চট্টগ্রাম রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯

১৯ নভেম্বর, ২০১৯ | ২:২৮ পূর্বাহ্ন

মো. দিদারুল আলম

পেঁয়াজের বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য

পেঁয়াজের বাজারে দামের তেমন কোনো হেরফের নেই। পেঁয়াজের ঝাঁঝ সামলাতে নাভিশ্বাস ক্রেতাদের। এরই মধ্যে বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা বলছে, আন্তর্জাতিক বাজার ও অভ্যন্তরীণ খরচ বৃদ্ধি পাওয়াই দাম বাড়ছে। পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি রোধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই বাজারে। প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে পেঁয়াজের দর। ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

অসাধু ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ সংকটের সুযোগ নিয়ে কারসাজি করে দাম বাড়াচ্ছেন। কিন্তু একই সাথে এই প্রশ্নও ওঠে যে, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেবে, সংকট তৈরি হবে ইত্যাদি ইস্যুগুলো তো আগেই জানা ছিল, তাহলে সময়োচিত সিদ্ধান্ত নিয়ে আসন্ন সংকট মোকাবেলা করা গেল না কেন? এর পেছনে দায় কার? ব্যবসায়ীদের দায়ই বা কতটা? ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করেছিলো গত ২৯সেপ্টেম্বর। কিন্তু এরও আগে ১৩সেপ্টেম্বর পেঁয়াজ রপ্তানির ন্যূনতম মূল্য ৪শ’ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ ডলার করে ভারত।

আজকাল মিথ্যা কথা বলা অনেক ব্যবসায়ীর একটি চিরাচরিত অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। তারা অধিক মুনাফা অর্জনের জন্য মিথ্যা কথা বলা বা মিথ্যা শপথ করতে মোটেও কুণ্ঠাবোধ করে না। পবিত্র কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেও না। তবে পরস্পর সম্মতিক্রমে বেচাকেনার মাধ্যমে।’ (সুরা নিসা : ২৯)। পবিত্র কোরআনে রয়েছে বিভিন্ন মসলাজাতীয় উদ্ভিদের নাম। সেগুলোর মধ্যে একটি হলো পেঁয়াজ। এর বৈজ্ঞানিক নাম এলিয়াম সেপা। কোরআনের ভাষায় বলা হয় ‘বাসল’। পেঁয়াজ মানুষের খাবারের তালিকায় অত্যন্ত পছন্দনীয় একটি অংশ। বনি ইসরাঈলরা জান্নাতের খাবার ‘মান্না-সালওয়ার’ পরিবর্তে যেসব খাবারের চাহিদা করেছিল, তার একটি ছিল পেঁয়াজ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন তোমরা বলেছিলে, হে মুসা! আমরা এ ধরনের খাদ্যে কখনো ধৈর্য ধারণ করব না। সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের কাছে আমাদের জন্য প্রার্থনা করো। তিনি যেন ভূমিজাত দ্রব্য শাকসবজি, কাঁকুড়, গম, মসুর ও পেঁয়াজ আমাদের জন্য উৎপাদন করেন। মুসা বললেন, তোমরা কি উৎকৃষ্টতর বস্তুকে নিকৃষ্টতর বস্তুর সঙ্গে বদল করতে চাও? তবে কোনো নগরে অবতরণ করো। তোমরা যা চাও, নিশ্চয়ই তা সেখানে আছে। তারা লাঞ্ছনা ও দারিদ্র্যগ্রস্ত হলো এবং তারা আল্লাহর ক্রোধের পাত্র হলো। এটি এ জন্য যে তারা আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করত এবং নবীদের অন্যায়ভাবে হত্যা করত। অবাধ্যতা ও সীমা লঙ্ঘন করার জন্যই তাদের এই পরিণতি হয়েছিল।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৬১)। শায়বান (রহ.) …. মুগীরা ইবন শু’বা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি রসুন খাওয়ার পর মসজিদে গমন করি, যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত আদায় করতেন। এ সময় এক রাক’আত নামায শেষ হয়েছিল। যখনই আমি মসজিদে প্রবেশ করি, তখনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রসুনের গন্ধ পান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত আদায় শেষে বলেন, যে ব্যক্তি এ গাছ (পেয়াজ, রসুন) হতে কিছু খাবে, সে যেন ততক্ষণ আমাদের কাছে না আসে, যতক্ষণ না সে দুর্গন্ধ দূর হয়ে যায়। আমার সালাত আদায় শেষে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলি, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর শপথ! আপনি আপনার হাতখানা আমাকে দিন। এরপর আমি তাঁর হাত নিজের জামার নীচ দিয়ে আমার বুকের উপর রাখি। এ সময় আমার সীনা বাঁধা ছিল। তখন তিনি বলেন, তোমার তো উযর আছে, (অর্থাৎ প্রয়োজনের তাগিদে তুমি রসুন, পেয়াজ খেতে পার)।

