চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৩ অক্টোবর, ২০১৯ | ১:১০ পূর্বাহ্ণ

নাওজিশ মাহমুদ

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিময় আগরতলা ও চট্টগ্রামের শিল্পীদের চিত্র প্রদর্শনী

২০১৯ সালের ২২ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর আগরতলায় নজরুল কলাক্ষেত্র আর্ট গ্যালারীতে চট্টগ্রামের শিল্পীদের আঁকা চিত্রপ্রদর্শনী হয়ে গেল। এই চিত্র প্রদর্শনী আয়োজন করেছিল তিনটি প্রতিষ্ঠান। চারুকলা ইনস্টিটিউট চট্টগাম বিশ^বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম চারুশিল্পী সম্মিলন ও চট্টগ্রাম চারুশিল্পী পর্ষদ, ঢাকা। চট্টগ্রামে চারুকলার চর্চার ৫০ বছর পূর্তিতে এই চিত্রপ্রদর্শনী। প্রায় ৪০জনের বিরাট বহর এসেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে। প্রদর্শনীতে প্রদর্শীত চিত্রসহ একটি স্যুভেনিয়রও প্রকাশ করেছে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন আগরতলায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের সহকারী হাইকমিশনার কিরিটি চাকমা এবং উদ্বোধন করেন ত্রিপুরা রাজ্যের সমাজকল্যাণমন্ত্রী সান্তনা চাকমা। বিশেষ অতিথি ছিলেন চারু ও চারুকলা কলেজের অধ্যক্ষ অভিজিৎ ভট্টাচার্য।

“আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে” সঙ্গীত দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর চট্টগ্রামের শিল্পীদের আঁকা চিত্রসমূহ সকলে ঘুরে ঘুরে দেখেন। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে চিত্র পদর্শনী উপভোগ্য হয়ে উঠেছিল। চলছিল আড্ডা। এই দলের সাথে এসেছেন চট্টগ্রাম ইউএসটিসির ইংরেজির অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদ। যিনি ছাত্রদের অসৌজন্যমূলক আচরণের প্রতিবাদে শিক্ষকতা ত্যাগ করেছেন। উনার সাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বললাম। একজন মৃদুভাষী, ন¤্র-ভদ্র কিন্ত নীতিতে অটল এই ভদ্রলোককে দেখে যেমন প্রতিবাদ করার সাহস পাওয়া যায়, তেমনি বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্মের ঔদ্ধত্যের জন্য নিজেদেরকে দায়ী মনে হয়। কারণ যে বাংলাদেশের জন্য আমরা যুদ্ধ করেছি, সে দেশের তরুণ প্রজন্ম এ ধরনের আচরণ আমাদের ব্যর্থতা এবং অক্ষমতাকেই সামনে নিয়ে আসে।
সেই সাথে পরিচয় হলো মোহম্মদ ইউনুস নামের আরেকজন চিত্রশিল্পীর সাথে। যিনি আগ্রহ নিয়ে আমার সাথে পরিচিত হলেন। যখন শুনলেন আমি চট্টগ্রামেরই সন্তান এবং পূর্বকোণেই কলাম লিখে থাকি। তখন আমাকে ধন্যবাদ জানালেন চিত্র প্রদর্শনীতে আসার জন্য। বৃষ্টি কমার লক্ষণ না দেখে এই অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক বিজন মজুমদারসহ একই ট্যাক্সিতে হোটেল ফিরে আসি। কারণ বিজন মজমুদার সিম কিনার জন্য বাজারে আসা দরকার ছিল। আবার অনুষ্ঠানে ফিরে যাবেন। তবে চট্টগ্রামের চিত্রশিল্পীদের আগরতলায় চিত্রপ্রদর্শনী আগরতলার সাথে চট্টগ্রামের নতুন করে সেতুবন্ধন তৈরীতে সাহায্য করবে।

একসময় চট্টগ্রাম ত্রিপুরা রাজার অধীনে ছিল। ১৪১৩ সাল থেকে ১৪১৭ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম দখল নিয়ে বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন শাহের যুদ্ধ হয়েছিল। চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে আরকান, ত্রিপুরা রাজা , বাংলার শাসকদের (স্বাধীন সুলতান ও মোঘল) এবং পর্তুগীজদের সাথে চতুর্থমুখী লড়াই ছিল ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ এই অঞ্চলের বর্হিবাণিজ্যসহ সমৃদ্ধি অনেকাংশ নির্ভর করতো চট্টগ্রাম বন্দর কার অধীনে থাকবে সেটার উপর।

