চট্টগ্রাম রবিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৯

সর্বশেষ:

৮ অক্টোবর, ২০১৯ | ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ

সম্পাদকীয়

শারদীয় দুর্গোৎসব

শুভশক্তির জয় হোক

আজ বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের সমাপনী দিন, শুভ বিজয়া দশমী। দেবী দুর্গার আবাহন হয়েছিল শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে। শুক্রবার ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনা হয়। আজ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে ঘটবে আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি। জগতের মঙ্গল কামনায় এবার দেবীর আগমন ঘটেছে ঘোড়ায় চড়ে। দেবী দুর্গা আজ বিজয়া দশমীতে বিদায়ও নেবেন ঘোড়ায় চড়ে। বাংলা জনপদে আনন্দময়ী দেবী দুর্গা আবার ফিরে আসবেন আগামী শরতে এমন প্রত্যাশা নিয়ে আজ মা’কে বিদায় জানাবেন ভক্তরা। শুভ বিজয়া উপলক্ষে আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ দেশের সব নাগরিককে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।

দুর্গা পৌরাণিক দেবতা। তিনি আদ্যাশক্তি, মহামায়া, শিবানী, ভবানী, দশভুজা, সিংহবাহনাসহ অনেক নামে অভিহিত হন। জীবের দুর্গতি নাশ করেন বলে তাঁকে দুর্গা বলা হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দেবী দুর্গা মাতৃরূপে, পিতৃরূপে, শক্তিরূপে, শান্তিরূপে ও বিদ্যারূপে আবির্ভূতা এক মহাশক্তি। তাঁর এক রূপ অসুরবিনাশী, আরেক রূপ মমতাময়ী মাতার। তিনি অশুভর প্রতীক অসুরদের দলপতি মহিষাসুরকে বধ করে দেবকুলকে রক্ষা করেছিলেন বলেই তাঁকে সম্মিলিত দেবশক্তির প্রতীক মনে করা হয়। তিনি অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীকও। তিনি অপশক্তি বিনাশে দেবতাদের সম্মিলিত শক্তিতে সৃষ্টি করেন মহাশক্তি মহামায়া। সেই মহাশক্তিকেই ভক্তরা প্রতিমার মধ্য দিয়ে চিন্ময়ী ব্রহ্মশক্তিকে দর্শন করেন। ‘চিকের’ আড়ালে থাকা মহাশক্তি দেবী দুর্গা ভক্তদের দুর্গতি নাশ করেন; জগত থেকে সব অমঙ্গল, অকল্যাণ দূরীভূত করেন। অশুভের বিনাশ ও শুভশক্তির বিজয় ঘটান। মাতৃরূপিনী মহাশক্তি দুর্গা অশুভ শক্তির কবল থেকে বিশ্ব ব্রহ্মা- ও ভক্তকুলকে রক্ষা করেন। তিনি কেবল সৌন্দর্য-মমতা-সৃজনের আধারই নন, অসহায় ও নিপীড়িতের আশ্রয়ও। এই ধরিত্রীর জন্য তিনি বয়ে আনেন মঙ্গলবার্তা। তাই বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে দেবী দুর্গার স্থান পরম ভক্তিময়।