তাছাড়া কাঁচা পেঁয়াজ খাওয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও স্বাস্থ্যঝুঁকিও কম নয়। পেঁয়াজকে বলা হয় বায়ুনাশক; কিন্তু রান্না করা পেঁয়াজ বায়ুকারক হয়ে যায়। রান্নায় বেশি পেঁয়াজ দিলে অনেক সময় পেটে গ্যাসের উদ্রেক হয়। বারবার ঢেকুর ওঠে। এতে অনেকের পেটে ব্যথা হয়, পেট ফুলে যায়। অনেকের পেট গরম হয়ে বারবার পাতলা পায়খানা হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে পেঁয়াজ জোলাপের কাজ করে। এ কারণেই হয়তো রাসুল (সা.) দুটি গাছ খেতে বারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি ওই গাছ দুটি থেকে খাবে, সে যেন কিছুতেই আমাদের মসজিদে না আসে। তিনি আরো বলেছেন, তোমাদের যদি একান্ত এটি খেতে হয়, তাহলে রান্না করে দুর্গন্ধ দূর করে খাও। বর্ণনাকারী বলেন, গাছ দুটি হলো পেঁয়াজ ও রসুন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৮২৭)। বাস্তবেও যদি কেউ পেঁয়াজকে সঠিকভাবে সঠিক সময়ে ব্যবহার করে, তবে তা তার ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, হজমশক্তি, ত্বকের সমস্যা ইত্যাদির জন্য উপকারী হবে। আবার কেউ যদি অপব্যবহার করে, যেমন: মসজিদে যাওয়ার আগে কাঁচা খেয়ে যায়, সে ফেরেশতাদের অভিশাপের সম্মুখীন হবে।

পেঁয়াজ নিয়ে রাজনীতি করা অসাধু ব্যবসায়ীরা কোটি মানুষের অভিশাপের পাত্র হচ্ছে। তারা পেঁয়াজের বাজারে সিন্ডিকেট তৈরি করে হারাম সম্পদ অর্জন করছে। তাদের অনেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের শাস্তি ও লাঞ্ছনারও শিকার হচ্ছে। পরকালেও তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। আহমদ ইবন হাম্বল (রহ.) ইবন উমার (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি এ গাছ (রসুন, পেঁয়াজ) হতে কিছু খাবে, সে যেন মসজিদে না আসে।

ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রতারণার আশ্রয় নেয়া সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ও হারাম। ক্রেতাকে ঠকানোর জন্য পণ্যের দোষ-ত্রুটি গোপন করা জায়েজ নয়। হযরত ইবনে উমর (রা.) বলেন, নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি ক্রয়-বিক্রয়ে প্রতারণার আশ্রয় নেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’। অপর একটি হাদিসে আছে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতারণামূলক বেচাকেনাকে নিষিদ্ধ করেছেন’। (মুসনাদে ইমাম আবু হানিফা)। এ বিষয়ে তিরমিযি শরিফে একটি হাদিসে আছে, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার খাদ্যপণের একটি স্তুপের মধ্যে হাত প্রবেশ করালে কিছুটা আদ্রতা অনুভব করেন, তিনি খাদ্যশস্যের মালিককে বলেন, কি ব্যাপার এ খাদ্যশস্য ভিজা কেন? তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল! এ খাদ্যশস্যের ওপর বৃষ্টির পানি পড়েছিল। রাসুল (সা.) বলেন, তবে ভিজে যাওয়া পণ্য ওপরে রাখলেনা কেন? যাতে মানুষ তা দেখতে পেত। অতঃপর তিনি ইরশাদ করেন, শোন, যে প্রতারণা করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (মুসলিম শরিফ, মেশকাত শরিফ ২৪৮)। আরবের লোকেরা দুধের পশু বিক্রি করার সময় প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করত। তারা কয়েক দিন পর্যন্ত পশুটির দুধ দোহন না করে রেখে দিত, এতে স্তনে দুধ জমা হয়ে স্তন ফুলে যেত আর গ্রাহক দেখে মনে করত পশুটি প্রচুর দুধ দেয়, এই ভেবে তারা চড়া মূল্যে তা খরিদ করে প্রতারিত হত। রাসুলুল্লাহ (সা.) এভাকে পশু বিক্রি করতে নিষেধ করেন। (বুখারি শরিফ, মুসলিম শরিফ)।

আমাদের সমাজে এক শ্রেণিীর মানুষ অধিক মুনাফা লাভের আশায় পণ্য মজুদ বা স্টক করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত গর্হিত কাজ এবং মানবতার প্রতি চরম ধৃষ্টতা প্রদর্শনের শামিল। কিছু মানুষ খাদ্যাভাবে কষ্টে দিনাতিপাত করবে, আর কিছু মানুষ নিজেদের হীন স্বার্থ চরির্তাথ করার জন্য কৃত্রিম খাদ্য সংকট সৃষ্টি করবে- এটা ইসলাম সমর্থন করে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি মজুদদারী করে সে পাপাচারী’। (শুয়াবুল ঈমান) তবে মনে রাখতে হবে, মজুদদারী সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ নয়। যদি মজুদদরীর কারণে বাজারে পণ্য-সংকট সৃষ্টি না হয়, অথবা সে উদ্দেশ্যে মজুদদরী করা না হয় তবে তা জায়েজ। সুতরাং মৌসুমের বিপুল আমদানিকালে কম মূল্যে পণ্য খরিদ করে স্টক করে রেখে পরে তা অধিক মূল্যে বিক্রি করা বৈধ। তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য বাজারে ছেড়ে দেয়া সর্বাবস্থায়ই উত্তম।

মো. দিদারুল আলম কলামিস্ট।

The Post Viewed By: 37 People

সম্পর্কিত পোস্ট