চট্টগ্রাম রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯

২২ নভেম্বর, ২০১৯ | ২:২৫ পূর্বাহ্ন

আয়েশা পারভীন চৌধুরী

চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের প্রথম পুনর্মিলনী

আশীষ কুমার বড়ুয়া

একটা সময় মানুষের জীবনব্যবস্থা ছিলো সহজ-সরল। মানুষের হাতে ছিলো তখন পর্যাপ্ত সময়। মানুষে মানুষে মিলিত হওয়ার সুযোগ ছিলো বেশী। জনসংখ্যা ক্রমে বেড়ে যাওয়ায় ব্যস্থ নাগরিক জীবনে আসে নানা পরিবর্তন। জীবন যাপনে অভ্যস্ত মানুষের হাতে সময় কমে যায়। জীবন-যাপন আগের তুলনায় কঠিন হলেও একথা ঠিক, বর্তমানে মানুষের আর্থিক ক্রয়ক্ষমতা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। লক্ষণীয়, আর্থিক সক্ষমতার কারণে বাংলাদেশের মানুষ ক্রমে উৎসবপ্রিয় হয়ে উঠায় নানা উৎসবের মাঝে হালে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রাক্তন ছাত্র -ছাত্রীদের রিইউনিয়ন উদযাপনের হিড়িক পড়েছে বেশি।

সুখবর হলো, দীর্ঘ ৫৩ বছর পর চট্টগ্রাম ওয়াল্ড ট্রেড সেন্টারে প্রথম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন’র নতুন কমিটি গঠিত হয় মাত্র ক’মাস আগে। এলামনাই এসোসিয়েশনের নতুন কমিটি ঘোষণা দেয়। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ২১ ও ২২ নভেম্বর ১ম রিইউনিয়ন উদযাপন করা হবে। উৎসব ঘিরে চলে চবি’র প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাজ-সাজ-রব-রব। এখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসে হাজির। এখন চলছে দু’দিনের মহা মিলনমেলা। সারাদেশ থেকে তো বটেই পৃথিবির বিভিন্ন দেশ থেকেও প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীরা ছুঠে এসেছে রিইউনিয়নে যোগ দেয়ার জন্য। জানা গেছে, ৮০০০ ছাত্র-ছাত্রী রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেছে। কমিটি ঘোষণা দিয়েছে উৎসবের দিন পর্যন্ত স্পট রেজিস্ট্রেশন চলবে। সে হিসেবে নিবন্ধনকারীদের সংখ্যা আরো বাড়বে। গতকাল দুপুর ৩.৩০ টায় চট্টগ্রাম সরকারি চারুকলা কলেজ থেকে বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের হয়ে শিরিষ তলায় শেষ হয়। র‌্যালীতে বিভিন্ন ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা যোগ দেন। সব ব্যাচই নিজস্ব পরিকল্পনা নিয়েছে মিলনমেলা উপভোগ করতে। এক ব্যাচ অন্য ব্যাচের কাছে মুখ খুলছে না, যাতে তাদের নিজস্ব পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে না যায়। এই ধারায় রঙিন প্রস্তুতির আধিক্য বেশি ৩৫-৫০তম ব্যাচের মাঝে। এই ব্যাচের বন্ধুদের বয়স কম হওয়াই তাদের উচ্ছাসও বেশি। ০১-৩৪ ব্যাচের সতীর্থরা বয়সের কারণে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও তাদের উচ্ছাসেরও কমতি দেখা যাচ্ছে না। সকলেই ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার জন্য ছুঠে আসছে দলেদলে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আছে জোরালো প্রস্তুতি। র‌্যালী কমিটি, আপ্যায়ন কমিটি সকলেই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে একটি পরিচ্ছন্ন রিইউনিয়ন উপহার দেয়ার জন্য। উদযাপন কমিটির অন্যতম কর্মকর্তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রাক্তন পিএস, ত্যাগী-স্বচ্ছ রাজনীতিক আলাউদ্দিন আহমেদ নাছিম বলেছেন, রিইউনিয়নকে ঘিরে সার্বিক প্রস্তুতি অত্যন্ত সন্তোষজনক। ৫৩ বছর পর এই রিইউনিয়ন হবে ইতিহাসের নতুন মাইলফলক এবং গৌরবজনক অধ্যায়। শিক্ষক-ছাত্র-ছাত্রী সবাইকে নিয়ে এই মিলনমেলা। র্দীর্ঘদিন পর সবাই হারিয়ে যাওয়া তুই বন্ধুদের খুঁজে নেবে এই সম্মিলনে। বন্ধু মানে তো তুই। তুই না হলে কি বন্ধু হয়?

