চট্টগ্রাম বুধবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ১:০১ এএম

চট্টগ্রামে সুইমিংপুলের আনুষ্ঠানিক যাত্রা

সাঁতার শিক্ষা ও সাঁতারু তৈরিতে ভূমিকা রাখবে

শেষ পর্যন্ত উদ্বোধন হলো বহুপ্রতীক্ষীত চট্টগ্রাম বিভাগীয় সুইমিংপুল। দেশে যখন পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা জ্যামিতিক হারেই বাড়ছে, তখন সুইমিংপুলের উদ্বোধনের খবরটি নিশ্চয়ই আশা জাগানিয়া। এতে সহজ শর্তে নগরীর শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীসহ সবার জন্যে সাঁতার শিক্ষার সু-আয়োজন থাকলে পানিতে ডুবে মৃত্যুহার অনেকটাই কমে আসবে। একইসঙ্গে সহজ হবে চট্টগ্রাম থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের সাঁতারু তৈরির কাজটিও। সংগতকারণে আমরা এই মহৎ উদ্যোগটিকে স্বাগত জানাই।

নানা গবেষণা ও বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বলছে, সরকারের নানা পদক্ষেপের ফলে দেশে বিভিন্ন রোগে শিশুমৃত্যুর হার কমলেও বিপরীতে বাড়ছে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার। আর দেশে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ হচ্ছে সাঁতার বিষয়ে শিক্ষার অভাব। সাঁতার শেখার জন্যে দেশের নগর-মহানগরগুলোতে সরকারি পর্যায়ে তো নয়ই, বেসরকারি পর্যায়েও নেই তেমন কোনো উদ্যোগ-আয়োজন। পাঠ্যসূচিতেও সাঁতার শিক্ষা অবহেলিত। ফলে শিশুকিশোররা সাঁতার শিক্ষার মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে তাদের জীবন ঝুঁকিতে থেকে যাচ্ছে। সাঁতার না জানার কারণে পুকুর-ডোবা, নদী-খাল কিংবা সাগরের পানিতে পড়ে গেলে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, দেশে প্রতিবছর পানিতে ডুবে যেসব শিশু মারা যায় তাদের প্রায় ৯৯ ভাগই সাঁতার না জানা। দেশে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটছে অহরহ। যদি নগর-মহানগরীতে সাঁতার শিক্ষার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ-আয়োজন থাকতো, যথাসময়ে শিশুকিশোরদের সাঁতার শেখানো হতো, তাহলে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু দেখতে হতো না নিশ্চয়ই।

স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) পানিতে ডোবাসহ বিভিন্ন ধরনের জখমে মৃত্যু ও আহতদের নিয়ে পরিচালিত জাতীয় জরিপ মতে, দেশে প্রতিদিন ৫৩ জনের মৃত্যু হচ্ছে পানিতে ডুবে। এর মধ্যে ১ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুকিশোর ৪০ জন এবং বয়স্ক ১৩ জন। সেভিং লাইভস ফ্রম ড্রাউনিং প্রজেক্ট (সলিড) ইন বাংলাদেশ, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৫ হাজার শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়, যা মোট শিশুমৃত্যুর ৪৩ শতাংশ। আর প্রতিদিন গড়ে ৪০টি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। প্রসঙ্গত, দেশে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর বেশিরভাগ খবর গণমাধ্যমে আসে না। ফলে এ ধরনের দুর্ঘটনায় শিশুমৃত্যুর হার আরো বেশি হতে পারে। আর বাংলাদেশে এ মৃত্যু ঘটে প্রধানত পুকুর, ডোবা, নালা, লেক ও নদীতে। সাঁতার না জানার কারণটিই মূখ্যত পানিতে ডোবার ঝুঁকি বাড়ায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যু বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলেও তা প্রতিরোধে দেশব্যাপী কোন বলিষ্ঠ কর্মসূচি নেই।

এ অবস্থায় চট্টগ্রাম আউটার স্টেডিয়ামে নির্মিত সুইমিংপুলটি সাঁতার শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে মনে করি আমরা। তবে ফল পাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করবে কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতার ওপর। আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা হচ্ছে, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিভিন্ন স্থাপনার ঢাকঢোল পিটিয়ে উদ্বোধন করা হলেও বছর না যেতেই অনেক স্থাপনা ব্যবহার অনুপযোগী বা পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালি কিংবা স্বেচ্ছাচারিতার কারণে। নবনির্মিত চট্টগ্রাম বিভাগীয় সুইমিংপুলটি সে দশা হবে না- এমনটিই ভাবতে চাই আমরা। মনে রাখা দরকার, সুইমিংপুল নির্মাণ করলেই সবকিছু শেষ হয়ে যায় না। এর রক্ষণাবেক্ষণ করাটাই হচ্ছে আসল কাজ। প্রসঙ্গত, সারাদেশে নির্মিত ২১টির মতো সুইমিংপুলের মধ্যে কয়েকটি ছাড়া বাকিগুলোর অবস্থা খুব একটা ভাল নয়। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, কর্তৃপক্ষীয় খামখেয়ালি এবং দুর্নীতি। এমন চিত্র আমরা চট্টগ্রামে নির্মিত এই দৃষ্টিনন্দন সুইমিংপুলটির ক্ষেত্রে দেখতে চাই না। আমরা আশা করবো প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সুইমিংপুলের রক্ষণাবেক্ষণে সব পদক্ষেপই নেয়া হবে। সুইমিংপুলটির রূপকার সিটি মেয়র আ জ ম নাছিরউদ্দীন বলেছেন, নিজস্ব অর্থায়নে পুলের যত্ন নেয়া হবে। সতর্ক থাকবেন শতভাগ উদ্দেশ্য সাধানে। আমরা সিটি মেয়রের কথায় আস্থা রাখতে চাই। আমাদের বিশ্বাস, কর্তৃপক্ষ সদা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিলে দীর্ঘদিনের আকাক্সিক্ষত এই সুইমিংপুল চট্টগ্রাম মহানগরীর শিশুকিশোরদের সাঁতার শিক্ষার পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের সাঁতারু তৈরিতেও ভূমিকা রাখবে।

The Post Viewed By: 48 People

সম্পর্কিত পোস্ট