চট্টগ্রাম বুধবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২০

২৭ নভেম্বর, ২০১৯ | ২:৩৪ পূর্বাহ্ন

অধ্যাপক ড. নারায়ণ বৈদ্য

লবণ অর্থনীতি এবং বাংলাদেশি পুঁজিবাদ

প্রতিদিনের নিত্যকর্মে অর্থাৎ পারিবারিক প্রয়োজনে যখন রাস্তাঘাটে চলাফেরা করি তখন কত লোক আমাকে পরিচয় দিয়ে বলে যে, তিনি আমার ভক্ত। আমার লেখা তিনি পড়েন। সাথে আমাকে ধন্যবাদ দিতেও ভুল করেন না। আমার লেখা ‘দেশে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি ও অর্থনীতির তত্ত্ব’ আর্টিকেলটি পড়ে বেশ কয়েকজন আমাকে টেলিফোনে ধন্যবাদ জানায়। তাঁদেরকে যখন জিজ্ঞাস করি যে, আপনি কি অর্থনীতির লোক। সাথে সাথে উত্তর দেয় ‘না’। তবে লেখায় যে ‘বাজার দর’ ও ‘স্বাভাবিক দর’ সম্পর্কে আলোচনা করলাম তা আপনি বুঝছেন কিনা? এরও উত্তর পাওয়া গেল ‘না’। এতে বুঝা যায় অর্থনীতির তত্ত্বগত দিকগুলো না বুঝলেও আমাকে ভাল জানে বলে তাঁরা আমাকে ফোন করে ধন্যবাদ জানায়। আমার এক সাবেক অধ্যক্ষ স্যারতো এক অনুষ্ঠানে আমাকে বলে বসলেন যে, তিনি অর্থনীতির তত্ত্ব কিছুই বুঝেন না। এ কারণে তিনি আমার লিখাকে বড়ই কঠিন বলে মনে করেন। আসলে যা সত্য এবং আপনার চারপাশে প্রতিদিন যা ঘটছে সেই সব আর্থিক বিষয়গুলো নিয়ে অর্থনীতি আলোচনা করে। এ আর্থিক বিষয়গুলোর বাস্তব সমস্যা সমাধান করার জন্য অর্থনীতিতে তিনটি পদ্ধতি রয়েছে। অর্থাৎ অর্থনীতি পরিচালিত হয় তিনটি ব্যবস্থার মাধ্যমে। এ তিন ব্যবস্থায় অর্থনীতির সমস্যার সমাধান আবার তিন ধরনের। একটি হচ্ছে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা, আর একটি হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা এবং অন্যটি হচ্ছে মিশ্র অর্থব্যবস্থা। অবশ্য সমসাময়িক

সময়ে অর্থনীতিতে অপর একটি ব্যবস্থা অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। তা হলো ইসলামী অর্থব্যবস্থা।

পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা হচ্ছে এমন এক অর্থব্যবস্থা যা অদৃশ্য হস্তের ভেতর দিয়ে পরিচালিত হয়। একে বাজার অর্থনীতিও বলা হয়। যদিও পুঁজিবাদের মূল ভিত্তি হচ্ছে অদৃশ্য হস্ত (ওহারংরনষব ঐধহফ), তথাপি পুুঁজিবাদকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদরা বিভিন্ন সহায়ক প্রক্রিয়া আরোপ করেছেন। এ সহায়ক প্রক্রিয়াগুলোকে পুঁজিবাদের সহায়ক নিয়ামক হিসেবে তাঁরা বিবেচনা করেন। পুঁজিবাদী অর্থনীতির একনিষ্ঠ সমর্থক এবং অর্থনীতিতে যাঁর অবদান সবচেয়ে অধিক তিনি হচ্ছেন পল্ এন্তোনি স্যামুয়েলসন। তিনি অনেকগুলো গ্রন্থ রচনা করেন। তার মধ্যে ‘ঊপড়হড়সরপং’ নামক গ্রন্থটি সমগ্র বিশে^ সমাদৃত হয়। এ গ্রন্থটির মুখবন্ধে তিনি যা লিখেন তা হয় এরূপ- একটি পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে একজন দরিদ্র ব্যক্তির সন্তান প্রায় মৃত্যুপথযাত্রী। ডাক্তার বললেন- এ ঔষধটি যদি তাঁর সন্তানকে খাওয়ানো যায় তবে সন্তানটি বেঁচে যাওয়ার যথেষ্ঠ সম্ভাবনা আছে। উক্ত ব্যক্তি সেই ঔষধটি কেনার জন্য একটি ঔষধের দোকানে গেলেন। দেখলেন, উক্ত দোকানে এ ঔষধটি সারিবদ্ধভাবে রাশি রাশি সাজানো আছে। উক্ত ব্যক্তি ঔষধের দোকানীকে বললেন- আমার সন্তানের জন্য ঐ ঔষধটি খুবই প্রয়োজন। না হয় সে মারা যাবে। দোকানী বললেন যে, আগে আমাকে এত ডলার দাও তবে তোমাকে ঔষধটি দেবো। দরিদ্র ব্যক্তির নিকট অত ডলার ছিল না। সে ঔষধটি ক্রয় করতে পারল না। তাঁর সন্তানটি মারা গেল। স্যামুয়েলসন প্রশ্ন রাখলেন- এই দরিদ্র ব্যক্তির সন্তান মারা যাবার জন্য দায়ী কে? এর উত্তরও তিনি দিয়ে দিলেন। তাঁর মতে, দরিদ্র ব্যক্তির সন্তান মারা যাবার জন্য পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা দায়ী নয়। বরং ক্রয় ক্ষমতা দায়ী। কারণ উক্ত দরিদ্র ব্যক্তির নিকট সন্তানের জন্য ঔষধ কেনার পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না। তাই তিনি ঔষধটি ক্রয় করতে পারেননি। অতএব পর্যাপ্ত ক্রয় ক্ষমতা না থাকাই এর জন্য দায়ী। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা নয়। এ কারণে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় প্রত্যেক ব্যক্তি ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা করে। আর ক্রয়ক্ষমতা তখনই বৃদ্ধি পায় যখন ভোক্তার হাতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকে। এ অর্থ উপার্জনের জন্য পুঁজিবাদী সমাজে প্রত্যেক ব্যক্তি দিবারাত্রি সচেষ্ট থাকে। ফলে ব্যবসা ক্ষেত্রে অতি মুনাফার উদ্ভব হয়। উদ্ভব হয় ঘুষ, দুর্নীতির মত অনৈতিক বিষয়গুলোর।

সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় সবকিছু চলে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা কমিশনের মাধ্যমে। ফলে এ অর্থনীতিতে অতি উৎপাদন যেমন থাকে না তেমনি উৎপাদনের ঘাটতিও থাকে না। অবশ্য বর্তমানে সমাজতান্ত্রিক বিশ^ পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে টিকে থাকার জন্য রাষ্ট্রীয় বিধি ব্যবস্থার মধ্যে কিছু কিছু পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে ঘুষ ও দুর্নীতির মত বিষয়গুলোও এখন কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়। আর এক প্রকারের অর্থনীতি আছে মিশ্র অর্থনীতি। বাংলাদেশের অর্থনীতি এরূপ অর্থনীতির আওতাভূক্ত। সমসাময়িক সময়ে বিরাষ্ট্রীয়করণ নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ পুঁজিবাদী অর্থনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। এর ফলে জনগণের মধ্যে ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। ফলে উদ্ভব হয়েছে ঘুষ, দুর্নীতির মতো বিষয়গুলোর। ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় ব্যবসায়ীরা যেমন লিপ্ত রয়েছে তেমনি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যেও এ প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। তবে এ অশুভ প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এদেশের অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠী। বিশ^ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী এখনও বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর বিশ শতাংশ লোক অতি দরিদ্র। এর অর্থ হলো যে, এখনও বাংলাদেশের তিন কোটি পঞ্চাশ লক্ষ লোকের দুইবেলা খাবারের কোন নিশ্চয়তা নেই। হয়তো তারা দিনে একবেলা খেয়ে অন্য বেলা অভূক্ত থাকে এবং তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাবার মত সামর্থ্য তাদের নেই। অথচ এদেশের জনগণের মাথাপিছু আয় প্রায় এক লক্ষ টাকারও ওপরে। আয়ের এ অসম বন্টন হচ্ছে ঘুষ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস এবং মুনাফালোভীদের কারণে।

