চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯

২০ নভেম্বর, ২০১৯ | ২:১৬ পূর্বাহ্ন

রেজা মুজাম্মেল

খেলার মাঠ প্রজন্মের কাছে কল্পনা হবে না তো?

আধুনিকতা, প্রযুক্তির ছোঁয়া, ঐতিহ্য বিমূখতা, গ্রামমূখি না হওয়া, শহুরে জীবনে অভ্যস্ত হওয়া, কর্মমূখি ব্যস্ত জীবন পার করাসহ নানা কারণে অনেক ইতিহাস-ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার পথে। বলা যায়, অনেক কিছু এখন হারিয়েও গেছে। হারানোর এমন তালিকা ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। বাঙালির জাতির অনেক ঐতিহ্যের স্মারক এখন বিস্মৃতির অতল গহবরে।

বর্তমান তরুণ প্রজন্মের অনেকেই গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনেক কিছু চিনবে না, জানবে না অনেক পণ্যের নাম। পক্ষান্তরে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বাড়ছে ভবন। ভবন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমছে খোলা স্থান, আঙিনা, মাঠ ও পরিত্যক্ত ভূমি। এটি অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলই বলা যায়। তাই এখন শঙ্কা দেখা দিয়েছে, যে হারে নগরায়ন হচ্ছে, তাতে অন্তত আগামী দশক পর নগরে আর কোনো খেলার মাঠ অবশিষ্ট থাকবে কিনা। প্রশ্ন আসছে, খেলার মাঠ ও খোলা আঙিনা আগামী প্রজন্মের কাছে কল্পনা হবে না তো? তদুপরি, খেলার মাঠগুলো বাণিজ্যিক মেলার ফাঁদে পড়ার কারণে সংকুচিত হয়ে পড়ছে কোমলমতি শিশুদের মনন বিকাশের স্থান। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিশু-কিশোরদের প্রারম্ভিক বয়সের উৎকর্ষ বিকাশ। অথচ শিশু-কিশোরদের জন্য প্রয়োজন মুক্ত আঙিনা। কারণ শিশুরা নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যেই যথাযথ বিকাশ না হলে ভবিষ্যতে এর নানা নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা বেশি।

দুই. চট্টগ্রাম নগরে কয়টি খেলার মাঠ ছিল, এ নিয়ে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে এই নগরেই ছিল খেলার মত উপযুক্ত মাঠ। এসব মাঠে ফুটবল ও ক্রিকেটসহ নানা খেলা খেলে জাতীয় দলেও অংশগ্রহণ করেছেন। কিন্তু এখন? এখন নগরে দু’টি আন্তর্জাতিকমানের স্টেডিয়াম এবং হাতেগুণা কয়েকটি বড় মাঠ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো মাঠই নেই। নগরের ছোট-বড় মাঠগুলোর মধ্যে আছে, জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম, এম এ আজিজ স্টেডিয়াম, আউটার স্টেডিয়াম, আগ্রাবাদের জাম্বুরী মাঠ, হালিশহরের আবাহনী মাঠ, লালদীঘি মাঠ, প্যারেড মাঠ, রেলওয়ে পলোগ্রাউন্ড মাঠ ও বাওয়া স্কুলমাঠ। এর মধ্যে জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম ও এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে জাতীয়-আন্তর্জাতিক খেলা অনুষ্ঠিত হয়। ফলে এ দু’টি মাঠ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। কিন্তু বাকি মাঠগুলো? এগুলোতে কি নগরের শিশু-কিশোররা খেলার সুযোগ পাই। উল্টো এসব খেলার মাঠ এখন মেলার মাঠে পরিণত হয়েছে। বছরজুড়ে এসব মাঠে আয়োজন করা হয়ে থাকে বাণিজ্যমেলা, বস্ত্রমেলা, তাঁতমেলা, বৃক্ষমেলা, বিজয়মেলা, উন্নয়ন মেলা, স্বাধীনতা মেলা, বৈশাখী মেলা, পিঠা উৎসব, পাখি মেলা, গাড়ি মেলা ও ফুড উৎসব। একটি মেলা শেষ হলে সেটি আবার মাঠের রূপ পেতে পেতে আরেকটি মেলার প্রস্তুতি শুরু হয়। ফলে খেলার মাঠে খেলার কোনো সুযোগই পায় না শিশু-কিশোররা। অতীতের খেলা হতে এমন মাঠে বর্তমানে খেলার কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট নেই।

