চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৫ মার্চ, ২০২১

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ | ৩:১৫ পূর্বাহ্ণ

পাজিদের খুঁজে বের করুন লাগামহীন পেঁয়াজের দাম

পেঁয়াজের বাজারে তুঘলকি কা- বন্ধ না হয়ে বরং লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজের বাজার নিয়ে দুর্বৃত্তপনা প্রায় নির্বিঘেœই চালিয়ে যাচ্ছে। অতি মুনাফাশিকারি সিন্ডিকেটগুলোর কারসাজিতে বাজারে আরও দুর্মূল্য হয়ে উঠেছে পেঁয়াজ। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী এখন বাজারে পেঁয়াজ বিক্রয় হচ্ছে ২৬০ টাকা প্রতি কেজি। প্রতি ঘণ্টায় বাড়ছে পেঁয়াজের দাম। অথচ মাসখানেক আগেও প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ছিল ৭০-৮০ টাকা। বর্তমানে এক কেজি পেঁয়াজের দামে প্রায় আট কেজি মোটা চাল পাওয়া যাচ্ছে। নিত্যদিনের খাদ্যতালিকার অতি গুরুত্বপূর্ণ এই পণ্যটির দাম গত দু’মাস থেকেই কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়লেও বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। কিন্তু পেঁয়াজের দামের এই যুক্তি ও বাধাহীন উল্লম্ফন অসাধু ব্যবসায়ীদের পকেট ভারী করলেও সাধারণ মানুষদের জীবনে দুর্ভোগের পরিধি আরো প্রশস্ত করছে।

বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা ধারণা, পেঁয়াজসিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর পদক্ষেপের অভাবেই মূলত অসাধু ব্যবসায়ীরা মুনাফা শিকারে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বাজারে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার হলে, একইসঙ্গে মুনাফা লুঠেরাদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকলে মুনাফালোভীরা তাদের কুইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে পারতো না। দৈনিক পূর্বকোণে প্রকাশিত এক খবরে দেখা যাচ্ছে, বৃহস্পতিবার রাতে নগরীর খাতুনঞ্জের সিটি কর্পোরেশনের ময়লার ভাগাড় থেকে ২০ টন পচা পেঁয়াজ সরাতে হয়েছে পরিচ্ছন্নকর্মীদের। তবে এসব পেঁয়াজ দোকানির গুদামে থেকে পচে নষ্ট হয়েছে নাকি আমদানি করা পেঁয়াজ পচা হওয়ায় ব্যবসায়ীরা ফেলে দিয়েছে তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। ধারণা করা হচ্ছে, অতি মুনাফার আশায় এসব পেঁয়াজ গুদামজাত করায় পচে নষ্ট হয়েছে। পচনশীল পণ্য হওয়ার পরও অতি মুনাফার লোভে ব্যবসায়ীরা এসব পেঁয়াজ গুদামে রেখে দিয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা এভাবে পেঁয়াজ পচিয়ে নষ্ট করছে, তবুও বাজারে ছাড়ছে না, অতি মুনাফার জন্যে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ যদি এদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতো তাহলে পেঁয়াজের এমন বাজারচিত্র দেখতে হতো না নিশ্চয়ই। গণমাধ্যমের খবর বলছে, দেশে এখন ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ছে পেঁয়াজের দাম। সরকারের উদ্যোগ, বাণিজ্যমন্ত্রীর আশ্বাস কোনো কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। প্রতিদিনই দামের ক্ষেত্রে নতুন নতুন রেকর্ড গড়ছে পেঁয়াজ। শুধু দেশেই নয়, এই মুহূর্তে বিশ্বে পেঁয়াজের দাম সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। আন্তর্জাতিক অনলাইন মার্কেটপ্লেস ট্রিজর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজের গড় পাইকারি মূল্য ৬৮ সেন্ট যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৮ টাকা। অথচ বাংলাদেশে এখন প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২৬০ টাকা। এছাড়া পাশের দেশ ভারতে পাইকারিতে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয় ৬২ সেন্ট, চীনে ২৮ সেন্ট, পাকিস্তানে ৩৯ সেন্ট, ও মিশরে ১৭ সেন্ট কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে।

শুক্রবার খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ২৬০ টাকা ছাড়িয়েছে। যা রীতিমতো অবিশ্বাস্য! এ অবস্থায় স্বল্প আয়ের মানুষ ক্ষুব্ধ, হতাশ। বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বলছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী পেঁয়াজের সংকটকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে ইচ্ছামতো দামে পেঁয়াজ বিক্রি করছে। তবে বর্তমানে চাহিদার চেয়ে বেশি পরিমাণ পেঁয়াজ দেশে রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে মোট পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ২৩ দশমিক ৩০ লাখ টন। এরমধ্যে ৩০শতাংশ সংগ্রহকালীন ও সংরক্ষণকালীন ক্ষতি বাদ দিলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ৩০ লাখ টন। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ১০ দশমিক ৯১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। এছাড়া চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ২ দশমিক ১৩ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। সবমিলিয়ে মোট পেঁয়াজের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ২৯ দশমিক ৩৪ লাখ টন। দেশে প্রতি বছর পেঁয়াজের চাহিদা ২৪ লাখ টন। এই হিসেবে গত বছর থেকে এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ পেঁয়াজ দেশে আছে তা চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি। তাহলে এভাবে লাগামহীনভাবে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে কেন? এতে স্পষ্ট হয় একশ্রেণির ব্যবসায়ী কারসাজি করে এখন পেঁয়াজের দাম বাড়াচ্ছে। মিশর, মিয়ানমার, তুরস্ক ও চীন থেকে যে দামে পেঁয়াজ আমদানি করা হচ্ছে তাতেও দেশের বাজারে কোনোভাবেই পেঁয়াজের দাম ৮০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।

আমরা মনে করি, দফায় দফায় দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে ক্রেতাসাধারণের পকেট কাটার বিষয়টিকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বাজারমূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার জন্য যা যা করা দরকার, করতে হবে। অযৌক্তিক মুনাফাকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। টিসিবির মাধ্যমে পেঁয়াজ আমদানি ও বিক্রি, বাজারে মূল্যতালিকা টাঙানো, বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন, ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ নানা পদক্ষেপে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 148 People

সম্পর্কিত পোস্ট