সমাজে অন্যায়, অবিচার, অশুভ ও অসুর শক্তি দমনের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আবহমানকাল ধরে এ দেশের হিন্দু সম্প্রদায় বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর পরিবেশে নানা অনুষ্ঠানাদির মাধ্যমে দুর্গাপূজা উদযাপন করে আসছে। ইতিহাস বলছে, দুর্গোৎসব আদিতে ছিল কেবল বনেদি জমিদার বাড়ির উৎসব। অর্থনৈতিক কারণে এক সময় দুর্গাপূজা ব্যক্তি বা পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ব্রিটিশ আমলে প্রতি গ্রামের দু-তিন ঘর সম্পন্ন পরিবার এই পূজা করত। আর সম্পন্ন পরিবারগুলোর আয়োজনে অনুষ্ঠিত দুর্গাপূজা থেকে আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষজনও আনন্দ পেয়েছে। তবে সেটা প্রসাদ পাওয়া, বাদ্য-বাজনা শোনা এবং দূর থেকে দেখার আনন্দ। সাধারণ অসচ্ছল হিন্দু ও মুসলিমরা এর মূল আয়োজন থেকে দূরে থেকেছে। কিন্তু এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুর্গাপূজার আয়োজন হচ্ছে সম্মিলিতভাবে। এতে ধনী-গরীব সবাই অংশ নিচ্ছে; প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার মুসলিমরাও দুর্গোৎসবে চাঁদা ও অন্যান্য সহযোগিতা দিয়ে অংশ নিচ্ছে। ফলে দুর্গাপূজা এখন বাঙালির সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। সময়ের আবর্তনে দুর্গোৎসবের ধরনেও এসেছে নতুনত্ব। এখন শাস্ত্রীয় পর্বটুকু বাদে পুরো দিনের আয়োজন হয়ে ওঠে সর্বধর্মের মানুষের। ধর্মের শাঁসটুকু রেখেই একে নিয়ে আসা হয়েছে ধর্মের ঊর্ধ্বে। যার কারণে ‘পূজা’র চেয়ে এখন ‘উৎসব’টাই প্রাধান্য পাচ্ছে। কিছুটা ধর্মীয় আবরণ থাকলেও এখন দুর্গোৎসব হয়ে উঠেছে বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম বৃহৎ সামাজিক উৎসব। ফলে দিন দিন সব জাত-পাতের হিন্দু ও মুসলিমের সম্মিলিত অংশগ্রহণ বাড়ছে দুর্গোৎসবে। এতে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ়তর হওয়ার পথ মসৃণ হচ্ছে। যা এ অঞ্চলের শান্তি ও সৌহার্দ্য রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

প্রতিবারের ন্যায় এবারও উৎসাহ-উদ্দীপনা ও সম্প্রীতির পরিবেশে দুর্গোৎসব উদ্যাপিত হচ্ছে বাংলাদেশে। দুর্গোৎসব যাতে নির্বিঘেœ হয় সে জন্যে নিñিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে সরকার। ধর্মবিশ্বাস নির্বিশেষে সব মানুষও সহায়তা করছে। গণমাধ্যমের খবর বলছে, সারাদেশে কোনো বাধা-প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই দুর্গোৎসব চলছে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের পূজাম-পগুলোয় যথারীতি বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের নারী-শিশুসহ সব বয়সের দর্শনার্থীর ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। শান্তি-সম্প্রীতি ও যথাযথ উৎসবমুখর পরিবেশেই দুর্গোৎসবের পরিসমাপ্তি ঘটছে। এটি খুবই আনন্দের খবর। এটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশেরই প্রতিচ্ছবি। শান্তি-সম্প্রীতির এমন চিত্রই প্রত্যাশিত। আশা করি আগামিতেও এমন সৌহার্দ্যচিত্র বজায় থাকবে।

বিজয়া দশমীতে আমাদের কামনা, শারদীয় দুর্গোৎসব সত্য-সুন্দরের আলোতে ভাস্বর হয়ে উঠুক, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে বন্ধনকে আরো সুসংহত করুক। দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে অশুভকে বিনাশের মাধ্যমে মানবমনে সঞ্চারিত হোক শুভ চেতনা। মানবহৃদয়ে শরতের শুভ্র কাশফুলের মতো প্রস্ফুটিত হোক পুণ্যের শ্বেতশুভ্র পুষ্পরাশি। বিজয় হোক সত্য, ন্যায় ও শুভশক্তির। সব ধর্মের মানুষের সৌহার্দ্য-সম্প্রীতিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে টেকসই উন্নয়ন ও সুখ-সমৃদ্ধির পথ এগিয়ে যাক প্রিয় বাংলাদেশ।

The Post Viewed By: 86 People

সম্পর্কিত পোস্ট