২০১৯ সালের অক্টোবর এবং নভেম্বর এ দুই মাস ধরে অস্থিরতা চলছে পেঁয়াজের বাজারে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ টাকা দামের পেঁয়াজ বিক্রয় হয়েছে দুইশত থেকে দুইশত পঞ্চাশ টাকা দামে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, পেঁয়াজের বাজারে চারটি স্তর আছে। আমদানিকারক, আড়তদার, খুচরা ব্যবসায়ী, ভোক্তা। আমদানিকারকেরা আমদানি করে তা আড়তদারদের নিকট বিক্রয় করে দেয়। আড়তদারেরা পেঁয়াজের প্রতিকেজির ওপর নির্দিষ্ট হারে মুনাফা করে খুচরা ব্যবসায়ীদের নিকট বিক্রয় করে। খুচরা ব্যবসায়ীরা আবার প্রতি কেজি পেঁয়াজের ওপর একটি নির্দিষ্ট হারে মুনাফা করে ভোক্তাদের নিকট বিক্রয় করে। এটাই হচ্ছে পেঁয়াজের মার্কেটিং ব্যবস্থার প্রকৃতি। এখানে খুচরা বিক্রেতারা তেমন মুনাফা করতে পারে না। সব মুনাফা হাতিয়ে নেয় আমদানিকারক আর আড়তদাররা। এতে আমদানিকারক ও আড়তদারেরা (ফড়িয়া ব্যবসায়ী) প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

শুধু গুজব আর অপপ্রচার চালিয়ে এ দেশের শান্ত ও সুষ্ঠু পরিবেশকে করছে অশান্ত। বাড়িয়েছে পণ্য মূল্য। পুঁজিপতিরা গড়েছে মুনাফার পাহাড়। অর্জন করেছে ক্রয়ক্ষমতা। ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে করেছে সাম্প্রদায়িক হাঙামা, ছেলেধরা আতঙ্ক ছড়িয়ে করেছে অসংখ্য অসহায় মানুষকে হত্যা, সড়ক পরিবহন আইনে মৃত্যুদন্ডের অপপ্রচার রটিয়ে করেছে ধর্মঘট এবং সর্বশেষে লবণ সংকটের গুজব ছড়িয়ে অর্থনীতিতে ঘটিয়েছে লঙ্কাকা-।

পেঁয়াজ নিয়ে কেলেঙ্কারি দূর না হতেই দেশে হঠাৎ লবণ নিয়ে লঙ্কাকা- শুরু হয়েছে। লবণ পাওয়া যাবে না- এমন গুজবে সাধারণ মানুষ বেশি বেশি লবণ কিনতে শুরু করায় তৈরি হয় সংকট। এ গুজবের উৎপত্তি ঘটেছে সিলেটে। ১৮ নভেম্বর সোমবার সন্ধ্যার পর সিলেটের বিয়ানীবাজার এলাকায় লবণ সংকটের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এরপর পৌরশহর ও গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে সেই খবর। রাতের মধ্যে সেই গুজব পুরো সিলেট জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। রাত পোহাতে খরব ছড়িয়ে পড়ে অধিকাংশ জেলায়। আর শুরু হয় লবণকা-। ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, গ্রাম-শহরে, মহল্লায় মহল্লায় সবার লবণ কেনায় নেমে পড়ে। ফলে সেই সুযোগ গ্রহণ করা শুরু করে ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ লবণ সমিতির সভাপতি-এর মতে- ফেসবুকে গুজব ছড়িয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশে এ সময়ে সাড়ে চার লাখ টন লবণ মজুদ আছে। এই লবণ দিয়ে আরো তিন মাসের চাহিদা মেটানো যাবে। প্রত্যেক পাইকার ও লবণ ব্যবসায়ীর কাছে প্রচুর লবণ মজুদ আছে। এ ছাড়া অপরিশোধিত আছে সাড়ে সাত লাখ টন। বাংলাদেশে প্রতি বছর লবণের চাহিদা হয় ২৪ লাখ টন। ২০১৮-১৯ মৌসুমে ১৮ লাখ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন হয়েছে। বর্তমান সময়ে মজুতকৃত সাড়ে চার লাখ টন ছাড়াও সারা দেশে লবণ কোম্পানির ডিলার, পাইকারী ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ লবণ মজুত রয়েছে। তার উপর নভেম্বর মাস থেকে লবণের উৎপাদন মৌসুম শুরু হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া ও মহেশখালী উপজেলায় উৎপাদিত নতুন লবণও বাজারে আসতে শুরু করেছে।

বিশে^র কোন অর্থনীতিতে গুজবের কারণে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি দেখা যায় না। পুঁজিবাদী অর্থনীতির ধারক হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও তা দেখা না যাওয়ারই কথা। কিন্তু ব্যতিক্রম এ অর্থনীতি। ব্যতিক্রম এ পুঁজিবাদ। এজন্য বলা যায়, এ পুঁজিবাদ বাংলাদেশি পুঁজিবাদ। লবণ অর্থনীতি এ পুঁজিবাদের একটি উদাহরণ।

প্রফেসর ড. নারায়ন বৈদ্য পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।

The Post Viewed By: 52 People

সম্পর্কিত পোস্ট