চট্টগ্রাম শনিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ১২:৪৬ পূর্বাহ্ন

অধ্যাপক ড. নারায়ণ বৈদ্য

নারী-পুরুষের গড় আয়ুর ব্যবধান : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

বাঙালি সমাজের পারিবারিক জীবনব্যবস্থার কতগুলো অলিখিত নিয়ম আছে। এ নিয়মগুলো মেনে চলার জন্য কেউ কাকে বলে না। তবুও সবার অজান্তে এ নিয়মগুলো সমাজে প্রতিফলিত হয়। কোন পরিবারে নিত্যনৈমিত্তিক কোন অনুষ্ঠানে যখন খাবার আয়োজন করা হয় তখন পরিবারের পুরুষসদস্যদের আগে খাওয়ার রেওয়াজ আছে। অর্থাৎ পরিবারের পুরুষসদস্যরা খাওয়ার পর নারীসদস্যরা খেতে বসে। ঘটনাচক্রে যেদিন নির্দিষ্টসংখ্যক অতিথিদের জন্য ও পরিবারের সদস্যদের জন্য রান্না করা হয় যদি কোন কারণে অতিথির সংখ্যা বেশি হয় তবে সবার পরে নারীসদস্যরা খাওয়ার কারণে তাদের জন্য তেমন খাবার থাকে না। এ সময় পরিবারের নারী সদস্যদের তুলনামূলক কম খাবার গ্রহণ করতে দেখা যায়। বাঙালি সমাজের প্রতিটি পরিবারে এরূপ অবস্থা পরিলক্ষিত হয়। এ কারণে বাঙালি সমাজে নারীদের পুষ্টি গ্রহণের পরিমাণ পুরুষদের তুলনায় কম। এর ফলস্বরূপ এদেশের নারীদের গড় আয়ুস্কাল পুরুষদের তুলনায় কম ছিল।

এখন বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে। নারী-পুরুষের পুষ্টি গ্রহণের এরূপ বৈষম্য অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। তবে হ্রাস শুধুমাত্র উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে দেখা যায়। বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলের অবস্থা এখনো অনেকাংশে অপরিবর্তীত বলে মনে হয়। অবশ্য বাংলাদেশে শিক্ষিতের হারও অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ দেশে বর্তমানে পুরুষদের শিক্ষার হার ৭৬.৭ শতাংশ এবং নারীদের মধ্যে ৭১.২ শতাংশ। অর্থাৎ নারী ও পুরুষদের মধ্যে শিক্ষার হারের ব্যবধান এখনো বিদ্যমান। তবে কোন কোন পেশা আছে যেখানে নারীদের তুলনায় পুরুষেরা পিছিয়ে। অন্ততঃ বর্তমান সময়ে চিকিৎসাশিক্ষা ক্ষেত্রে নারীদের অগ্রগামিতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। একটি মাত্র মেডিক্যাল কলেজে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে পুরুষদের তুলনায় নারীদের অগ্রগামিতা লক্ষ্য করা যাবে। বাংলাদেশের ছাত্র-ছাত্রীদের মেধাভিত্তিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ছাত্র-ছাত্রীদের (বিজ্ঞান বিভাগের) প্রথম পছন্দ বুয়েট (বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়)। গণিতের বাধ্যবাধকতার কারণে অধিকাংশ ছাত্রী বুয়েট-এ ভর্তি হতে চায় না। এ কারণে তাদের দ্বিতীয় পছন্দের শাখা হচ্ছে মেডিক্যাল বা চিকিৎসাশাস্ত্র। বিগত কয়েক বছরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের ভর্তিকৃত ছাত্র-ছাত্রীদের যদি তথ্য উপস্থাপন করা হয় তবে এর সত্যতা মিলবে। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস কোর্সের শুরু থেকে দীর্ঘ কয়েক যুগ ছাত্রসংখ্যা বেশি ছিল। শিক্ষাবর্ষগুলোতে প্রায় ৭০ শতাংশ ছাত্র এবং প্রায় ৩০ শতাংশ ছাত্রী ভর্তি হতো। অথচ ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের এমবিবিএস কোর্সে ২২০ জন ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে ১৩৯ জন ছাত্রী এবং ৮১ জন ছাত্র ভর্তি হয়েছে। চমেক সূত্রে আরো জানা যায়, এমবিবিএস কোর্সে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া ১৯৬ জনের মধ্যে ১১৫ জনই ছাত্রী। ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে ১৯৭ জনের মধ্যে ১০৪ জনই ছাত্রী। এর আগের শিক্ষাবর্ষে অর্থাৎ ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ছাত্র ছিল বেশি। এ শিক্ষাবর্ষে ভর্তিকৃত ১৯৭ জনের মধ্যে ১১৩ জন ছাত্র ছিল। এ ছাড়া ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে ১৯৭ জনের মধ্যে ১০২ জন ছাত্রী এবং ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে ১৯৬ জনের মধ্যে ১১৬ জন ছাত্রী ভর্তি হয়। শুধুমাত্র চিকিৎসাক্ষেত্রে যে এরূপ অবস্থা তা কিন্তু নয়। অন্যান্য বিশ^বিদ্যালয়গুলোতেও একই অবস্থা পরিলক্ষিত হয়। শিক্ষা, জীবনযাত্রা, খাদ্যগ্রহণ, চিকিৎসাসেবা গ্রহণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীসমাজের অধিক সচেতনতার কারণে নারীদের গড় আয়ুষ্কাল অধিক।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)- ‘রিপোর্ট অন বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০১৮’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ‘মনিটরিং দ্যা সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশ (এমএসভিএসবি) (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে। উক্ত প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০১৭ সালে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ছিল ৭২ বছর। ২০১৬ সালে ছিল ৭১ দশমিক ৬ বছর। ২০১৫ সালে আয়ুষ্কাল ছিল ৭০ দশমিক ৯ বছর। তাছাড়া প্রতিবেদনে আরো বলা হয় যে, এই উপমহাদেশের অন্যান্য দেশ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান ও আফগানিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশের প্রত্যাশিত আয়ুস্কাল বেশি। শুধু শ্রীলংকার আয়ুষ্কাল বাংলাদেশের চেয়ে বেশি অর্থাৎ ৭৫ বছর। এ গবেষণায় আরো দেখা যায় যে, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু এখন ৭২ দশমিক ৩ বছর বা ৭২ বছর তিন মাস ১৮ দিন। এর মধ্যে পুরুষের প্রত্যাশিত আয়ু ৭০ দশমিক ৮ বছর বা ৭০ বছর ৯ মাস ১৮ দিন। নারীদের আয়ু দাঁড়িয়েছে ৭৩ দশমিক ৮ বছর বা ৭৩ বছর ৯ মাস ১৮ দিন। তুলনামূলকভাবে পুরুষের চেয়ে নারীরা বাঁচে বেশিদিন। এছাড়া গত পাঁচ বছরে প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল গড়ে প্রতি বছর শূন্য দশমিক ৩২ বছর হারে বেড়েছে। অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে আয়ুষ্কাল বেড়েছে ১ দশমিক ৬ বছর।

