চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ১:০০ এএম

শুদ্ধানন্দ মহাথের

অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল রাজনীতিক আবদুল্লাহ আল হারুন

আবদুল্লাহ আল হারুন একজন অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে অত্যন্ত ¯েœহ করতেন। বঙ্গবন্ধু যখনই চট্টগ্রামে আসতেন, আবদুল্লাহ আল হারুনকে কাছে ডেকে নিতেন। বঙ্গবন্ধু পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে ছিলেন আবদুল্লাহ আল হারুন। তিনি মানুষের যে কোন বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। শিক্ষানুরাগী হিসেবেও তিনি অনেক ভূমিকা রেখেছেন। আবদুল্লাহ আল হারুনের সাথে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। কখনো ধর্মীয় গোঁড়ামী তাঁর মধ্যে দেখিনি। সৎ ও সজ্জন ছিলেন তিনি। যেকোন প্রয়োজনে আমি তাঁর কাছে ছুটে যেতাম। পরিবারের মেয়েদের সাথে পর্যন্ত আমি এবং সুখদানন্দ বিশেষ পরিচিত ছিলাম। আমরা দু’জন বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরোর শিষ্য। আমি যেমন তাঁর পরিবারের ছেলেমেয়েদের কাছে কাকা, জেঠা হিসেবে মান্য হতাম; তিনিও আমার পরিবারের ছেলেমেয়েদের কাছে একইভাবে মান্য হতেন।

ভাষা আন্দোলনের সময় আমি কলেজে পড়ি। আবদুল্লাহ আল হারুনও সে সময় রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। আমি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম। তখনকার সময়ে মেধাবী, সৎ, সম্ভ্রান্ত ও প্রগতিশীল পরিবারের ছেলেমেয়েরা ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে কোন না কোনভাবে জড়িত হয়ে পড়তেন। আমি তখন কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজের ছাত্র ছিলাম। সে সময় কানুনগোপাড়া কলেজ বলতে গেলে গ্রামের একমাত্র ভালো কলেজ। শহীদ অধ্যক্ষ শান্তিময় খাস্তগীর, জহরলালসহ অনেকের সাথে সম্পর্ক ছিল। স্যার নির্মল সেন ছিলেন আমাদের শিক্ষক। ভাষা আন্দোলন যখন তুঙ্গে, পাকিস্তান সরকার যখন দমনপীড়ন চালাচ্ছে, তখন আমার শিক্ষক মনীন্দ্র লাল বড়–য়া, যিনি আমার আত্মীয় হন, তাঁর পরামর্শে ছাত্র আন্দোলন থেকে পিছু চলে এলাম। কিন্তু আবদুল্লাহ আল হারুন সক্রিয় ছিলেন। তখন আবার ফেডারেশন ভাগ হয়ে গেল। ভারত পাকিস্তান ভাগ হয়ে যাওয়ার পর আমরা অনেকের অনেক রকম ভূমিকা দেখেছি। মুসলিম লীগারদের দেখেছি। কিন্তু হারুন সাহেব ছিলেন একজন প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক, ব্যক্তিত্বশীল মানুষ। তাঁর কাছে কখনো মানুষের ভেদাভেদ ছিল না। ১৯৭৩ সালের একটি ঘটনা, বেতবুনিয়া কেন্দ্র উদ্বোধন করতে আসবেন বঙ্গবন্ধু। এ উপলক্ষে রাউজান গহিরা কলেজ মাঠে বঙ্গবন্ধুর জনসভার আয়োজন করা হয়েছিল। এছাড়াও রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় বঙ্গবন্ধুর সভা ছিল। আবদুল্লাহ আল হারুন সেসময় একক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কয়েকদিন আগে থেকে প্রচার প্রচারণার যত আয়োজন তার সবকিছুতেই হারুন সাহেবের ভূমিকা ছিলো অনন্য। উন্নত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি।

