চট্টগ্রাম বুধবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ১:০০ এএম

ডা. হাসান শহীদুল আলম

উন্নত শিক্ষার স্বপ্ন পূরণে বাজেট কতটুকু সক্ষম?

চিকিৎসা শ্রমিকের দিনলিপি

‘শুভংকরের ফাঁকি’ কথাটি আমরা প্রায়ই শুনে থাকি এবং প্রয়োজনমতো ব্যবহারও করে থাকি। প্রচলিত অর্থে, হিসেব নিকেশের মারপ্যাঁচে আসল বিষয় রেখে কর্তৃপক্ষ সাধারণ জনগণকে অথবা সাধারণ জনগণ কর্তৃপক্ষকে ধোকা দিয়ে ফায়দা হাসিল করার কৌশলকে ‘শুভংকরের ফাঁকি’ বলা হয়ে থাকে। সম্প্রতি চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দে ‘শুভংকরের ফাঁকি’-এর বেশ কিছু উদাহরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। আজকের আলোচনায় বাজেটে শিক্ষাখাতের বরাদ্দে কর্তৃপক্ষ জনগণকে কিভাবে ফাঁকি দিচ্ছে সে ব্যাপারটা পাঠকদের কাছে পরিষ্কার হবে বলে আশা রাখি। এখানে চলতি বাজেট বলতে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট এবং বিগত বাজেট বলতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটকে বুঝানো হয়েছে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সংক্রান্ত কিছু তথ্য:
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা তিনস্তর বিশিষ্ট : ক) প্রাথমিক খ) মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক গ) উচ্চশিক্ষা বা বিশ^বিদ্যালয়। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ০২-১২-২০০৮ইং প্রচারিত সরকারী তথ্যমতে ১৬ কোটি ১৭ লাখ। বাংলাদেশে ১৮ থেকে ২২ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে বাস করে।
স্বাক্ষরতা : জাতিসংঘের বিধানের আলোকে স্বাক্ষর বলতে যারা লিখতে পড়তে ও সাধারণ অংক করতে পারে তাদেরকে বুঝায়। বাংলাদেশে সরকারী ভাষ্যমতে স্বাক্ষরতার হার ৭২.৭৬ শতাংশ। কিন্তু বেসরকারী সংস্থা গণস্বাক্ষরতা অভিযানের জরিপে বাংলাদেশের ৫৪ শতাংশ মানুষ স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন। ইউ আই এস (ইউনেসকো ইন্স্টিটিউট ফর স্ট্যাটিক্স) এর তথ্য মতে সার্বিক স্বাক্ষরতার হার ভারতে ৬৯.৩০ শতাংশ, নেপালে ৫৯.৬৩ শতাংশ, ভুটানে ৫৭.০৩ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ৫৬.৯৮শতাংশ। পৃথিবীময় ১৫বছর বা তদূর্ধ্ব সামগ্রিক জনসংখ্যার স্বাক্ষরতার হার হলো ৮৪.১ শতাংশ। অর্থাৎ বেসরকারী জরিপে দেখা যাচ্ছে সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের স্বাক্ষরতার হার পিছিয়ে রয়েছে। আর সরকারী ও বেসরকারী উভয় জরিপ মতে বাংলাদেশের স্বাক্ষরতার হার পৃথিবীর তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
শিক্ষা : পদ্ধতিগত জ্ঞানলাভের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জনই শিক্ষা। সরকার পরিচালিত ‘বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন’ কর্তৃক ২/১২/১৮ইং সরবরাহকৃত তথ্যমতে বাংলাদেশে শিক্ষার হার ৬৩.৬ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের শিক্ষার হার : আফগানিস্তান ৩৮.২শতাংশ, নেপাল ৬৪.৭শতাংশ, পাকিস্তান ৫৬.৪ শতাংশ, ভারত ৭২.১, ভুটান ৬৪.৯, মালদ্বীপ ৯৯, শ্রীলংকা ৯২.৬ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান বাদে অন্যান্য দেশসমূহ থেকে বাংলাদেশ শিক্ষিতের হারে পিছিয়ে রয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষায় ব্যয় : ইউনেসকো পরিচালিত একটি জরিপ মতে, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা বাবদ যে ব্যয় হয় বাংলাদেশে তার ৫১ শতাংশই বহন করতে হয় পরিবারকে। ৩৮ শতাংশ ব্যয় করে সরকার, বাকি ১১ শতাংশ ব্যয় করে দাতা সংস্থাগুলো।
প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান : প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানের সূচকে বাংলাদেশ ১০৯তম। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলো বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে : শ্রীলংকা ৩৮তম, ভারত ৪০তম, নেপাল ৯৪তম অবস্থানে রয়েছে। শিক্ষা শেষ হওয়ার আগেই ঝরে পড়া : তথ্যমতে, বাংলাদেশে শিক্ষা শেষ হওয়ার আগেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২১ শতাংশ, মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়া ৫০ শতাংশ ও কলেজে ভর্তি হওয়া ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে।

