চট্টগ্রাম শনিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

২২ অক্টোবর, ২০১৯ | ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ

ইঞ্জিনিয়ার উসমান সরওয়ার আলম

নিরাপদ সড়ক দিবসের ভাবনা

১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশ অনুসারে বিআরটিএ গঠিত হয়। ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট আথরিটি (বিআরটিএ) সৃষ্টির পর থেকে সড়ক পরিবহন সেক্টরের সার্বিক তত্ত্বাবধান, ব্যবস্থাপনা ও সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে কাজ করে আসছে। বর্তমান সরকারের আমলে সড়ক পরিবহন সেক্টরে শৃংখলা আনয়নের লক্ষ্যে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও বিভিন্ন বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে গ্রাহক সেবার মান বৃদ্ধিসহ সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে।

বাংলাদেশ পৃথিবীর একটি অন্যতম জনবহুল দেশ। বাংলাদেশের আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা ১৭ কোটি। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর-এর আওতায় ৩৮১২.৭৮ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক ও ৪২৪৬.৯৭ কিলোমিটার আঞ্চলিক সড়ক রয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সহজে ও স্বল্প ব্যয়ে যাত্রী চলাচল ও পণ্য পরিবহণে সড়ক পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে যাত্রী পরিবহনের প্রায় ৭০% এবং পণ্য পরিবহনের ৮০% সড়ক পথে পরিবহণ করা হয়ে থাকে। সে কারণে সড়ক পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য, কারণ দুর্ঘটনা ঘটেনা, ঘটানো হয়। অর্থাৎ দুর্ঘটনা কোন অলৌকিক কারণে সংঘটিত হয়না, বরং লৌকিক কারণে হয়ে থাকে-সেটা হতে পারে চালকের ত্রুটি, যানবাহনের, পথচারীর বা রাস্তার ত্রুটি ইত্যাদি। যদি এ সব বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা যায় তাহলে সড়ক দুর্ঘটনার হার কমানো সম্ভব। দুর্ঘটনা কমলে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে হ্রাস পাবে। এ জন্য প্রয়োজন সড়ক নির্মাণকারী সংস্থা, প্রশাসন, পুলিশ, পরিবহণ মালিক, পরিবহণ শ্রমিক, জনসাধারণ, সড়ক ব্যবহারকারী সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

সড়ক দুর্ঘটনা কারণসমূহ : মাত্রাতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত যাত্রী ও মাল বহন করা, বিপজ্জনক/ঝুঁকিপূর্ণভাবে ওভারটেক করা, যান্ত্রিক ত্রুটিযুক্ত গাড়ি চালানো, প্রশিক্ষণবিহীন ও স্বল্প প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত অদক্ষ অযোগ্য ড্রাইভার কর্তৃক গাড়ী চালানো এবং নেশাগ্রস্থ অবস্থায় গাড়ী চালানো, মহাসড়কে ধীর গতি সম্পন্ন যানবাহন চলাচল যেমন থ্রি হুইলার, নসিমন, করিমন, ভটভটি, ইজি বাইক ইত্যাদি, অপ্রশস্ত রাস্তা এবং রাস্তার নির্মাণজনিত ত্রুটি, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, অবৈধভাবে ওভার টেকিং করা এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করা, বাসের ছাদে ও মালবাহী ট্রাকের উপর যাত্রী/মালামাল বহন করা, নিরাপদে সড়ক ব্যবহার সম্পর্কে সড়ক ব্যবহারকারীদের অজ্ঞতা ও আইন না মানার প্রবণতা, ফুটপাথ ব্যবহার না করে রাস্তার মাঝ পথে চলা এবং ফুট ওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে ব্রিজের নীচ দিয়ে রাস্তা পার হওয়া, বিভিন্ন পরিবহনের অসুস্থ ও বিপদজনক প্রতিযোগিতা,যত্রতত্র পার্কিং ও রাস্তার মাঝে গাড়ি দাঁড় করানো, সড়ক নিরাপত্তা জনিত ট্রাফিক সাইন/সিগন্যাল ও রোড মার্কিং পর্যাপ্ত পরিমানে না থাকা, অবৈধভাবে ফুটপাথ দখল এবং মহাসড়কের পাশে অবৈধ হাটবাজার ও অবকাঠামো নির্মাণ, ডানে ও বামে না দেখে দৌড়ে রাস্তা পার হওয়া এবং পথচারী ও সড়ক ব্যবহারকারীগণ কর্তৃক অসতর্কভাবে সড়ক ব্যবহার করা, মহাসড়কগুলোতে ডিভাইডার না থাকা, ট্রাফিক আইন প্রয়োগে শিথিলতা, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের হেলমেট ব্যবহারে অনীহা, গাড়ি চালানো অবস্থায় চালক কর্তৃক এয়ার ফোন ও মোবাইল ফোনে কথা বলা, হেলপার দ্বারা গাড়ি চালানো।

সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিকারের উপায়সমূহ হলো : মাত্রাতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো ও অতিরিক্ত মালামাল বোঝাই/গাড়ি ছাদে যাত্রী উঠানো এ সব কার্যক্রম বন্ধে হাইওয়ে পুলিশের টহল বাড়ানো এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা, পেশাজীবী গাড়ি চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান, জাতীয় মহাসড়কে থ্রি-হুইলার অটোরিক্সা ও অটোটেম্পু, ইজিবাইক, নসিমন, করিমন, ভটভটি ও ব্যাটারিচালিত যানবহান এবং সকল প্রকার অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল বন্ধ করা, যানবাহনে অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণের (এক্সেল লোড) বিষয়টি আরও কঠোরভাবে কার্যক্রম করা, মহাসড়কের পাশে স্লোমুভিং যানবহানের জন্য আলাদা রো/লেন নির্মাণ করা, হাইওয়ের টার্নিং পয়েন্টে রোড-ডিভাইডার নির্মাণ এবং পর্যাপ্ত ট্রাফিক সাইন ও সিগন্যাল স্থাপন করা, পথচারীদের ফুটপাথ ও ফুট ওভার ব্রিজ ব্যবহার বাধ্য করা, প্রতিযোগিতামূলক গাড়ি চালানো হতে চালকদের বিরত রাখা, প্রধান মহাসড়গুলোতে ডিভাইডার দেয়া এবং ক্রটিপূর্ণ রাস্তা তাৎক্ষণিকভাবে মেরামত করা, অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো বন্ধে কার্যকর করা এবং নির্ধারিত গতিসীমার মধ্যে গাড়ি চালাতে চালকদেরকে বাধ্য করা, সড়ক নিরাপত্তামূলক বক্তব্য ও বিজ্ঞাপন বিভিন্ন ইলেকটনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াতে প্রচার করা, স্কুল/কলেজের পাঠ্যসূচীতে শ্রেণী ও বয়সভিত্তিক সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক পাঠ্য অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থা করা, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীকে হেলমেট পরিধান এবং গাড়ীচালকদের সিটবেল্ট ব্যবহারে বাধ্য করা, গাড়ি চালকদের নেশা জাতীয় পানীয় সেবন ও তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় গাড়ি চালানো হতে বিরত থাকা, সড়ক/মহাসড়কে ধান শুকানো ও নির্মাণ সামগ্রী রাখা বন্ধ করা, সড়ক ও মহাসড়কে দুর্ঘটনা প্রবন এলাকা চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করা, প্রতি পাঁচ ঘণ্টা গাড়িচালনার পর কমপক্ষে আধাঘণ্টা বিশ্রাম, দিয়ে সর্বোচ্চ আট ঘণ্টা এবং সপ্তাহে আটচল্লিশ ঘণ্টার অধিক গাড়ি না চালানো, দূর পাল্লার গাড়িতে একাধিক চালক নিয়োগ নিশ্চিত করা।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধকল্পে বিআরটিএ’র বর্তমান কার্যক্রম ঃ