আবদুল্লাহ আল হারুন যদি আমাদের পাশে না থাকতেন তাহলে কখনো আমার পক্ষে বঙ্গবন্ধুর কাছে যাওয়া সম্ভব হতো না। আমার গুরু বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরো, আনন্দ দত্তসহ কয়েকজন কয়েকবার বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করেছি। আমাদের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কল্যাণের জন্য, বৌদ্ধ লোকজনের নানা অসুবিধা দূর করার জন্য বঙ্গবন্ধুর কাছে বারবার ছুটে গিয়েছি। আমাদের সাথে থাকতেন আবদুল্লাহ আল হারুন।

যুদ্ধোত্তর দেশে আমরা দেশের শান্তি ও কল্যাণের জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে কাজ করতাম। সেকারণে নানা সহায়তার জন্য বঙ্গবন্ধুর কাছে যেতো হতো। চট্টগ্রামে কাতালগঞ্জের নবপ-িত বিহারের জন্য জায়গা নেয়ার সময় আবদুল্লাহ আল হারুন খুব সহযোগিতা করেছেন। তিনি না হলে এ বিহার করা সম্ভব হতো কিনা সন্দেহ ছিল। আবদুল্লাহ আল হারুন নিজে ব্যক্তিগতভাবে অর্থ সহায়তা দিয়েছেন। সেসময় পাশে একটা হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনা মন্দির ছিল। আমাদের বড় ভান্তে (বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরো)-তিনি বললেন, হিন্দুদের মন্দিরের জায়গা আমরা নেব না। তিনি বলেন, যুদ্ধের সময় আমরা হিন্দুদের কালীমন্দিরে, ঢাকেশ্বরীসহ কত জায়গায় আশ্রয় নিয়েছি। তাদের ধর্মীয় স্থানে কোনভাবে যাবো না।

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর আমরা চট্টগ্রামে এবং ঢাকায় সভাসমাবেশ করেছি। যতটুকু সম্ভব করার চেষ্টা করেছি। আবদুল্লাহ আল হারুন ছিলেন আমাদের পথপ্রদর্শক। তাঁর বুদ্ধি পরামর্শে আমরা সবসময় কাজ করেছি। আজকে রাজনীতিতে যেভাবে সন্ত্রাস, মারামারি চলে আসছে; পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা না থাকাতে এগুলি হচ্ছে। হারুন সাহেব কখনো এসব পছন্দ করতেন না। রাউজান রাঙ্গুনিয়া ছিল হারুন সাহেবের নিয়ন্ত্রিত এলাকা। এখানে দেশভাগের আগে কিংবা পরে সম্প্রদায়গত কোনো সমস্যা হতে দেখি নি। হারুন সাহেব খুব সতর্ক ছিলেন সেদিকে।
৪৪, ৪৬-এর আন্দোলনে সারাদেশকে উত্তাল হতে দেখেছি। তখন আমি সেভেন কি এইটে। আমরা তখন নেতা হিসেবে দেখতাম নেতাজী সুভাষ বসুকে। আমরা জওহরলাল নেহেরুকেও জানতাম না। আমরা তাকিয়ে থাকতাম নেতাজীর দিকে। তিনি কি বলছেন। হারুন সাহেবও এসময় রাজনীতির উত্থান পতনের প্রতি সজাগ ও সচেতন ছিলেন।
আবদুল্লাহ আল হারুন মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সারা চট্টগ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেছেন। তখন মুসলিম লীগ থাকলেও কেউ প্রকাশ্যে তা বলে নি। দেশ চলছে তখন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। একমাত্র ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন মুসলিম লীগের পক্ষে।

