চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ১২:৪৮ এএম

ডা. হাসান শহীদুল আলম

অনুসরণীয় বরেণ্য মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী

বুকস্টলে মানুষ সাধারণত যায় বই কিনতে। আবার কেউ কেউ যায় উল্টেপাল্টে দেখতে বা সুযোগ পেলে পড়তে। আমি ছিলাম শেষোক্তদের দলে। বিশেষতঃ ছাত্রজীবনে। ১৯৭০ সালের ঘটনা। আমি কুমিল্লা জিলা স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র। শীতকালীন অবকাশে কাজীর দেউড়ী নানাবাড়ীতে বেড়াতে এসেছিলাম। কাজিন ভাইদের সাথে বিকেলে ঘুরতে ঘুরতে নিউমার্কেট-এর নিউজফ্রন্ট-এ ঢুকলাম। নজরে পড়লো পাজামা-পানজাবী পরিহিত উজ্জ্বল শ্যামলা রং-এর মাঝবয়সী ভদ্রলোকের স্মিত হাসিমাখা মুখ। মনে মনে অভয় পেলাম। আমার প্রিয় ম্যাগাজিন ছিলো ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ‘প্যানোরমা’। প্রতিদিন বিকেলে এসে পড়তাম।

উল্লিখিত ভদ্রলোকটি ছিলেন ‘নিউজফ্রন্ট’-এর স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী। তাঁর বড় ছেলে তসলিমউদ্দীন চৌধুরী অর্থাৎ আমাদের তসলিম ভাই, সে সময় ভালো স্প্যানিশ গীটার বাজাতেন। আমরা তাঁকে ঘিরে বসে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর গীটার বাজনা শুনতাম। মেঝ ছেলে জসিমউদ্দীন চৌধুরী চট্টগ্রাম কলেজে আমাদের সহপাঠি ছিলো।
যে সময়ের কথা বলছি, সে সময় বই-ম্যাগাজিন উল্টে পাল্টে পড়ার সুযোগ-পাবলিক লাইব্রেরি বাদে চট্টগ্রামে শুধুমাত্র নিউজফ্রন্টেই ছিলো। আমাদের মতো স্কুলপড়–য়া ছেলেমেয়েদের জানার ও দেখার এমনি বিনে পয়সার সুযোগ তৈরী করে দিয়েছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মহৎপ্রাণ কর্মোদ্যামী আলহাজ¦ মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী। মরহুমের কথা লিখতে গিয়ে আজ স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ছি।

তিনি ১৯২১ সনের ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম রাউজানের ঢেউয়া হাজীবাড়ীর এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। স্বল্পভাষী, ধীর, স্থির, অবিচল স্বভাবের ইউসুফ চৌধুরী প্রথম বয়সে কঠোর পরিশ্রম, সততা ও অকুতোভয় মনোবলকে সম্বল করে অতি সামান্য পুঁজির পুস্তকব্যবসার মাধ্যমে শুরু করেছিলেন উদ্যোক্তা হবার সাধনা। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পুস্তক বিপণীকেন্দ্র ‘নিউজফ্রন্ট’ যাকে তিনি সমৃদ্ধ করেছিলেন উপমহাদেশের বিখ্যাত ম্যাগাজিন ও সংবাদপত্রসমূহের এজেন্সি নেবার মাধ্যমে। ‘ডন’ ইংরেজি দৈনিক, ‘রিডার্স ডাইজেস্ট’ এমনি বিখ্যাত প্রকাশনাসমূহ ‘নিউজফ্রন্ট’-এর মাধ্যমেই চট্টগ্রামে আসতো। অতপর ‘সিগনেট প্রেস’ প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে চট্টগ্রামে তিনি আধুনিক মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পের নবযুগের যাত্রা শুরু করেছিলেন। ১৯৮৬ সনের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি ‘দৈনিক পূর্বকোণ’ প্রকাশ করেন। আধুনিক প্রযুক্তি ও এক ঝাঁক সৃষ্টিশীল মেধার সমন্বয় ঘটিয়ে তার সাথে সংবাদ বাছাই ও মুদ্রণে গ্রাম নগরী ও রাজধানীর পাশাপাশি অবস্থান তৈরী করে দিয়ে চট্টগ্রামের পত্রিকার মফস্বলীয়তা দূর করে সে জায়গায় জাতীয় সংবাদপত্রের রূপ দিয়েছিলেন এই পত্রিকাটিকে। সে সাথে মানুষের সংবাদ জানার ও পাঠের স্পৃহাকে মূল্য দিয়ে তিনি ভোর হতে না হতেই যাতে গ্রাম ও উপজেলায় পত্রিকা পৌঁছে যায় তার ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর হাত ধরেই এ অঞ্চলের অনেক ফটোগ্রাফার ও সাংবাদিকের হাতেখড়ি হয়েছিলো। প্রত্যন্ত অঞ্চলের সংবাদ সংগ্রহের জন্য গ্রামীণ সংবাদদাতার প্রচলন করিয়ে তিনি যেমন তৃণমূল সাংবাদিকতার বীজ বপন করে দিয়েছিলেন তেমনি গ্রামীণ শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন।

