চট্টগ্রাম সোমবার, ০৮ মার্চ, ২০২১

সর্বশেষ:

১২ অক্টোবর, ২০১৯ | ১:০৬ পূর্বাহ্ণ

মো. দিদারুল আলম

লোকপ্রশাসনকে কলেজে বিষয় হিসেবে চালু করা সময়ের দাবি

লোকপ্রশাসন মূলত একটি সমবেত কর্মপ্রচেষ্টা। এই কর্মপ্রচেষ্টা মানবজাতি সৃষ্টির শুরু থেকেই চলে আসছে। পুঁথিগত বিদ্যা হিসেবে লোকপ্রশাসন তুলনামূলকভাবে অন্যান্য বিদ্যার চেয়ে নবীন। বস্তুত লোকপ্রশাসন শব্দটি অষ্টাদশ শতাব্দীর আগে সুসংবদ্ধভাবে আলোচিত হয়নি। তবে প্রাচীন মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারতে, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে, চীনের বিশিষ্ট দার্শনিক কনফুসিয়াসের শিক্ষায় কিংবা মদিনা সনদে প্রশাসনিক চিন্তাার ইঙ্গিত দেখতে পাই। অধ্যয়নের বিষয়বস্তু হিসেবে ১৭২৭ সালে পাঠ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ১৮০৮ সালে প্যারিসে প্রথম চার্লস জীন বুনাই ‘লোকপ্রশাসনের নীতিসমূহ’ নামে একটি বই লেখেন। ১৮৩০ সালে ফ্রান্স কর্তৃক প্রভাবান্বিত হয়ে স্পেনে লোকপ্রশাসন সম্পর্কে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়।

১৮৮৭ সালে উড্রো উইলসনের ‘রাষ্ট্রবিজ্ঞান’ ত্রৈমাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ ‘ঞযব ঝঃঁফু ড়ভ অফসরহরংঃৎধঃরড়হ’ এর মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্রে লোকপ্রশাসন একটি স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের ভিত্তি পায়। ১৯২৬ সালে এল, ডি, হোয়াইট রচিত ‘ওহঃৎড়ফঁপঃরড়হ ঃড় ঃযব ঝঃঁফু ড়ভ চঁনষরপ অফসরহরংঃৎধঃরড়হ’ নামে প্রথম লোক প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ বই প্রকাশিত হয়। স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রথম ১৯৭২ সালে লোকপ্রশাসনের যাত্রা শুরু হয়। তবে সরকারি কর্মকর্তা প্রশিক্ষণকেন্দ্রসমূহে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য লোকপ্রশাসনের চর্চা ১৯৬১ সাল থেকে চলে আসছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যথাক্রমে ১৯৮০ ও ১৯৯০ সালে লোকপ্রশাসন বিভাগ চালু হয়। পরবর্তীতে আরো অন্যান্য বিশ^বিদ্যালয়েও স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে লোকপ্রশাসন বিভাগ চালু হয়। বর্তমানে বিষয় হিসেবে লোকপ্রশাসন বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। দেশটাই দাঁড়িয়ে আছে একটি সুবিন্যস্ত প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর। আর প্রশাসনের প্রধান কাজ হচ্ছে সরকারি নীতি বাস্তবায়ন করা ও নীতি নির্ধারকদের নীতি প্রণয়ন কাজে সহায়তা করা। কিন্তু আমাদের দেশে সেই নীতি বাস্তবায়নের কাজ করছে সব ধরনের বিষয় থেকে পাশ করা গ্র্যাজুয়েটরা। তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আপত্তি হচ্ছে স্কুল-কলেজ কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেখানে নীতি প্রনয়ণের বিষয় পড়ানো হয় অর্থাৎ পৌরনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, আইন সেখানে কেন নীতি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অনুশীলনের বিষয় লোকপ্রশাসন পড়ানো হয় না। এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে আমলাতন্ত্র কিংবা সরকারের নীতি নির্ধারকদের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগের লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। অথচ বর্তমান সময়ে একবিংশ শতাব্দীর জটিল চ্যালেঞ্জ্ মোকাবেলা, বিশ্বায়নের প্রভাব মোকাবেলা ও উন্নত তথ্যপ্রযুক্তির যুগে টিকে থাকতে হলে দেশে দক্ষ ও উপযুক্ত প্রশাসকের কোনো বিকল্প নেই। তাই সময় এসেছে শিক্ষার্থীদেরকে প্রাথমিক পর্যায় থেকে উচ্চ শিক্ণষা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে প্রশাসন সম্পর্কিত বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দিক সম্পর্কে অধ্যয়ন করানো।