স্বাধীনতার পর আমাদের বড় ভান্তের নামে আমাদেরই একটা পক্ষ নানা অপপ্রচারে লিপ্ত ছিল। মুক্তিযুদ্ধে বড় ভান্তের ভূমিকাকে তারা প্রশ্নবিদ্ধ করে ‘দালাল’ হিসেবে চিহ্নিত করার একটা অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছিল। ৭১-এ বড় ভান্তে কিছু খ্রিস্টান ও অন্যান্যদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। চীনাপন্থীরা বিষয়টি বিকৃত করে বঙ্গবন্ধুর কাছে পৌঁছে দেয়। কিন্তু আবদুল্লাহ আল হারুন সাহেব বঙ্গবন্ধুকে বড় ভান্তে (বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরো) সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিয়ে ভুল ভেঙ্গে দেন। এগুলি নিয়ে তৎকালীন বাংলার বাণী পত্রিকাসহ বিভিন্ন পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সকলকে ডেকে বড় ভান্তের সাথে থেকে কাজ করার জন্য পরামর্শ দেন। তারপর থেকে বড় ভান্তে রেহাই পান। না হয় বৌদ্ধদের একটা অংশের লোকেরা বড় ভান্তেকে দালাল হিসেবে প্রচার করে তাঁর সর্বনাশ করতো। অথচ তিনি ছিলেন উদার মনের, সর্বধর্মের মানুষের প্রতি তাঁর অশেষ বিনম্র শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ছিল অন্তরে। প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক একজন ধর্মগুরুর সুনাম নষ্ট করতে তারা উঠে পড়ে লেগেছিল।
আবদুল্লাহ আল হারুন নিজে একটা রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত ছিলেন একারণে ছোট ভাই আবদুল্লাহ আল নোমানের রাজনৈতিক কাজে কখনো বাধা দেন নি। ভাই বলে নয় তিনি কাউকে কখনো আক্রোশের বশে কিছু করেন নি। তিনি নিজে ছিলেন স্বাধীনচেতা, তাই অন্যের স্বাধীনতায় কখনো হস্তক্ষেপ করেন নি।

তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি সমাজের যে কারো প্রয়োজনে আগে ছুটে যেতেন। বন্যায় মানুষ আশ্রয়হীন, তিনি সেখানে হাজির। ত্রাণ তৎপরতা চালিয়েছেন, কারো সাহায্যের দিকে তাকিয়ে থাকেন নি।

শিক্ষা বিস্তারে আবদুল্লাহ আল হারুনের অশেষ অবদান রয়েছে। তিনি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। আজকে চট্টগ্রামবাসী শিক্ষা বোর্ড পেয়েছে। চট্টগ্রামের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাঁর সাহায্য সহযোগিতায় বেড়ে উঠেছে। রাঙ্গুনিয়ায় যখন আমি একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েছিলাম আবদুল্লাহ আল হারুন আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর অশেষ অবদান রয়েছে এ কলেজ প্রতিষ্ঠায়। এছাড়া পটিয়ায়ও আমি বালিকা বিদ্যালয় করেছি। এভাবে আমি চার স্থানে চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করেছি, একমাত্র ব্যক্তি হারুন সাহেব যিনি আমার পাশে ছিলেন। অর্থবিত্তের সাহায্যের চেয়ে অনেক বেশি সাহায্য তিনি করেছেন। এভাবে যখন যিনি তাঁর সাহায্য চেয়েছেন কাউকে তিনি বিমুখ করেন নি, তাঁর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
আগেই বলেছি, আবদুল্লাহ আল হারুন সাহেব যেকোন বিপদের মুখে এগিয়ে গিয়েছেন। যে ডেকেছেন তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। ১৯৯৫ সালে আমাদের বড় ভান্তে যখন পরলোকগমন করেন, কেউ তাঁর সৎকারে এগিয়ে আসেন নি প্রথমে। আবদুল্লাহ আল হারুন ছুটে এসেছেন। তারপর একে একে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ অন্যরা এগিয়ে আসেন। সারাদেশ থেকে তাঁর ভক্তরা, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, সরকারী কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধিরা ছুটে এসেছেন। সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছি বড় ভান্তের শেষকৃত্যানুষ্ঠান। সেদিনের স্মৃতি কখনো ভোলার নয়।

লেখক : অধ্যক্ষ-কমলাপুর ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহার ও সভাপতি-বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ।

The Post Viewed By: 87 People

সম্পর্কিত পোস্ট