চট্টগ্রাম সোমবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ১২:৫৭ এএম

মনিরুল ইসলাম রফিক

কারবালা হত্যাকা-ে জড়িতদের শাস্তি

ইসলামের আলোকধারা

কারবালা ছিল এক অসম যুদ্ধ। বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধের আয়োজন ও হতাহতের যে পরিসংখ্যান থাকে, কারবালা যুদ্ধ সে তুলনায় অতি নগণ্য। যেমনি ক্ষণস্থায়ী তেমনি হতাহতের সংখ্যাও কম, তদুপরি আয়োজনও ছিল মাথাভারী। একপক্ষে সশস্ত্র যোদ্ধা ৬হাজারের মত, অপরপক্ষে নিরস্ত্র মানুষ শ’খানেকেরও কম। এরপরও এ’টি ইতিহাস প্রবলভাবে আঁকড়ে রেখেছে যুগ যুগ ধরে। এর কারণ একদিকে ইতিহাসের জঘন্যতম নৃশংসতা ও যুদ্ধনীতি লংঘনের দৃষ্টান্ত, অপরদিকে দ্বীনে হকের প্রতি অবিচল নবী পরিবারের সদস্যদের শাহাদাত গ্রহণের পুত তামান্না।

তাই কারবালা নিছক যুদ্ধ ও সংঘাত নয়। নবী ইব্রাহীম (আ.) যেমন পুত্র কুরবানী দানের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে খোদা – প্রেমের নজীরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তেমনি নবীজীর (স.) দৌহিত্র, মহাবীর আলীর পুত্র ফাতিমার কলিজার টুকরো ইমাম হুসাইন (রাদি.) নিজেকে এবং ভক্ত-অনুরক্তদের কারবালায় কুরবানী দিয়ে অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত তুলে ধরার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেনঃ অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার, কোন ভয়-ভীতি কিম্বা লোভ-লালসার মুখেও সত্য, আদর্শ থেকে পিছ-পা না হওয়ার।

আমরা প্রায় সময় শাহাদাতে কারবালা উপলক্ষে হযরত ইমাম হুসাইনের শান মান ও আহলে বাইতের পবিত্রতা ও বীরত্ব সম্পর্কে অবগত হই। কিন্তু এর পেছনে যারা ছিল নিষ্ঠুর পরিকল্পনাকারী কারবালার হন্তা, তাদের যেসব শাস্তি দুনিয়ায় হয়েছে সে সম্পর্কে খুব কমই আলোচনা ও কলাম প্রকাশিত হয়। অবশ্যই ইমাম হুসাইন ও তার পরিবারবর্গের (রাদি.) সাথে নিষ্ঠুর আচরণকারীরা আখিরাতে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে। সিহাহ সিত্তাহ হাদীস সমূহে এ বিষয়ে আলোচনা এসেছে। ইতিহাস বলছে, দুনিয়াতেও এসব হন্তাদের কেউ আল্লাহর গযব থেকে রক্ষা পায়নি। নবীপরিবার ও সাহাবায়ে কেরামের আশিক শ্রেণির হাতে শাস্তিও ভোগ করেছে তারা। এ সম্পর্কেও সিহাহ সিত্তাহ বা ছয় বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থসহ বিভিন্ন হাদীস ও ইতিহাস গ্রন্থে আলোচনা এসেছে। বিখ্যাত লেখক গবেষক ও গ্রন্থাকার মুফতী মোহম্মদ শফী এ বিষয়ে শহীদে কারবালা শীর্ষক এক বিস্তারিত পুস্তক রচনা করেছেন। আমি নি¤েœ এসব উৎসমূল থেকে কিছু উদ্ধৃতি তুলে ধরব ইনশাআললাহ।
শহীদানে কারবালার আত্মত্যাগকে ইসলামের জন্য নতুন করে ঈমানের বীজ বপনের সাথে তুল্য। কারণ, যারা সেদিন নবীপরিবারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল তারাও ছিল কথিত মুসলমান এবং রাজশক্তি। ইমাম হোসাইন (রাদি.), আহলে বাইত ও বিশিষ্ট সাহাবারা (রাদি.) সেদিন আত্মত্যাগ না করলে এজিদী মুসলমানদের চিহ্নিত করা কষ্টকর হয়ে যেত। কারবালার ঘটনায় রাজশক্তির মাধ্যমে পরিচিত হয়ে ওঠা ধর্মের নামে সমস্ত কুফরি ও কুসংস্কার বিদূরিত করে আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদের (স.) আনীত প্রকৃত দ্বীন ইসলামেরই বিজয় ঘোষিত হয়েছে এবং পরবর্তীতে আজও আমরা সে সিলসিলায় নিখাদ ও নিখুঁত আকীদার মাধ্যমে আমাদের ধর্ম-কর্ম আকড়ে আছি। এজন্য উর্দু কবি মোহম্মদ আলী জওহর সত্যিই বলেছেন: কাতলে হোসাইন দার আসলে মারগে এজিদ থা; ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালা কি বাদ।’

