চট্টগ্রাম সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১২ নভেম্বর, ২০১৯ | ২:০৩ পূর্বাহ্ন

জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর অমূল্যায়িত সেবাকাজের স্বীকৃতি প্রয়োজন

মানবসভ্যতার বিকাশ ও সমৃদ্ধির মূলে পুরুষের পাশাপাশি নারীরও যে বিশাল ভূমিকা আছে তা অস্বীকারের সুযোগ নেই। মানবজাতির সূচনালগ্ন থেকেই নারী-পুরুষ হাত ধরাধরি করে মানবসভ্যতার উৎকর্ষ সাধনে কাজ করে যাচ্ছে। তবে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বব্যবস্থায় পুরুষের অবদানের স্বীকৃতি মিললেও নারীর নীরব অবদানের স্বীকৃতি মিলেনি এখনো। আজকে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যে উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে এগিয়ে যাচ্ছে তার নেপথ্যে আছে নারীসমাজের বিশাল ভূমিকা। নারীরা আজ ঘরে-বাইরে নানা কাজে সম্পৃক্ত থেকে দেশকে সমৃদ্ধির বন্দরে নিয়ে যেতে সাহায্য করছে। কিন্তু নারীর নীরব অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না; জিডিপিতে নেই তাদের অবদানের বলিষ্ঠ স্বীকৃতি। ঘরের বাইরের কাজের স্বীকৃতি মিললেও ঘরের কাজের কাক্সিক্ষত মূল্যায়ন হয় না। নানা জরিপ ও গবেষণারিপোর্ট বলছে, বাইরের কাজের সাথে ঘরের কাজও যোগ হয়ে বরং নারীর কাজ এখন দ্বিগুণ হয়ে গেছে। একজন নারীর সারাদিনের কাজের অন্তত ৪০ শতাংশ এই কাজে ব্যয় হয়, কিন্তু তার কোন মূল্যায়ন হয় না। অথচ নারীর অধিকার রক্ষায় এ ধরণের কাজের মূল্যায়ন করা জরুরি।

শনিবার ইউসুফ চৌধুরী কনফারেন্স হলে মানুষের জন্য ফাইন্ডেশন’র সহায়তায় দৈনিক পূর্বকোণ আয়োজিত ‘নারীর অমূল্যায়িত সেবাকাজের মূল্যায়ন এবং জিডিপিতে সেই কাজের সংযোজন’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারাও টেকসই উন্নয়ন ও দেশকে দ্রুত উন্নতির শীর্ষে নিয়ে যেতে এবং নারীর সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে নারীর অবমূল্যায়িত কাজের স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তার কথা দৃঢ়তার সাথে বলেছেন। তাদের বক্তব্যে দেশে নারীদের অমূল্যায়িত সেবাকাজের চিত্র এবং আর্থিক মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে জিডিপিতে এর অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে এসেছে। গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা যথার্থই বলেছেন, রাষ্ট্রের সবক্ষেত্রে নারী এবং পুরুষ সমভাবে অংশগ্রহণ করতে পারলে সে রাষ্ট্র উন্নতির দিকে ধাবিত হয়। তাই নারীদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে হবে। একজন নারী ঘরে ও বাইরে কাজ করেন। ঘরের কাজের কোনো আর্থিক মূল্য থাকে না। আবার সম্মান ও মর্যাদাও পান না সব ক্ষেত্রে, সব পরিবারে। ঘরের বাইরের কাজেও বেশিরভাগ নারী নিজের কাজের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। বিশেষ করে শ্রমজীবী নারীরা পুরুষের তুলনায় বেশি কাজ করলেও পারিশ্রমিক পান পুরুষের তুলনায় কম। নানা অজুহাতে নারীকে ঠকানো হলেও রাষ্ট্র নারীর ন্যায্য অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখে না। পরিবারের জন্য যে কাজ নারীরা করেন, তারও নেই আর্থিক মূল্য। ফলে জিডিপিতে তা অন্তর্ভুক্ত হয় না। এটি যুক্তিযুক্ত নয়। আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা গেলে নারীর অবদানের ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টি হবে। এতে নারীর প্রতি সম্মান ও মর্যাদা বাড়বে। পাল্টে যাবে আমাদের জিডিপি’র চিত্রও। সংগতকারণে রাষ্ট্রকেই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া উচিত। সচেতন মানবতাবাদী নাগরিক এবং সামাজিক সংগঠনগুলোরও এ ব্যাপারে সোচ্চারকণ্ঠ হওয়ার প্রয়োজন আছে দেশস্বার্থে। সচেতন নারীদেরও এ বিষয়ে ভূমিকা রাখা দরকার।

বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, গৃহস্থালি ও সেবামূলক দৈনন্দিন কাজে একজন নারী দৈনিক গড়ে ১৮ ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন। ধানের বীজ উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাত পর্যন্ত মোট ২৩টি ধাপের ১৭টি কাজই করেন নারী। গবাদিপশু পালনসহ কৃষির বিভিন্ন খাতে নারীর অবদান প্রায় ৬৯ শতাংশ। পরিবারের কাজে নারী ও পুরুষের সময় বিনিয়োগ বিষয়ে এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গৃহস্থালি সেবামূলক কাজে নারীরা যেখানে ৮ দশমিক ৮ ঘণ্টা কাজ করেন, পুরুষেরা সেখানে কাজ করেন ১ ঘণ্টা। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’ প্রকাশিত এক প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের নারীদের বার্ষিক মজুরিবিহীন গৃহকাজের অর্থনৈতিক মূল্য এক লাখ ১১ হাজার ৫৯১ দশমিক ৪৮ কোটি টাকা। ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের একটি গবেষণায় দেখা যায়, শতকরা ৮১ ভাগ নারী সরাসরি গৃহস্থালি কাজে নিয়োজিত থাকে। শিশুর যত্ন, রোগীর সেবা, ঘরের যাবতীয় কাজের দায়িত্ব পালনসহ প্রতিনিয়ত তারা অনেক দায়িত্বশীল ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু গৃহস্থালিতে নারীর এসব কাজ অদৃশ্য শ্রম হিসাবে বিবেচনা করায় তাদের অবদান মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। ঘরে-বাইরে সেবামূলক ও অর্থনৈতিক কাজে নারীর অবদান বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্বীকৃতি পায় না। নেই উপযুক্ত মূল্যায়ন-মর্যাদা। গৃহস্থালির সেবামূলক কাজের স্বীকৃতি এবং এর কোনো অর্থমূল্য না থাকায় জাতীয় আয়ে নারীর অবদানের কোনো প্রতিফলনও ঘটে না। এই পরিস্থিতি নারী-পুরুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থান ও বৈষম্যকে আরও প্রকট করে তুলছে।

আমরা মনে করি, দেশকে দ্রুত এগিয়ে নিতে চাইলে অমূল্যায়িত সেবা খাতে নারীর কাজের স্বীকৃতি ও যথাযথ মর্যাদা দেয়া জরুরি। যদিও রান্না করা, বাসন মাজা এবং বাচ্চাদের যত্ন নেয়া প্রভৃতি কাজের কোনো সঠিক আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। একজন নারীর সংসারের প্রতি দায়িত্ব ও ভালবাসার মূল্য অনেক, যা টাকার অংকে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবুও নারীর অমূল্যায়িত কাজের স্বীকৃতি এবং তাঁদের প্রতি পরিবার ও সমাজের সম্মানসূচক দৃষ্টিভঙ্গি বৃদ্ধির স্বার্থে জনসচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এবং পারিশ্রমিকবিহীন কাজের আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করে তা জিডিপির হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর গৃহস্থালি কাজের অবদানের স্বীকৃতি দেয়া হলে নারীর সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে, নারীর প্রতি বৈষম্যের হার কমে আসবে, একইসঙ্গে কমে যাবে নারীনির্যাতনের ঘটনা।

The Post Viewed By: 230 People

সম্পর্কিত পোস্ট