চট্টগ্রাম বুধবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২০

২৭ নভেম্বর, ২০১৯ | ২:৩৪ পূর্বাহ্ন

ডা. হাসান শহীদুল আলম

কারা কেন দেশের সম্পদ পাচার করছে

চিকিৎসা শ্রমিকের দিনলিপি

কার্তিকের শেষ সপ্তাহ। ১৪২৬ বঙ্গাব্দ। পটিয়াস্থ চেম্বার।

নি¤েœর সংবাদচিত্রসমূহের প্রতি সম্মানিত পাঠকবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি : ১) ‘মালয়েশিয় সরকারের এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন যে, মালয়েশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিদেশী বিনিয়োগকারী দেশ বাংলাদেশ। যদিও দেশ থেকে বিদেশে কোন টাকা নিতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন লাগে। জানা গেছে গত ১০ বছরে মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগের ব্যাপারে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাউকে কোন অনুমোদন দেয়নি। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন এরপরও বাংলাদেশ মালয়েশিয়ায় কিভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী দেশ হলো। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মঈনুল ইসলাম জানান, নিশ্চিত ঐ সব টাকা পাচার হয়েছে (নিউজ প্রবাস ৬/৫/১৭)”। ২) ‘নামে বেনামে ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িতরা কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাঠিয়েছে বলে তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। এই সুবাদে শত শত কোটি টাকা পাচার করছেন সংশ্লিষ্টরা (আমাদের সময়, ২৯/৯/১৯)” ৩) ‘চট্টগ্রামের একজন বড় ব্যবসায়ী সম্প্রতি ব্যাংকের প্রায় শ’ কোটি টাকা ঋণ রেখে এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রায় ৭০ কোটি টাকা মেরে দিয়ে মালয়েশিয়া পাড়ি জমিয়েছেন সপরিবারে।
সম্প্রতি নাটোরের বনপাড়া বাজারের একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী প্রায় শত কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন সপরিবারে (ভোরের কাগজ, ৮/৪/১৮)’ উল্লিখিত সংবাদচিত্রসমূহে দেখা যাচ্ছে, টাকা পাচার কারীদের কাছে স্বদেশ বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য অনুকূল মনে না হলেও বিদেশ মালয়েশিয়া তাদের কাছে অনুকূল মনে হয়েছে এবং সেখানে তারা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিদেশী বিনিয়োগকারী দেশের নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত গডফাদাররা কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছে। ব্যাংকের শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করে দিয়ে পাচারকারী ব্যবসায়ীরা সপরিবারে বিদেশগামী হচ্ছে। পাচারকৃত হাজার বা লক্ষ কোটি টাকা আসমান থেকে আসেনি। এগুলো এদেশের সতের কোটি জনগণের ঘাম ঝরানোর আয়ের ট্যাক্সের টাকা। এই পাচারকারীদের জাতীয় শত্রু বলে কি অত্যুক্তি হবে? আজকের লেখায় কারা কেন পাচার করছে দেশের সম্পদ তাদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করছি।

মানি লন্ডারিং বা টাকা পাচার কি?
যথাযথ কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে টাকা এক দেশ থেকে অন্য দেশে নিয়ে যাওয়া

কারা পুঁজি বা অর্থ পাচার করছে?
১)বৈদেশিক বাণিজ্যের আমদানী রফতানীর সাথে জড়িত ব্যবসায়ী শিল্পপতি ২) দেশের দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক, প্রকৌশলী, পেশাজীবী ৩) ঋণ খেলাপীগণ ৪) বৈধপথে ৩০০০ ডলারের বেশী অর্থ দেশের বাইরে নেয়ার সুযোগ না থাকায় চিকিৎসা, শিক্ষাসহ ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটানোর জন্য এক শ্রেণীর নাগরিক অবৈধভাবে অর্থ পাচার করেন ৫) আবার কেউ বৈধভাবে আয় করছেন, কিন্তু দেশের বাইরে বিনিয়োগ করতে চান। সুযোগ না থাকায় তারা অর্থ পাচার করেন ৬) আরেক শ্রেণী আছেন যারা দেশে বিপুল পরিমাণ অবৈধ আয় করেন। তারা সেই অর্থ নিরাপদ রাখতে দেশের বাইরে পাচার করেন বা বিনিয়োগ করেন।
‘বাংলাদেশের গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য মতে দেশে চোরাকারবারি এবং টাকা পাচারকারীর সংখ্যা ছয় শতাধিক (ভোরের কাগজ ৮/৪/১৮)’
পুঁজি পাচারের কারণ : ক) বিনিয়োগ পরিবেশের অভাব : ১) বাংলাদেশে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে গেলে একজন উদ্যোক্তাকে হাজার রকমের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। অপ্রদর্শিত আয় আয়কর ফাইলে ঘোষণা প্রদান, আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে উপহার বা দান গ্রহণের মিথ্যা দলিল প্রদর্শন, টেলিফোন-বিদ্যুৎ-ইন্টারনেট, গ্যাস-পানি ইত্যাদি নানারকম সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সেবা গ্রহণের ব্যবস্থাকরণ, কোম্পানীর রেজিষ্ট্রেশন করণ ইত্যাদি রুটিন দাপ্তরিক কাজ সম্পাদন করতে হয় দুর্নীতিবাজ সরকারী কর্মকর্তাদের ঘুষ প্রদান করে এবং এর পরেও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা থেকে রেহাই পাওয়া যায় না যে কারণে ব্যবসাকে শুরুতেই ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় ২) ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা না থাকা ৩) চাঁদাবাজি (৪) রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্নমুখী চাপ