এবার আসি কারবালার নৃশংস হত্যাকান্ডে অংশগ্রহণকারীদের উপর পরবর্তীতে নানা গজব ও শাস্তির প্রসঙ্গ নিয়ে।
ঐতিহাসিকরা লিখেছেন, যে সময় হযরত হুসাইন (রা.) পিপাসায় কাতর হয়ে ফোরাত নদীর তীরে পৌঁছে পানি পান করার চেষ্টা করছিলেন তখন দুর্ভাগা হুসাইন ইবন সুমাইর (কোন কোন ঐতিহাসিক তার অন্য নাম উল্লেখ করেছেন) তীর নিক্ষেপ করে এবং সে তীর হযরত হুসাইন (রা.) এর বুকে বিদ্ধ হয়। তখন হযরত হুসাইন (রা) এর পবিত্র যবান থেকে আপনা আপনি এ বদদুআ বের হয়: হায় আললাহ! রাসূলুললাহর (স.) মেয়ের সন্তানদের সাথে যে ব্যবহার করা হচ্ছে আমি তার অভিযোগ শুধু আপনার দরবারে পেশ করছি। হে আল্লাহ্! তাদেরকে বেছে বেছে কতল কর। তাদেরকে খন্ড-বিখন্ড করে দাও এবং তাদের মধ্যে কাউকেই ছেড়ে দিওনা…।
প্রথমত: এমন একজন মজলুমের বদদুআ। এরপর তিনি রাসূলুললাহর (স.) দৌহিত্র। অতএব এ দোয়া কবুল হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহের কি অবকাশ ছিল? দোয়া কবুল হয় এবং আখেরাতের পূর্বেই দুনিয়াতে সে সমস্ত লোক এক একজন করে অপমানজনক অবস্থায় মারা যায়।
ইমাম যু’হরী (র) বলেন, যে সমস্ত লোক হযরত হুসাইনের (রা.) হত্যায় অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে একজনও রেহাই পাওয়ার মত এমন ছিলনা যে, সে আগেই দুনিয়াতে শাস্তি প্রাপ্ত না হয়েছে। কাউকে হত্যা করা হয়। আবার কারো কারো চেহারা কুৎসিত কালো হয়ে যায়, অথবা বিকৃত হয়ে যায়। কিংবা কিছু দিনের মধ্যে তার রাজত্ব কেড়ে নেওয়া হয়। আর এটা স্পষ্ট যে, এগুলো তাদের কৃতকর্মের আসল শাস্তি নয়, বরঞ্চ তার একটা নমুনা মাত্রা যা মানুষকে শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে দুনিয়াতেই দেখানো হয়েছিল।

হযরত হুসাইনের (রা) হত্যাকারীর দৃষ্টিশক্তি হরণ: ছা’বেত ইবন যাওজী বর্ণনা করেছেন যে, একজন বৃদ্ধ লোক হযরত হুসাইনের (রা.) হত্যায় অংশগ্রহণ করেছিল। সে হঠাৎ অন্ধ হয়ে যায়। তখন লোকেরা কারণ জিজ্ঞাসা করলে সে বলে যে, আমি স্বপ্নে রাসূলুললাহ (স.) কে দেখলাম যে, তিনি তার জামার হাতা গুটিয়ে আছেন। তার হাতে তলওয়ার রয়েছে এবং সামনে রয়েছে চামড়ার সেই বিছানা যার উপর রেখে কোন মানুষকে হত্যা করা হয়। তার উপর হুসাইনের (রা) হত্যাকারীদের দশজনের লাশ জবেহ করা অবস্থায় পড়ে আছে। এরপর তিনি আমাকে ডাকলেন এবং হুসাইনের (রা) রক্তে রঞ্জিত একটা কাঠি আমার চোখে লাগিয়ে দেন। সকালে যখন আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি তখন সত্যি সত্যি দেখি আমি অন্ধ, এরপর থেকে দুনিয়ার আর কোন বস্তু আমি দেখতে পাইনি। (আসআ’ফ)

উবাইদুল্লাহর নাকে সাপের উৎপাত: তিরমিযী শরীফে বর্ণিত আছে, উমারা ইবন উমাইর (র) বর্ণনা করেন, কারবালা হত্যাকান্ডের নেতৃত্ব দানকারী উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদ ও তার সঙ্গীদের ছিন্ন মস্তক এনে কূফার আর-রাহবা নামক স্থানের মসজিদে স্তূপিকৃত করা হলে আমি সেখানে গেলাম। তখন লোকেরা এসে গেছে, এসে গেছে বলে চিৎকার করতে লাগল। দেখা গেল একটি সাপ এসে ঐসব মাথাগুলোর ভিতর ঢুকে পড়ল। এমনকি সাপটি উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদের নাকের ছিদ্রে প্রবেশ করে কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করল, অত:পর বের হয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। লোকেরা পুনরায় চিৎকার করে বলতে লাগলো, এসে গেছে এসে গেছে। এভাবে সাপটি দু’বার অথবা তিনবার এসে তার নাকের ছিদ্রে ঢুকে কিছুক্ষণ অবস্থান করার পর বের হয়ে যায়। (হাদীস নং ৬/৩৭১৯)। (আগামী বিষ্যুদবার সমাপ্য)

লেখক : অধ্যাপক, কলামিস্ট, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতীব

The Post Viewed By: 144 People

সম্পর্কিত পোস্ট