এই অনুষ্ঠানে আমার উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল বন্ধু স্বপন আচার্যের সৌজন্যে। স্বপন আচার্য একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে আর্ট ডাইরেক্টর হিসেবে অবসরে গিয়েছে। একজন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী এবং সংগঠক। ঢাকায় সপরবিারে বাস করে। চট্টগামের চিত্রশিল্পীদের প্রায়-অভিভাবক। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিএলএফ এর ৪র্থ ব্যাচে আমরা একসাথে দেরাদুনের টান্ডুয়ায় প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। কথা ছিল আমরা দু’জন শ্রীধর ভিলা, গ্লাস ফ্যাক্টরী এবং উদয়পুরের তেপানিয়া ট্রানজিট ক্যাম্প ঘুরে আসবো। সেই সাথে যাবো হরিনা ইয়ুথ ক্যাম্পে, যেখানে ১৯৭১ সালে প্রশিক্ষণের পূর্বে অবস্থান করেছিলাম। সাবরুম এবং বৈষ্ণবপুর যাবো। বৈষ্ণবপুর দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিলাম। বৈষ্ণবপুর দিয়ে ভারতে থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলাম। তাই বৈষ্ণবপুর যাওয়ার জন্য মনটা খুবই উদগ্রীব ছিল। কিন্তু সময়ের অভাবে হরিণা, সাব্রুম এবং বৈষ্ণবপুর যাওয়া হয়নি। কারণ আগরতলা থেকে আসার পূর্বেই বাংলাদেশ থেকে আগরতলা কলকাতার অগ্রিম টিকেট কেটে রেখেছিলাম।

২৩/০৯/১৯ তারিখ স্বপন আচার্য সময় দিতে না পারায় আমি একাকী খুঁজে বের করলাম গ্লাস ফ্যাক্টরী। সাথে নিলাম যুদ্ধের সময় শ্রীধর ভিলার যিনি থাকতেন, সপরিবারে বাস করতেন, শ্রী বিরেন্দ্রকুমার মজুমদারের একমাত্র সন্তান শ্রী কিরীট বিক্রম মজমুদারকে। ১৯৭১ সালে যার বয়স ছিল ২০ বছর। একাদশ শ্রেণীতে পড়তেন। বিক্রম মজমুদার থাকেন জিরানিয়া। আগরতলা থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার পূর্বদিকে। শ্রীধর ভিলার অংশিদার ছিলেন বীরেন্দ্র মজুমদারদের ছয়ভাই। বীরেন্দ্র মজুমদার সকলের বড়। অন্যরাও চাকুরীর সুবাধে বাহিরে থাকতেন। শুধু তিনিই শ্রীধর ভিলায় থাকতেন। আগরতলা গাড়ীর ব্যবসা করতেন। সকলের বড় হওয়ায় সকল সিদ্ধান্ত তিনি নিতেন। অন্যরা মেনে নিতেন।

ইতোপূর্বে আমি শ্রীধর ভিলা গিয়েছি। ছবিসহ বর্তমান বাসিন্দাদের নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেম। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের বাসিন্দা শ্রী বিক্রমের সাথে তখন দেখা না হওয়ায় অনেক তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এই শ্রীধর ভিলায় থাকতেন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ছাত্রলীগের সম্ভাবনাময় কেন্দ্রীয় নেতা চট্টগ্রামের স্বপন চৌধুরীসহ তাঁর মা ও বোনেরা। শ্রীধরভিলাকে বিএলএফ এর সদস্যরা প্রশিক্ষণের পূর্বে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতেন। শেখ ফজলুল হক মনি প্রথমদিকে থাকলেও পরে বিশালগড়ে চলে যান। থাকতেন আ শ ম রবসহ ঢাকা ও চট্টগ্রামের ছাত্র নেতারা। এই শ্রীধরভিলা ভাড়া নেয়া হয়েছিল ১৯৬৯ সালে। ভাড়া নেয়া হয় হিন্দুস্থান লিভারের ডিস্ট্রিটিবিউটারের রিপ্রেজিনটেটিভের নামে। ভাড়া নেন ব্যবসায়ী প্রবীর বনিকের মাধ্যমে। মাসিক ভাড়া ২৫০ টাকা মাত্র। শ্রীধর ভিলার নীচের তলায় কক্ষ ছিল ৫টি। উপর তলায় থাকতেন বীরেন্দ্র মজুমদার, তাঁর স্ত্রী আশা রানী মজুমদার এবং একমাত্র সন্তান শ্রী কিরীট বিক্রম মজমুদার। নীচের তলায় একটি কক্ষে থাকতেন শেখ মনি একা। আরেকটি কক্ষে স্বপন চৌধুরীর পরিবার। বাকী ৩টি কক্ষ গণবিছানা হিসেবে ব্যবহার হতো। শ্রীধর ভিলার পিছনে পুকুরে সকলে গোসল করতেন। পুকুরটি এখনও আছে। শ্রীধর ভিলার নামকরণ হয়েছে বীরেন্দ্র কুমার মজুমদারের দাদু শ্রীধর মজুমদারের নাম অনুসারে। বীরেন্দ্র মজুমদারের বাবা মাগন মজমদার ১৯৪৯ সালে দেশ ভাগের পর বরিশাল থেকে অভিবাসী হন। সম্পত্তি বিভাজনের সময় বীরেন্দ্র মজুমদার শ্রীধর ভিলার অংশ অন্য ভাইদের দিয়ে জিরানিয়া চলে যান।