বন্ধু’ শব্দটি যতই ছোট হোক, এর গভীরতা আর ব্যপ্তি অনেক বেশি। বন্ধুত্বের কোন সংজ্ঞা হয় না। একে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। এরিস্টটলের মতো করে বলতে হয়, বন্ধুত্ব মানে বিশ্বাস, বন্ধুত্ব মানে পরস্পরের মাঝে সহযোগিতা, বন্ধুত্ব মানে বিপদে পাশে থাকা, সুখে-দুঃখে এক থাকা। জীবনের কোনো বাঁকে নয়, বন্ধুত্বের ব্যাপ্তি সারাজীবন।

বন্ধু মানে উত্থাল নদীর আঁচরে পড়া ঢেউ। বন্ধু মানে অল্প খাবার সমান ভাগে ভাগ করে খাওয়া….! ‘প্রাণের উৎসবে মাতি উল্লাসে’ এই শ্লোগানকে ধারন করে সব ব্যাচের বন্ধুরা মিলিত হবে তাদের পুরনো স্মৃতিকে জীবন্ত করে তোলার। ইতিমধ্যেই কত বন্ধু না ফেরার দেশে চলে গেছে। তাদের কথা রোমন্থন করতেই হয়তো অনেকের বুক ভারী হয়ে উঠবে। কারো সুখের বার্তা পেয়ে আনন্দের জলে গা ভিজাবে। দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান হবে প্রিয়জনের মুখ দেখে। সৃষ্টিকর্তার কাছে অনেকেই সন্তোষ্ট করবে যারা যোগ দিতে পারলো, এই ভাগ্য তো অনেক বন্ধু পাইনি যারা হারিয়ে গেছে। যারা আছে সজীব তারা মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার দীপ্ত ঘোষণার মাধ্যমে ইতি টানবে আজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশনের সারাদিন ব্যাপী প্রথম রিইউনিয়নের। জয়তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশনের প্রথম রিইউনিয়ন।

আশীষ কুমার বড়ুয়া চবি হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ১৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী।

আয়েশা পারভীন চৌধুরী
চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের সুবর্ণ জয়ন্তীর ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর প্রতিটি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা কোথাও না কোথাও মিলিত হয়। হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলোকে রোমন্থন করতে করতে আবার সেই সোনালী দিনগুলোতে ফিরে যায়। বিভাগভিত্তিক ও ব্যাচের ক্রমানুসারে মিলনমেলায় তাদের সহপাঠীদের কাছে পেয়ে প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীরা আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। আজ চবি’র প্রতিটি বিভাগের ও প্রতিটি ব্যাচের সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রথম পুনর্মিলনী উৎসব। এতে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়ে আরেকটি ইতিহাস সৃষ্টি করছে। এতে সকলের মধ্যে বিরাজমান ভ্রাতৃত্ববোধ আরো দৃঢ় হবে। আগামী প্রজন্মের কাছে এই সম্প্রীতি শিক্ষাণীয় উদাহরণ হয়ে থাকবে।

উল্লেখ্য যে, ১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয় চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের। বর্তমানে এটি উন্নতশিক্ষার আধারে পরিণত হয়েছে। বাংলা, ইংরেজী, ইতিহাস এবং অর্থনীতি বিভাগ নিয়ে এই বিশ^বিদ্যালয়ের পথচলা শুরু। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় একটি বহু অনুষদভিত্তিক গবেষণা বিশ^বিদ্যালয়। এটি চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ২২কিলোমিটার উত্তরে হাটহাজারী থানার ফতেহপুর ইউনিয়নের ১৭৫৩.৮৮ একর পাহাড়ি ও সমতল ভূমির উপর অবস্থিত। এটি দেশের তৃতীয় এবং ক্যাম্পাস আয়তনের দিক থেকে দেশের সর্ববৃহৎ বিশ^বিদ্যালয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পূর্বে এই বিশ^বিদ্যালয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল। সে সময়ে এই বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
আজ চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের এলামনাইদের প্রথম পুনর্মিলনী। দিনটি আমাদের জন্য একটি সুন্দর ও আনন্দঘন। এই দিনটিতে চট্টগ্রাম