তিন. মাঠগুলোর এখন চলছে চরম দুরাবস্থা। নগরের অন্যতম আবাহনী মাঠে বছরজুডে থাকে আগাছা। মনে হয় যেন ছোট কোনো বিস্তীর্ণ বন। ফুটবল খেলার মাঠ হলেও নেই কোনো গোলপোস্ট। মাঠে হয় না খেলা। নগরের প্রাণকেন্দ্র অবস্থিত লালদীঘি মাঠে বছরজুড়েই থাকে রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং বিভিন্ন মেলা। কিন্তু মাঠ খালি থাকলেই বল নিয়ে ছুটতে দেখা যায় তরুণ-কিশোরদের। অভিন্ন চিত্র নগরের আউডার স্টেডিয়ামের। এখানে নিয়মিত আয়োজিত হয় বস্ত্র মেলা, বৃক্ষমেলা, তাঁতশিল্প মেলা ও গাড়ি মেলা। তাছাড়া এখানকার প্রায় অর্ধেক জায়গায় এখন নির্মাণ করা হয়েছে সুইমিংপুল। অথচ ষাটের দশকে, আউটার স্টেডিয়ামে অন্তত চারটি ফুটবল ম্যাচ খেলার পরিসর ছিল। অর্থাৎ আটটি দলের ৮৮ জন খেলোয়াড় ফুটবল অনুশীলন করতে পারত। রেলওয়ে পলোগ্রাউন্ড মাঠও বছরের অধিকাংশ সময় দখলে থাকে বাণিজ্য মেলার। তবে আগ্রাবাদের জাম্বুরি মাঠ এখন নান্দনিক ওয়াকওয়ে ও বিনোদন পার্ক করা হয়েছে। এটি একটি ভাল উদ্যোগ বলা যায়। জমিয়তুল ফালাহ্ জাতীয় মসজিদের সামনের বিশাল মাঠেও এখন আর খেলার সুযোগ নেই। তবে দিনভর কিশোর-তরুণদের পদচারণায় ভিড় থাকে প্যারেড মাঠ। কার্যত এ মাঠটি এখন অক্ষত আছে ৬০ বর্গমাইলের এই নগরে। পক্ষান্তরে নগরীর বিদ্যালয়গুলোর মাঠের অবস্থাও করুণ। সংস্কার ও যথাযথ রক্ষাণাবেক্ষণের অভাবে মাঠগুলো হারিয়ে ফেলছে অতীতের জৌলুশ ও স্বকীয়তা। কলেজিয়েট স্কুলের দু’টি মাঠ থেকে বেঁেচ আছে একটি। আরেকটিতে তৈরি করা হয়েছে বইয়ের গুদাম, ডরমিটারি ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। সংকুচিত হয়েছে কাজেম আলী উচ্চ বিদ্যালয় ও নাসিরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ।
চার. খেলার মাঠ কমে যাওয়ার নানা নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবার ও সমাজে। শিশু-কিশোর ও তরুণরা খেলাধুলা করার সুযোগ না পাওয়ায় ক্রমেই যুক্ত হচ্ছে অপরাধ কার্যক্রমে। বাড়ছে কিশোর অপরাধ। কমছে সুষ্ঠু ও সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিশুদের মানসিক বিকাশ। মাঠ না থাকায় তরুণ-কিশোররা দিনরাত ব্যস্ত থাকছে প্রযুক্তি পণ্যের ওপর। তাদের জন্য কম্পিউটার, মোবাইল ও ট্যাব পরিণত হয়ে উঠেছে অনেকটা খেলার মাঠে। এসব প্রযুক্তি পণ্যেই তারা বেশি সময় ব্যয় করছে। বিপথগামী হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। এ কারণে শিশু কিশোররা অল্প বয়সেই শারীরিক নানা সমস্যায় পড়ছে। শরীরে বাসা বাধছে নতুন নতুন রোগ। কম বয়সী শিশুদেরও ব্যবহার করতে হচ্ছে চশমা। তাছাড়া শহরের বিভিন্ন এলাকার গলি উপগলিগুলোতেই খেলতে দেখা যায় কিশোরদের।