জাতীয় মহাসড়কে থ্রি হুইলার, নসিমন, করিমন, ভটভটি, ইজি বাইক ইত্যাদি যানবাহন চলাচল বন্ধের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। দক্ষ ও মানবিক গুনসম্পন্ন গাড়িচালক তৈরী করার নিমিত্তে বিআরটিএ সদর কার্যালয়ের নির্দেশনায় সার্কেলগুলোতে পেশাজীবী গাড়িচালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। ২০০৯ হতে জুলাই ২০১৮খ্রি: তারিখ পর্যন্ত সময়কালে পেশাজীবী গাড়ি চালকদের সড়ক নিরাপত্তা, ট্রাফিক আইন ও সচেতনতামূলক বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে এবং এ কার্যক্রম অব্যাহত আছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে ফিটনেসবিহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ, অধিক পুরাতন যানবাহন চলাচল বন্ধ ও নিরাপদ সড়ক সংক্রান্ত বিশেষ সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। সারাদেশে মহানগরী জেলাশহর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টসহ বিআরটিএ’র উদ্যোগে সড়ক নিরাপত্তা ও গণসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক শ্লোগান সম্বলিত স্টিকার, লিফলেট ও পোষ্টার গাড়িচালক, যাত্রী, পথচারী ও সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে নিয়মিতভাবে বিতরণ করা হচ্ছে এবং এ কার্যক্রম অব্যাহত আছে। মোটর সাইকেল চালক ও আরোহীদের হেলমেট এবং পথচারী ও জনগণকে জেব্রাক্রসিং ও ফুটওভারব্রিজ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ঢাকাসহ সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ি ও চালকের বিরুদ্ধে আইনানুগ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণসহ, রেজিস্ট্রেশনবিহীন ও ফিটনেসবিহীন এবং রুট পারমিটবিহীন যানবাহনের ফিটনেস সার্টিফিকেট বাতিলের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া কালো ধোঁয়া নির্গমণকারী যানবাহন এবং রং চটা ও চল্টা উঠা যানবাহনের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের সহায়তায় ও বিআরটিএ’র নিজস্ব মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩ এর আওতায় মামলা, জরিমানা আদায়, অপরাধী আসামীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড প্রদান এবং ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ডাম্পিং স্টেশনে প্রেরণ করা হয়েছে। সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি স্কুলের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভূক্তির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের উপর অবস্থিত হাট-বাজার ও বাণিজ্যিক স্থাপনা অপসারণের লক্ষে সকল জেলা ও পুলিশ প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। প্রতি বছর জেলা সদরে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদেরকে সড়ক নিরাপত্তামূলক বিষয়ে সচেতন করার লক্ষ্যে সমাবেশ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় সড়ক নিরাপত্তা ও গণসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক বক্তব্য/বিজ্ঞপ্তি বহুল প্রচার করা হয়েছে। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল ও সড়ক নিরাপত্তা উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠনপূর্বক নিয়মিত সভা অনুষ্ঠানের আয়োজনসহ সভার সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

মেট্রোপলিটন সড়ক নিরাপত্তা কমিটি, জেলা সড়ক নিরাপত্তা কমিটি এবং উপজেলা সড়ক নিরাপত্তা কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। কমিটিগুলো তাদের নিজ নিজ এলাকায় সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসকল্পে বিআরটিএ প্রতি তিন বছর অন্তর জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে থাকে। তাই এ বছরের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘জীবনের আগে জীবিকা নয়, সড়ক দুর্ঘটনা আর নয়’।

ইঞ্জিনিয়ার উসমান সরওয়ার আলম
সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি), বিআরটিএ,
চট্ট মেট্রো-২ সার্কেল, চট্টগ্রাম।

The Post Viewed By: 82 People

সম্পর্কিত পোস্ট