শ্রীধর ভিলায় যে কক্ষে শেখ মনি থাকতেন সিরাজুল আলম খান মাঝে মাঝে আসতেন। বিএলএফ সদস্যদের রাজনৈতিক ক্লাস নিতেন। মুজিববাদের নামে একটি রাজনৈতিক মতবাদ চালুর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। চট্টগ্রাম রেল থেকে অবসরপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ (শেখ মনির ব্যাক্তিগত সহকারী হিসেবে যুদ্ধকালীন সময় কর্মরত ছিলেন) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে সীতাকু-ের কাজী সিরাজ ও চকবাজারের ওসমান গনি খান প্রথম দিকে শ্রীধর ভিলায় অবস্থান করেছিলেন। ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্র লীগের তৎকালীন সভাপতি আইউব বাঙালি। ডাকসুর ভিপি আ শ ম রবও থাকতেন। সাবেক মন্ত্রী বিএলএফ এর চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত এম এ মান্নানও প্রথম দিকে ছিলেন। শেখ মনির স্ত্রী প্রথম দিকে থাকলেও পরে কলকাতা চলে যান। এই শ্রীধর ভিলা থেকে ছাত্র লীগের নেতা ও কর্মীদের হাফলং এবং টান্ডুয়া পাঠানো হতো।

শ্রীধর ভিলা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ছাত্রলীগ এবং যুবনেতাদের একটি গুরত্বপূর্র্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার একবছর পূর্বে এই ঘরটি ভাড়া নেয়া প্রমাণ করে, স্বাধীনতাযুদ্ধের জন্য বিএলএফ এর একটি আগাম পরিকল্পনা ছিল। বাংলাদেশ সীমান্তের এতো কাছে একটি প্রাইভেট বাসা ভাড়া দেয়া নিঃসন্দেহে দুঃসাহসিক কাজ। বাংলাদেশের প্রতি এবং বাঙালির প্রতি মমত্ববোধ না থাকলেও কোনদিন তা সম্ভব হতো না। পাড়া-পড়শির আপত্তি সত্ত্বেও তাঁরা ঝুঁকি নিয়েছিলেন। সীমান্তের নিকটবর্তী হওয়ায় মোটর শেল এবং বিমান থেকে বোমা ফেলার সহজ লক্ষ্যবস্তু ছিল। পরবর্তীকালে তাঁরা ভাড়াও নেননি। তাঁদের এই ঝুঁকি ও আত্মত্যাগের কোন মূল্যায়ন করেছি আমরা ?

আমার পরবর্তী লক্ষ্য ছিল, আগরতলায় গ্লাস ফ্যক্টরী খুঁজে বের করে, তার অবস্থান জেনে, বর্তমানে কি অবস্থায় সরেজমিনে দেখে যাওয়া। শ্রীধর ভিলা যেভাবে সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীদের অবাধ যাতায়াত ছিল, গ্লাস ফ্যাক্টরী ছিল সংরক্ষিত এলাকা। শুধুমাত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিএলএফ সদস্যরাই থাকতে পারতেন। সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। আগরতলাা শহর এখনকার মতো জনবহুল ছিলনা। নিমতলি নামেই চিনতাম। তবু শ্রী বিক্রমের সহযোগিতায় অনেক কষ্টে খুঁজে পেলাম। ২/৩ জায়গায় ঢুঁ মেরে, অনেকজনকে জিজ্ঞেস করে, অনেকদূর হেঁটে, গ্লাস ফ্যাকটরীতে পৌঁছলাম। নামে পরিচিত হলেও গ্লাস ফ্যক্টরীর কোন অস্তি¡ত্ব নেই।

কারণ ৪৭ বছর পূর্বে একটি ট্রানজিট ক্যাম্প ছিল, যেখানে তাঁবু টাঙিয়ে অস্থায়ী ভাবে থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। এখনও খালি পড়ে আছে। ঘাস পরিপূর্ণ পুরাতন দুটি বিল্ডিং। কেউ থাকে না। সেদিন ছিল ঐ অঞ্চলের (বাধার ঘাট) বিধান সভার উপনির্বাচন। তাই সাবধানে আমাদেরকে খঁুঁজে বের করতে হয়েছে। ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রাধান্য। চলবে

নাওজিশ মাহমুদ রাজনীতি বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

The Post Viewed By: 53 People

সম্পর্কিত পোস্ট