মাধ্যমিক শিক্ষা বঞ্চিত হওয়া : বিবিএস ও ইউনিসেফ-এর যৌথ জরিপে দেখা যায়, দরিদ্র পরিবারের মাত্র ২৪ শতাংশ শিশু মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়। এ হিসেবে দরিদ্র পরিবারের ৭৬ শতাংশ ছেলেমেয়েই মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।
নি¤œ মাধ্যমিক শিক্ষা বঞ্চিত হওয়া : ইউনেসকো এর রিপোর্ট অনুযায়ী দেশের দরিদ্র পরিবারগুলোর ছেলেমেয়েদের ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী আর্থিক অসচ্ছলতা আর দুর্যোগের শিকার হয়ে অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষা সম্পন্ন না করেই ঝরে পড়ছে।
উচ্চ শিক্ষার গুণগত মান : বিশ^ অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্য বলছে, উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থার মানের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নীচে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। আর বৈশি^ক পরিম-লে উচ্চ শিক্ষার মানের দিক দিয়ে ১৩৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। তালিকায় ভারতের বৈশি^ক অবস্থান ২৯তম। বাকী দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলংকা ৪১, পাকিস্তান ৭১, নেপালের অবস্থান ৭৭তম। বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়। যদিও নেপালে এই হার ১৬, শ্রীলংকায় ২১, ভারতে ২৪।
চলতি ২০১৯-২০ বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দের বিবরণ : চলতি মোট বাজেটের পরিমাণ ৫২৩১৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে শিক্ষাখাতে মোট বরাদ্দ ৬১১১৮ কোটি টাকা যাহা মে াট বাজেটের ১১.৬৮ শতাংশ এবং জিডিপি এর ২.৪ শতাংশ। এর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় বরাদ্দ ২৪০৪০ কোটি টাকা যাহা মোট বাজেটের ৪.৫৯শতাংশ। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় বরাদ্দ ২৯৬২৪ কোটি টাকা যাহা মোট বাজেটের ৫.৬৬ শতাংশ। কারিগরী ও মাদ্রাসা শিক্ষায় বরাদ্দ ৭৪৫৪ কোটি টাকা যাহা মোট বাজেটের ১.৪২ শতাংশ।

বিগত ২০১৮-১৯ বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দের বিবরণ : বিগত মোট বাজেটের পরিমাণ ছিলো ৪৬৪৫৭৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে শিক্ষাখাতে মোট বরাদ্দ ছিলো ৫৩০৫৪ কোটি টাকা যাহা ছিলো মোট বাজেটের ১১.৪১ শতাংশ এবং জিডিপি-এর ২.৩৫ শতাংশ। এর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় বরাদ্দ ছিলো ২২৪৬৬ কোটি টাকা যাহা মোট বাজেটের ছিলো ৪.৮৩ শতাংশ। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় বরাদ্দ ছিলো ২৫৮৬৬ কোটি টাকা যাহা ছিলো মোট বাজেটের ৫.৭৬ শতাংশ। কারিগরী ও মাদ্রাসা শিক্ষায় বরাদ্দ ছিলো ৫৭০০ কোটি টাকা যাহা ছিলো মোট বাজেটের ১.২২ শতাংশ।
চলতি ও বিগত বাজেটের শিক্ষাখাতে বরাদ্দের তুলনামূলক আলোচনা :
শিক্ষাখাতে মোট বরাদ্দ ০.২৭ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষাখাতে মোট বরাদ্দ ০.২৪ শতাংশ কমেছে। আবার মাধ্যমিক ও উ্চ্চ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ০.১০ শতাংশ বেড়েছে এবং কারিগরী ও মাদ্রাসা শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ০.২০ শতাংশ বেড়েছে। জিডিপি এর হিসেবে শিক্ষাখাতে মোট বরাদ্দ .০৫ শতাংশ বেড়েছে।