পাঁচ. ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মহাপরিকল্পনায় শিশু-কিশোরদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশকে মাথায় রেখে পুরো নগরীর ১০ শতাংশ জায়গা উন্মুক্ত রাখার বিধান রাখা হয়েছিল। কিন্তু তখন যতগুলো মাঠ ছিল, এখন তাও নেই। ১৯৯১ সালে জাম্বুরি মাঠের পশ্চিমাংশ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন গণপূর্ত থেকে ইজারা নিয়ে শিশু পার্ক নির্মাণ করে। ফলে আগ্রাবাদ এলাকার কিশোরদের খেলাধূলার বড় জায়গাটি বেহাত হয়ে যায়।
নগর পরিকল্পনাবিদের মতে, একটি নগরে মোট আয়তনের ১৫ শতাংশ জায়গা খেলার মাঠ বা খোলা জায়গা থাকা দরকার। কিন্তু চট্টগ্রাম মহানগীতে সে ধরনের কোনো জায়গা নেই। তবে সিডিএর দাবি নগরে দুই শতাংশ খেলার মাঠ আছে। অন্যদিকে, একটি আদর্শ আবাসিক এলাকার জন্য ১৩ শতাংশ খেলার মাঠ থাকা দরকার।

কিন্তু বর্তমানে নগরীর মোট আবাসিক এলাকায় শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ মাঠ আছে বলে সিটি কর্পোরেশন জানায়। অন্যদিকে, প্রতিটি বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ থাকার কথা। অথচ নগরীর অধিকাংশ বিদ্যালয়েই খেলার কোনো মাঠ নেই। নতুন করে প্রতিষ্ঠা হওয়া স্কুলগুলোরও মাঠের কোনো ব্যবস্থা না রেখে তৈরি হচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পরিচানাধীন ৪৮টি বিদ্যালয় আছে। কিন্তু তার মধ্যে খেলার মাঠ আছে মাত্র ১০টি বিদ্যালয়ের। আবার নতুন প্রতিষ্ঠা হওয়া বেসরকারি বিদ্যালয়গুলো অধিকাংশেরই উপযুক্ত মাঠ নেই।

ছয়. নগরায়নসহ নানা কারণে হারিয়ে যাচ্ছে খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ও খোলা মাঠ। এর কারণে শিশু কিশোরদের মুক্তাঙ্গিনা তো কমছেই, সঙ্গে হারাচ্ছে প্রাতঃকালীন ও অপরাহ্নে হাঁটা, শরীরচর্চা এবং খেলাধুলার জন্য উন্মুক্ত জায়গা। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডায়াবেটিকসহ বাড়ছে নানা রোগ। বিশেষত ডায়াবেটিক রোগীদের চিকিৎসকরা নিয়ম করে দৈনিক দুইবার হাঁটতে পরামর্শ দেন। কিন্তু এই নগরে হাঁটার মত উপযুক্ত মাঠ বা খোলা স্থান কোথায়? ফলে এখন সময় এসেছে বিষয়টি নিয়ে ভাবার, সিদ্ধান্ত নেওয়ার, পরিকল্পিত নগর গড়ার এবং আগামী প্রজন্মের প্রয়োজনীয় বিকাশ নিশ্চিত করার। অন্যথায় নেতিবাচক পরিবেশেই বড় হতে হবে প্রজন্মকে। চরম খেসারত দিতে হবে জাতিকে।

রেজা মুজাম্মেল গণমাধ্যমকর্মী।

The Post Viewed By: 35 People

সম্পর্কিত পোস্ট