খ) রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশংকা গ) রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর দুর্বল নজরদারির কারণে অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত দের বিচার না হওয়া। ঘ) সরকারী কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ঙ) সরকারী কর্তৃক নির্দিষ্ট পরিমাণের অধিক অর্থ দেশের বাইরে নেয়ার সুযোগ না থাকায় চিকিৎসা, শিক্ষাসহ ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটানোর জন্য এক শ্রেণীর নাগরিক অবৈধভাবে অর্থ পাচার করেন। চ) আবার কেউ বৈধভাবে আয় করছেন, কিন্তু দেশের বাইরে বিনিয়োগ করতে চাইলে বৈধভাবে সুযোগ না থাকায় সে অর্থ পাচার করা হয়। ছ) অবৈধভাবে অর্জিত বিপুল পরিমাণ অর্থ নিরাপদ রাখার স্বার্থে দেশের বাইরে পাচার করা হয় বা বিনিয়োগ করা হয়। জ) দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ অনুকূল হলেও সপরিবারে বিদেশে হিজরত করে কোন উন্নত পুঁজিবাদী দেশে পরবর্তীতে দিন গুজরানের খায়েসে।

পুঁজি পাচারের পরিমাণ : ‘প্রতি বছর গড়ে ৯০০ কোটি ডলার (ডলারের বিনিময় হার ৮৪ টাকা ধরে যার পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৭৫৬০০ কোটি টাকা) বা তারও বেশী পুঁজি থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করছে বলে নিউইয়র্ক ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইনানশিয়াল ইনটিগ্রিটি বা জি এফ আই এর গবেষণায় উদঘাটিত হয়েছে। জিএফআই-এর এই হিসেবটি ২০১৩ সালের। ছয়বছর পর ২০১৯ সালে পুঁজি পাচারের পরিমাণ যে আরো বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক সেটা না বোঝার কোন কারণ নেই (ড. মঈনুল ইসলাম, দৈনিক আজাদী ১৬/১/১৯)।’ উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন বর্তমানে ২০১৯ সালে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে পুঁজি পাচারের পরিমাণ কমপক্ষে এক লক্ষ কোটি টাকা। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী বা ইউএনডিপি এর তথ্য মতে স্বাধীনতার পর চার দশকে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেবে স্বাধীনতার পর চার দশকে দেশে মোট বিদেশী বিনিয়োগ বা এফডিআই এসেছে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিদেশ থেকে যা এসেছিলো তাতো পাচার হয়েছেই এবং তার দ্বিগুণ পরিমাণ দেশে যা ছিলো তাও পাচার হয়েছে। এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, প্রতি বছর দেশে যে হারে বিদেশী বিনিয়োগ আসছে তার কয়েকগুণ বেশী অর্থ সম্পদ বিভিন্ন দেশে পাচার হচ্ছে। জিএফআই এর ভাষ্য অনুযায়ী উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের মোট বা ণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ পাচার হয়েছে।
পুঁজি পাচারের প্রমাণ : ক) শিল্পে বিনিয়োগের মন্দার মধ্যেও শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানী বৃদ্ধি পাওয়া খ) কৃষিতে কয়েক বছর ধরে বাম্পার ফলন হওয়ার পরেও সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপকভাবে চাউল আমদানী বদ্ধি পাওয়া গ) শিল্পের যন্ত্রপাতি ভর্তি কনটেইনারে ছাই, ইট, বালি, পাথর ও সিমেন্টের ব্লক পাওয়া ঘ) চট্টগ্রাম ওমংলা বন্দরে শুল্ক গোয়েন্দাদের তদন্তে খালি কনটেইনার আমদানীর ঘটনা ধরা পড়া ঙ) ভুয়া রফতানী এলসি বা ঋণপত্র এবং ক্রয়চুক্তির মাধ্যমে টাকা পাচারের ঘটনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে ধরা পড়া চ) গত তিন বছরে মালয়েশিয়া সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বিদেশীর জন্য মালয়েশিয়ার সেকে- হোম প্রকল্পে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী দেশের তালিকায় থাকা ছ) জিএফআই, সুইস ব্যাংক এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন আইএসআইজে এর পানামা ও প্যারাডাইস পেপারেও বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

পুঁজি পাচারে বাংলাদেশের অবস্থান :
টাকা পাচারে বিশে^র শীর্ষ ৩০ দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের নাম। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরে অর্থাৎ দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশের নাম।
উপসংহার : এ পর্যন্ত যেটুকু আলোচনা হলো তার সারমর্ম হিসেবে উপসংহারে বলতে চাই যে, সরকারকে প্রথমেই শক্ত হাতে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরে সব সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অথঃপর যারা অবৈধভাবে টাকা পাচারের সঙ্গে জড়িত হয় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনী ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি যারা পুঁজির নিরাপত্তাজনিত কারণে বিদেশে টাকা পাচার করেন তাদের মূল সমস্যা সম্পর্কে জেনে পরিবেশ অনুকূল করার ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বোপরি জবাবদিহিমূলক সংসদীয় কার্যক্রম চালু রেখে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। আগামীতে কিভাবে টাকা পাচার হচ্ছে সে ব্যাপারে আলোকপাত করার আশা রাখি।

ডা. হাসান শহীদুল আলম চর্মরোগ ও ডায়াবেটিস-এ ¯œাতকোত্তর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক, চট্টগ্রাম।

The Post Viewed By: 119 People

সম্পর্কিত পোস্ট