়। প্রসবের পরে শরীরের তাপমাত্রা সামান্য কমলেও প্রথম দিনে তা একটু বেশি থাকে। তবে ৯৯০ ফা (৩৭.২০ সে) এর বেশি ৪৮ নয়।

তৃতীয় দিন থেকে বুকে দুধ জমার জন্যে সামান্য জ¦র আসতে পারে, যা দু-এক দিনের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে যায়। তবে জ¦র বেশি হলে প্রথমেই প্র¯্রবে জীবন সংক্রান্ত দিকটি ভাবা উচিত। প্রসবের দুই বা তিন দিন থেকে প্রচুর প্রস্রাব হয়। তবে বাচ্চা হওয়ার পর পরই কখনও, কখনও বিশেষ প্রস্রাবদ্বারে ব্যথা বা মূত্রথলিতে দীর্ঘদিন চাপ থাকার জন্য প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এই ব্যথার জন্য প্রথম কয়েকদিন পায়খানা নাও হতে পারে। গর্ভাবস্থায় সাধারণত আট-দশ কেজি ওজন বাড়ে। বাচ্চা জন্মানোর পর প্রায় দুই তৃতীয়াংশ কমে যায়। বাচ্চা হওয়ার সময় সাধারণত জরায়ুর ওজন থাকে ৯০০ গ্রাম, বাচ্চা হওয়ার পর পরই জরায়ুর নাভির নীচে থাকে।

প্রথম দিনে এর কোনও হেরফের হয় না। তারপর প্রতিদিন এর উচ্চতা প্রায় আধ ইঞ্চি করে কমতে কমতে দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষে পেটের ওপর থেকে পরীক্ষায় বোঝা যায় না, পুরোপুরি শ্রোণী দেশে ঢুকে যায়। জরায়ু তার সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে প্রায় ৬ সপ্তাহ সময় নেয়। বাচ্চা হওয়ার পর আবার মাসিক শুরু হওয়ার সময় বিভিন্ন জনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন। যদি মা বাচ্চাকে বুকের দুধ না খাওয়ায়, তবে শতকরা চল্লিশভাগ ক্ষেত্রে বাচ্চা হওয়ার ছয় সপ্তাহের মধ্যে মাসিক শুরু হয়। বারো সপ্তাহের শেষে মাসিক শুরু শতকরা আশি জনের। অন্যদিকে বাচ্চা যদি মায়ের দুধ খায়, তবে যতদিন বুকে দুধ থাকবে ততদিন শতকরা সত্তরজন মহিলার মাসিক বন্ধ থাকে। বাকি শতকরা ত্রিরিশ জনের ক্ষেত্রে বুকের দুধ খাওয়ানো সত্ত্বেও মাসিক শুরু হতে পারে। সুতরাং বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোটা এক ধরনের স্বাভাবিক গর্ভনিরোধক প্রক্রিয়া।

গর্ভাবস্থায় মেয়েদের বুক ক্রমশ বড় আর ভারী হয়। এই সময় গাঢ় হলুদ রঙের যে জলীয় রসক্ষরণ হয় তাকে কলস্ট্রাম বলে। বাচ্চা হওয়ার পর প্রথম দু-তিনদিন কলস্ট্রামের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। তৃতীয় বা চতুর্থ দিন থেকে বুকে দুধ আসে।
বাচ্চা জন্মানোর দিন সাধারণত হালকা খাবার দিলেও পরদিন থেকেই মায়েদের স্বাভাবিক খাবার দেওয়া যায়। বাচ্চা বুকের দুধ খেলে বেশি পরিমাণে প্রোটিন-ফ্যাট ভিটামিন খনিজ পদার্থ এবং প্রচুর তরল পানীয় খেতে হয়। বাচ্চা হওয়ার পর পেটের এবং অনেক সময় মূত্রথলির মাংশপেশি সামান্য শিথিল থাকে। ফলে অনেক সময় মূত্রথলিতে জমা থাকলেও প্রস্রাবে অসুবিধা হতে পারে।
সেইজন্য বাচ্চা হওয়ার ৬-৮ ঘণ্টা পর এবং তার প্রতি ৪ থেকে ৬ ঘণ্টায় মেয়েদের নিজের চেষ্টায় প্রস্রাব করা উচিত। অন্যথায় মূত্রনালীতে সহজেই জীবাণু সংক্রমণ ঘটে। বাচ্চা হওয়ার পর কোষ্টকাঠিন্য একটি সাধারণ সমস্যা। পেট এবং কোমরের মাংস পেশির শিথিলতা জননদ্বার ও তার চারপাশের ব্যথা ইত্যাদি কারণে পায়খানা করতে অসুবিধা থাকে। তবে স্বাভাবিক খাবার ও প্রচুর জল খেলে এবং তাড়াতাড়ি হাঁটাচলা শুরু করলে এই অসুবিধা দূর হয়।

মা যদি সুস্থ থাকে তবে বাচ্চাকে মায়ের কাছেই রাখতে হবে/এতে মা-ও বাচ্চা দুজনেরই মানসিক ও শারীরিক ঘনিষ্টতা সহজে তৈরি হয়, বিশেষ করে অজান অচেনা এই কঠিন দুনিয়ার সম্পূর্ণ-অসহায় জীবটি তার সব থেকে নিরাপদ আশ্রয়টিকে ঠিক চিনে নিতে পারে। ফলে শিশুর মানসিক বিকাশ সুস্থতর হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে বাচ্চার খিদে পেলেই তাকে বুকে ধরতে হয়। মনে রাখবেন, বাচ্চাকে সবসময় বসা অবস্থায় বুকের দুধ খাওয়াতে হয়। প্রতিদিন অন্তত কিছুক্ষণ উপুড় হয়ে শোয়া উচিত। এতে জরায়ু স্বাভাবিক অবস্থানে সহজে ফেরে।

অধ্যক্ষ ডা. রতন কুমার নাথ
সাবেক অধ্যক্ষ ডা. জাকির হোসেন হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম।

The Post Viewed By: 42 People

সম্পর্কিত পোস্ট