বাংলাদেশ এখন মুক্তবাজার অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে, বিশ্বায়নকে গ্রহণ করেছে। ফলে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারিত হচ্ছে, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এদেশে ব্যবসা করছে, অনেক দাতা সংস্থা বাংলাদেশে তাদের অফিস স্থাপন করেছে। ফলে উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অনেক পদের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া বর্তমানে সরকারি ব্যাংক-বীমার পাশাপাশি অনেকগুলো বেসরকারি ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যার মধ্যে প্রায় সব ব্যাংকেই লোকপ্রশাসনের শিক্ষার্থীদের আবেদনের সুযোগ রয়েছে। উল্লেখ্য সব বেসরকারি ব্যাংক-বীমা কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে লোকপ্রশাসনকে সুযোগ দেয়া হচ্ছে না অথচ যেসব বিষয়গুলোকে আবেদনের সুযোগ দেয়া হচ্ছে সেই সব বিষয়ের চেয়ে লোকপ্রশাসনে বাণিজ্য, অর্থনীতি, ব্যবস্থাপনা, মানব সম্পদ উন্নয়ন, প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক বিষয়, ব্যাংকিং সম্পর্কিত কোর্স অনেক বেশি গুরুত্ব সহকারে পড়ানো হয়। লোকপ্রশাসন বিভাগের ছেলেমেয়েদের চাহিদা বর্তমানে অনেক। বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এ বিভাগের ছেলেমেয়েরা সবচেয়ে বেশি চাকরির সুযোগ পান। বিসিএসে যতগুলো ক্যাডার রয়েছে এর মধ্যে প্রশাসন, পুলিশ, সিভিল সার্ভিস ক্যাডারে চাকরি পান এ বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা। এ ছাড়া দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, প্রশাসন, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ইত্যাদি বিভাগে তাঁরা অগ্রাধিকার পেয়ে থাকেন। ব্যাংক, বিমা, বিভিন্ন এনজিওতে এ বিভাগের ছেলেমেয়েরা ভালো বেতনে কাজ করছেন। অনেকে আবার কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা পেশায় চাকরি করছেন। দেশের বাইরে যেমন যুক্তরাজ্য, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে এ বিভাগের ডিগ্রিধারীরা এখন ভালো বেতনে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন।

বাংলাদেশের সকল বিশ^বিদ্যালয়ে এটি এখন অন্যতম অধ্যয়নের বিষয় হলেও উচ্চমাধ্যমিক বা নিন্মস্তরে গুরুত্বের সাথে পাঠ্য তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে না। আর বর্তমান সরকার এ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে সরাসরি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বা মিনিস্ট্রি অব পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন রেখেছে। এখন মন্ত্রণালয়ের নামটিও বেশ মানানসই এবং জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তনে গত ০৮ এপ্রিল ২০১৯ এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে “বাংলাদেশ লোক প্রশাসন অধ্যয়ন কেন্দ্র” নামের একটি গবেষণাকেন্দ্রের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। ২৫ সদস্য বিশিষ্ট এই সংগঠন ইতিমধ্যে বেশকিছু প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে লোকপ্রশাসনকে কলেজে বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে। নানা কারেণে বর্তমানে লোকপ্রশাসন সম্পর্কে জানা অতীব জরুরি। কারণ রাষ্ট্রই দাঁড়িয়ে আছে প্রশাসনের ওপর। তাই এ বিষয়ের ওপর পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই। প্রশাসন চালানোর জন্য সুনির্দিষ্ট জ্ঞান আহরণের জন্য এ বিষয়ে পড়াশোনা করতেই হবে। তাই আমাদের প্রস্তাবনা হচ্ছে, সবকিছু বিবেচনা করে সকল বিশ^বিদ্যালয় ও কলেজসমূহে লোকপ্রশাসনকে বিভাগ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। এটি সময়ের দাবি।

ি মো. দিদারুল আলম কলাম লেখক ও প্রাবন্ধিক

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 371 People

সম্পর্কিত পোস্ট