চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ১:২০ এএম

ড. মাহফুজ পারভেজ

আমাদের ঢাকা ও মুঘল স¤্রাট জাহাঙ্গীর

সমকাল দর্পণ

ঢাকাকে সর্বপ্রথম রাজধানীর মর্যাদা দিয়েছিলেন শাহজাদা সেলিম নামে সমধিক পরিচিতি চতুর্থ মুঘল স¤্রাট নূরউদ্দিন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর (১৫৬৯-১৬২৭), যিনি আনারকলির সঙ্গে বিয়োগান্ত প্রেমের জন্য এবং পরবর্তীকালে শিয়া বিধবা রমণী নূরজাহানের সঙ্গে গভীর প্রণয়ের কারণে বহুলভাবে আলোচিত হয়েছিলেন। জাহাঙ্গীর ছিলেন মুঘল সা¤্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের প্রপৌত্র, হুমায়ূনের পৌত্র, আকবরের পুত্র এবং শাহজাহানের পিতা ও আওরঙ্গজেবের পিতামহ।

যদিও মুঘল সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক মহামতি আকবর সর্বপ্রথম মুঘল শাসনাধীন সমগ্র ভারতবর্ষকে বিভিন্ন সুবাহ বা প্রদেশে বিভক্ত করেন, কিন্তু তিনি বাংলা প্রদেশের রাজধানী ঢাকায় আনেন নি। বাংলা প্রদেশ বলতে সে সময় বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা তথা ভারতের বিশাল পূর্বাঞ্চলকে চিহ্নিত করা হয়েছিল, যা শাসিত হতো বিহারের রাজমহলে অবস্থিত রাজধানী থেকে। উল্লেখ্য, প্রাচীন ও সমৃদ্ধ জনপদ ঢাকায় তারও আগে সোনারগাঁয়ে তুর্কি সুলতানি আমলের সমৃদ্ধ রাজধানী ছিল। কয়েক শত বছর পর ১৬১০ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীর এক রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে মুঘল শাসনাধীনে অখ- বৃহত্তর বাংলার রাজধানী করেন ঢাকাকে। রাজধানী ঢাকার প্রতিষ্ঠাতা মুঘলরাজ জাহাঙ্গীরের জন্মদিন ৩০ আগস্ট, ১৫৬৯ সাল।

স¤্রাট হয়ে জাহাঙ্গীর বাংলা ও রাজস্থানের পুরোটা মুঘল সা¤্রাজ্যের অধীনস্থ করেন। তিনি ১৬০৮ সালে তার আত্মীয় ও বিশিষ্ট বন্ধু ইসলাম খান চিশতিকে বাংলার সুবাহদার নিযুক্ত করেন। ইসলাম খান প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক কৌশলে দুই বছরের মধ্যে তুর্কি ও আফগান বিদ্রোহী এবং স্থানীয় শাসক বারো ভুঁইয়াদের দমন করে সমগ্র বাংলা মুঘল সা¤্রাজ্যের অধীনস্থ করেন এবং ১৬১০ সালে রাজমহল থেকে রাজধানী সরিয়ে ঢাকায় স্থাপন করেন। স¤্রাটের নামানুসারে ঢাকাস্থ বাংলার রাজধানীর নামকরণ করা হয় জাহাঙ্গীরনগর।
ঢাকার সুবেদার ইসলাম খান চিশতি দলুয়া বা মতান্তরে ধোলাই নদীর (বর্তমানের ধোলাই খাল ও বুড়িগঙ্গা নদীর সম্মিলিত এলাকায় নদীটির অবস্থানের কথা জানা যায়) তীরে একটি দুর্গ প্রতিষ্ঠা করেন, যার নামকরণ করা হয়, কেল্লা-ই-জাহাঙ্গীর। এই কেল্লাতেই পরবর্তীকালে ঔপনিবেশিক দখলদার ইংরেজরা বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ দৌলাহকে পলাশীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পরাজিত ও নিহত করে তার স্ত্রী, সন্তানদের বন্দি করে রাখে।
আকবরের রাজপুত পত্নী যোধাবাঈ-এর গর্ভে জাহাঙ্গীর জন্মগ্রহণ করেন ৩০ আগস্ট ১৫৬৯ সালে। তৎকালীন মুঘল সা¤্রাজ্যের রাজধানী আগ্রার ফতেহপুর সিক্রিতে তার জন্ম হয়। জাহাঙ্গীর বা শাহজাদা সেলিম ছিলেন স¤্রাট আকবরের সাধনার ধন। কারণ আকবরের প্রথম বয়সের সকল সন্তানই অকালে মারা যান। ফলে তিনি একটি পুত্র সন্তানের মাধ্যমে বংশ রক্ষার আশায় আল্লাহর কাছে প্রতিনিয়ত প্রার্থনা করতেন। আকবর সন্তান লাভের আশায় বিভিন্ন ফকির, দরবেশ, পীর, আউলিয়ার মাজারেও গমন করেন। রাজধানী আগ্রার সন্নিকটবর্তী আজমিরে অবস্থিত প্রসিদ্ধ বুজুর্গ হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি (রহ.)-এর মাজারেও আকবর বহুবার মানত করেন ও উপস্থিত হন।