বিশ^বিদ্যালয়ের প্রবীণ ও নবীন ছাত্র/ছাত্রীদের মধ্যে ঘটবে মহামিলন। প্রাণের আনন্দ ছড়িয়ে পড়বে চারিদিকে। এক অদৃশ্য মায়ার টানে সকলে একত্রিত হতে যাচ্ছে আজ। প্রতিটি ব্যাচের ও বিভাগের শিক্ষার্থীরা অন্যের আনন্দের সাথে নিজের আনন্দকে ভাগাভাগি করে নিতে প্রস্তুতি নিয়েছে এতোদিন। আজ সে আনন্দ ভাগাভাগি হবে। এই আনন্দ অতীতকে ফিরে পাওয়ার, এই আনন্দ শৈশবের গন্ডি পেড়িয়ে যৌবনের জয়গানের স্মৃতি রোমন্থন করার। এই আনন্দের রেশ আমাদের সামনের দিকে আরো এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাবে। তাইতো শত ব্যস্ততা ও বাধা-বিপত্তিকে তুচ্ছ করে আজ চবি’র প্রাক্তনরা মিলিত হচ্ছি।

চবি’র শিক্ষার্থীরা দেশ-বিদেশে এদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে। প্রতিটি অঞ্চলের সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন আমাদের এলামনাইরা। তারা নানা সেক্টরে কর্মরত থেকে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছে। তারা সবাই আজ মিলিত হবে প্রাণের মিলনমেলায়। ছোট-বড় সতীর্থদের সাথে এক হয়ে ফটো সেশনে ব্যস্ত মুহুূর্তগুলো স্মৃতি হয়ে থাকবে। প্রসঙ্গত, এই স্মৃতিময় পর্বের শুরু হয়েছে চারুকলা ইনস্টিটিউটে নিবন্ধন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। প্রায় প্রতিদিনই সবার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। গল্প হয়েছে। স্মৃতি রোমন্থন হয়েছে। ছবির অংশ হয়েছে। এসব বেশ মজার ও আনন্দের। আজ আনুষ্ঠানিকতা পাচ্ছে সবকিছু। দূর-দুরান্ত থেকে সবাই আসবে। কথা হবে। আড্ডা হবে প্রাণ ভরে। সবকিছুই হবে নির্মল আনন্দে। সুখময়, স্মৃতিময় হয়ে থাকবে আজকের এই অনন্য মুহূর্তগুলো।

জানা গেছে প্রায় ৮,০০০ প্রাক্তন শিক্ষার্থীর মিলনমেলা হবে জিইসি কনভেশন সেন্টারে। যদিও প্রাণের ক্যাম্পাসে এই আয়োজন হলে আরো অনেক মজা হতো। তবে আগামির আয়োজনে তা বিবেচনায় নেয়া হবে আশা করি। প্রতিজন আজীবন সদস্য থেকে ২ হাজার টাকা করে ফি নেয়া হয়েছে। জানা গেছে সে টাকা পুনর্মিলনী অনষ্ঠানে ব্যয় না করে ফিক্সড ডিপোজিট করে রাখা হবে। পরবর্তী উক্ত টাকা সদস্যদের কল্যাণে ব্যয় করা হবে। এটি ভালো সিদ্ধান্ত। ১৭ নভেম্বরের কয়েকটি পত্রিকার তথ্য থেকে জানা যায়, বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে গঠনমূলক কার্যক্রম ভিত্তিক বৃত্তি প্রদানের লক্ষ্যে কার্যকরী সদস্যবৃন্দের পক্ষ থেকে প্রতি বছর ৩০ লক্ষ টাকার শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করা হবে। এটি একটি গঠনমূলক ভালো পদক্ষেপ। আমরা সবসময় এ ধরনের উদ্যোগের সাথে সম্পৃক্ত থাকবো। একইসঙ্গে আশা থাকবে প্রতিবছরই পুনর্মিলনীর আয়োজন হবে।

আয়েশা পারভীন চৌধুরী ইংরেজি বিভাগের ২৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী।

The Post Viewed By: 41 People

সম্পর্কিত পোস্ট