চলতি ২০১৯-২০ বাজেটে যেভাবে শুভংকরের ফাঁকি দেয়া হয়েছে :
ক) বাংলাদেশে বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বিশ^ব্যাংক নিরূপিত ১.০১ শতাংশ। যুক্তিসংগত কারণেই বাজেটের বরাদ্দের পরিমাণও একই শতাংশ হারে বৃদ্ধি করতে হবে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হিসেবে ধরলে চলতি মোট বাজেট ০.৭৪ শতংশ কম বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষাখাতে বরাদ্দের পরিমাণ চলতি বাজেটে ১.২৫ শতাংশ কমেছে। তেমনিভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ০.৯১শতাংশ কম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ক ারিগরী ও মাদ্রাসা শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ০.৮১ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ মাথাপিছু শিক্ষাখাতে বরাদ্দের পরিমাণ ০.২৪ থেকে ১.২৫ শতাংশ কমেছে।
খ) চলতি বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত মিলিয়ে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১৫.২ শতাংশ। খাতভিত্তিক বরাদ্দ হিসেবে এটি সর্বোচ্চ দেখানো হলেও শিক্ষা থেকে প্রযুক্তি আলাদা করা হলে শুধু শিক্ষায় এ বরাদ্দ দাঁড়ায় ১১.৬৮ শতাংশ যা হওয়া উচিৎ ২০ শতাংশ।
গ) বলা হয়েছে ২৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত কার্যক্রম বাস্তবায়ন বাবদ মোট ৮৭৬২০ কোটি টাকা যাহা বাজেটের ১৬.৭৫ শতাংশ ও জিডিপি এর ৩.০৪ শতাংশ বরাদ্দ করা হয়েছে। ২৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অভ্যন্তরীণ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে জন প্রশাসন বা নিজ নিজ বিভাগীয় বা মন্ত্রণালয়ের বাইরে শিক্ষার সংগে যুক্ত করে শিক্ষাখাতে বরাদ্দের পরিমাণ অনেক বাড়িয়ে দেখানোর একটি প্রহসন ও প্রতারণামূলক একটি প্রচেষ্টা বাজেট বক্তৃতায় লক্ষ্য করা গিয়েছে।
ইউনেসকো এর সুপারিশ অনুযায়ী শিক্ষাখাতে বরাদ্দ কিরূফ হওয়া উচিৎ :

শিক্ষাখাতে বরাদ্দ হবে জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ২০ শতাংশ এবং জিডিপি এর ৬শতাংশ।
মোট বাজেটে অর্থ বরাদ্দ বাড়ায় শিক্ষাখাতে অর্থ বরাদ্দ বাড়লে ও বরাদ্দের হার সেভাবে বাড়েনি :
তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে বিগত আটটি অর্থ বছরের মধ্যে এক বছর বাদে সবসময়ই শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জাতীয় বাজেটের ১০ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যেই ঘুরপাক খাচেছ। আবার যে পরিমাণ বরাদ্দ দেয়া হয় তার অধিকাংশই চলে যায় বেতনভাতা ও অবকাঠামো খাতে।
শিক্ষাখাতে বাংলাদেশ তার জিডিপি এর যে শতাংশ ব্যয় করছে তা দক্ষিণ এশীয় এবং আফ্রিকার অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় সর্বনি¤œ :
সরকারী সংস্থা ব্যানবেইস’-এর ২০১৬-১৭ সালের হিসেব অনুযায়ী ভারত ৩.০৮ শতাংশ, পাকিস্তান ২.৭৬ শাতংশ, আফগানিস্তান ৩.৯৩ শতাংশ, মালদ্বীপ ৪.২৫ শতাংশ. নেপাল ৫.১০ শতাংশ, শ্রীলংকা ২.৮১ শতাংশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ দিয়েছিলো। চলতি বাজেটে বাংলাদেশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ দিয়েছে জিডিপি এর ২.৪ শতাংশ এবং মোট বাজেটের ১১.৬৮ শতাংশ। আফ্রিকার অনগ্রসর অধিকাংশ দেশ যেমন – কেনিয়া, তানজানিয়া শিক্ষাখাতে বরাদ্দ দেয় জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশের বেশী।
উপসংহার :

এ পর্যন্ত যেটুকু আলোচনা হলো তার সারমর্ম হিসেবে উপসংহারে বলতে চাই যে, প্রতি বছর বাজেটের আকার বাড়লেও শিক্ষাখাতে যে বরাদ্দ থাকছে তা গত কয়েক বছর ধরে আনুপাতিক হারে কমেছে। উন্নত শিক্ষার যে স্বপ্ন আমরা দেখাচ্ছি এ বাজেট দিয়ে সেটা বাস্তবায়ন কিভাবে সম্ভব?

লেখক : চর্মরোগ ও ডায়াবেটিস-এ ¯œাতকোত্তর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক, চট্টগ্রাম

The Post Viewed By: 64 People

সম্পর্কিত পোস্ট