এমন সময় আগ্রাস্থ মুঘল রাজধানী ফতেহপুর সিক্রিতে খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন বিখ্যাত সাধক শেখ সেলিম চিশতি (রহ.)। স¤্রাট আকবর প্রতি সপ্তাহে তার দরবারেও হাজির হতেন। অবশেষে পীর সাহের আশ্বাস দেন যে আকবরের ঔরসে তিনটি পুত্রসন্তান জন্ম নেবে। ১৫৬৯ সালের ৩০ আগস্ট আকবরের রাজপুত বংশীয় স্ত্রী যোধাবাঈ-এর গর্ভে শাহজাদা সেলিমের জন্ম হয়। পীর সাহেবের নামানুসারে আকবর সন্তানের নাম রাখেন সেলিম। মানত পূর্ণ হওয়ায় স¤্রাট আকবর পায়ে হেঁটে আজমিরে হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি (রহ.)-এর মাজারেও শ্রদ্ধা জানাতে যান।
জাহাঙ্গীর মারা যান ১৬২৭ সালের ২৮ অক্টোবর কাশ্মীরে। সে সময় তিনি স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য প্রথমে কাবুল ও পরে কাশ্মীর ভ্রমণ করছিলেন। কিন্তু অতিরিক্ত ঠান্ডায় তিনি কোথাও স্থির হতে পারছিলেন না। এমতাবস্থায় তিনি কাশ্মীরের একটি এলাকায় মারা গেলে তাকে বাঘসর দুর্গে দাফন করা হয়। পরে সমাজ্ঞী নূরজাহানের নির্দেশে সেখান থেকে তার দেহাবশেষ তুলে পাঞ্জাবের লাহোরে এনে শাহদারা বাগে পুনরায় সমাহিত করা হয়। তার সমাধিক্ষেত্রে স্থাপন করা হয় একটি দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয় সমাধিসৌধ।

স¤্রাট আকবর শেষ জীবনে তিনজন পুত্র সন্তানেরই পিতা হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যোগ্য উত্তরাধিকারী নির্বাচনের ক্ষেত্রে চিন্তিত ছিলেন। কারণ, তার প্রথম পুত্র সেলিম ছিলেন আয়েসী ও আমোদপ্রিয়। দ্বিতীয় পুত্র মুরাদ ছিলেন অত্যধিক পানাসক্ত। তৃতীয় পুত্র দানিয়েল কিছুটা যোগ্য হলেও অকালে তার মৃত্যু ঘটে। মুরাদও অমিতচারিতার কারণে অকাল প্রয়াত হন। ফলে শাহজাদা সেলিম ছাড়া স¤্রাট আকবরের উত্তরাধিকারী হওয়ার জন্য আর কোনও সন্তান ছিল না।
কিন্তু শাহজাদা সেলিম স¤্রাট আকবরের জীবদ্দশাতেই একাধিক বার বিদ্রোহ করেন এবং ক্ষমতা দখল করতে উদ্যত হন। কিন্তু প্রতিবারই তিনি আকবর কর্তৃক পরাজিত ও ক্ষমাপ্রাপ্ত হন। শাহজাদা সেলিম শিখ ও রাজপুতদের নিয়ে আকবরের বিরুদ্ধে বিরাট বিদ্রোহী সেনাদলও গঠন করেন। মুঘল সা¤্রাজ্যের ইতিহাসে ক্ষমতার জন্য রক্ত ও পরিবারের মধ্যে সংঘর্ষের যে ইতিহাস দেখতে পাওয়া যায়, তা আকবর ও পুত্র সেলিমের মধ্যেও লক্ষ্য করা গেছে। তবে ১৬০৫ সালের ২৫ অক্টোবর স¤্রাট আকবর মারা যাওয়ার আগে শাহজাদা সেলিমকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান।

শাহজাদা সেলিম স¤্রাট জাহাঙ্গীর নামে মুঘল ক্ষমতা পেয়ে আকবরের রাজ্য বিস্তার নীতি ও রাজনৈতিক কৌশল অব্যাহত রাখেন। তিনি উত্তর ভারতের মেবার, যোধপুর, উদয়পুর তথা পুরো রাজস্থান, গুজরাট দখল করেন এবং তার আমলেই বাংলায় মুঘল অধিকার নিশ্চিত হয়। তিনি আকবরের ধর্মীয় উদারতাবাদ অব্যাহত রাখেন। দরবারের শিয়া, সুন্নি সম্প্রদায়ের মুসলিমদের পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি তিনি হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের প্রতি উদারতা প্রদর্শন করেন। তার আমলে ইউরোপীয় শক্তি ক্রমে ক্রমে ভারতে এসে উপস্থিত হতে থাকে এবং তিনি খ্রিস্টান পাদ্রিদের পূর্ণ স্বাধীনতা ও রাজ-দরবারে স্থান দিয়েছিলেন।

লেখক : কবি ও শিক্ষাবিদ। অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

The Post Viewed By: 84 People

সম্পর্কিত পোস্ট