বাংলাদেশের মানুষেরা এখন অনেক বেশি সুচিকিৎসা পাচ্ছে। একই সাথে পাচ্ছে সুশিক্ষাও। এ ছাড়া জীবনযাত্রার মান বেড়েছে। ফলে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। দেশ যে উন্নত হচ্ছে তার প্রতিফলন ঘটছে এই আয়ুষ্কাল বাড়ার মধ্যে। আগে পুরুষেরা বেশি বাঁচত। এখন দেখা যাচ্ছে নারীরা বেশিদিন বাঁচে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, নারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। নারীরা আগে পরিবারের সবার শেষে খেতে বসতো। ফলে তাঁরা অপুষ্টিতে ভুগতো। এখন সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। নারীরা অনেক সচেতন হয়েছে। এ ছাড়া মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হারও কমেছে। বাংলাদেশে মৃত্যুহার হ্রাস পাবার আরো একটি কারণ হলো শিক্ষার হার বৃদ্ধি। দেশে এখন ১৫ বছর ও তার উর্ধ্বে জনসংখ্যার মধ্যে ৭৩.৯ শতাংশ মানুষ শিক্ষিত।
পুরুষদের মধ্যে শিক্ষার হার ৭৬.৭ শতাংশ এবং নারীদের মধ্যে শিক্ষার হার ৭১.২ শতাংশ। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বর্তমানে বাংলাদেশে নারীদের তুলনায় পুরুষদের শিক্ষার হার বেশি। অথচ মৃত্যুহারের দিক থেকে নারীদের তুলনায় পুরুষদের মৃত্যু হার অধিক। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, অধিক শিক্ষার হারের সাথে মৃত্যুহারের কোন সম্পর্ক নেই। বরঞ্চ স্বাস্থ্য সচেতনতা ও অধিক পুষ্টি গ্রহণের সাথে মৃত্যুহারের সম্পর্ক রয়েছে।

২০১৮ সালে সাত বছর ও এর উর্ধ্বে জনসংখ্যার মধ্যে সাক্ষরতার হার গড় ৭৩.২ শতাংশ। ২০১৭ সালে এ অংশের সাক্ষরতার হার ছিল ৭২.৩ শতাংশ। তাছাড়া দেশের ৯০.১ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ ব্যবহার করে থাকে। ২০১৭ সালে এ হার ছিল ৮৫.৩ শতাংশ। ট্যাপ বা নলকূপের পানি ব্যবহার করে শতকরা ৯৮ শতাংশ পরিবার। স্যানিটারি পায়খানা ব্যবহার করে ৭৮.১ শতাংশ পরিবার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তত্ত্বে আরো দেখা যায়, এইচআইভি বা এইডস সম্পর্কে সচেতনতা পূর্বের তুলনায় বেড়েছে। ১৫-৪৯ বছর বয়সী ৩৪.৬ শতাংশ নারী এইচআইভি বা এইডস সংক্রামনের সব পদ্ধতি সম্পর্কে জানে। ২০১৪ সালে এ হার ছিল ২১ শতাংশ। এ ছাড়া ২০১৮ সালের গবেষণায় আরো দেখা গেছে, এইচআইভি বা এইডস সংক্রমণের যে কোন একটি পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা রাখে ৬৮.৯ শতাংশ নারী। অথচ ২০১৪ সালে এ হার ছিল ৬১.৫ শতাংশ। ইহার অর্থ হলো যে, শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত নারীদের মধ্যেও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির কারণে পুরুষদের তুলনায় নারীরা বাঁচে বেশিদিন।

লেখক : পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, বিজিসি ট্রাষ্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।

The Post Viewed By: 87 People

সম্পর্কিত পোস্ট