তিনি ডেইরী ও পোলট্রি ফার্ম এসোসিয়েশনের আমৃত্যু সভাপতি ছিলেন। চট্টগ্রামে প্রথম গবাদি পশুমেলার উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। ডেইরী শিল্পের বিকাশে প্রথম তাঁর নেতৃত্বে রুগ্ন গরু নিয়ে মিছিল হয়। তাঁর কর্মোদ্যোগের ফলে চট্টগ্রামে প্রায় চারশ খামার সুফল পায়। গবাদী পশু পালনে উদ্যোগীদের উদ্বুদ্ধ করে তাজা তরল দুধ উৎপাদনের মাধ্যমে শে^তবিপ্লব সফল করে এদেশে গুঁড়ো দুধ আমদানী হ্রাসকরণ এবং কর্মসংস্থানের পরিবেশও সুযোগ সৃষ্টি করে গিয়েছেন তিনি।
২০০১ সালের দিকে ইউসুফ চৌধুরী প্রথমবার চট্টগ্রামের হালদা নদী নিয়ে ‘দৈনিক পূর্বকোণ’-এ সিরিজ প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। ২০০২ সালে গড়দুয়ারার সোনাইচর বাঁকটি কেটে দেয়ার ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ক্ষেত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে চট্টলদরদী ইউসুফ চৌধুরী দৈনিক পূর্বকোণে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এটাই ছিলো হালদার পরিবেশ রক্ষার প্রথম প্রতিবাদ।

২০০২ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাঁরই সভাপতিত্বে ‘দৈনিক পূর্বকোণ’ এর অফিসকক্ষে ভেটেরিনারী বিশ^বিদ্যালয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রথম সভা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে ভেটেরিনারী ও এনিম্যাল সাইন্স বিশ^বিদ্যালয়ের ফলক উন্মোচন করে। এখানে স্বীকার করতেই হবে যে, এই বিশ^বিদ্যালয় আজ এ দেশের কৃষি ও পশুসম্পদকেই শুধু বিকশিত করছে না, এর মাধ্যমে কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন যোগ করে মানুষের দারিদ্রমুক্তির পথেও বিপ্লবের সূচনা করেছে। তিনি বিআইটি-কে বিশ^বিদ্যালয়ে রূপান্তরের ধারাবাহিক সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ‘ইউনাইটেড ক্যামিকেলস’ নামের স্বনামধন্য ওষুধ প্রতিষ্ঠানটি তাঁর আর একটি অবদান।

তিনি কোন রাজনীতি করতেন না। তবে চট্টগ্রামের স্বার্থ ভূলুণ্ঠিত হতে দেখেও যখন কারো মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়ার আভাষ দেখা যাচ্ছিলো না তখন তিনি নিজেই বৃদ্ধ বয়সে বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আগমনস্থল নিজ বাড়ীতে কবির স্মৃতিচিহ্ন রক্ষা, নজরুল মেলা এবং নজরুল পাঠাগার স্থাপন করেছিলেন।
কোন ধরনের রাজনীতির সাথে জড়িত না থেকেও একজন জনদরদী হিসেবে সারাজীবন যে সমস্ত কল্যাণব্রত তিনি সম্পন্ন করেছেন, তা একালের রাজনীতিবিদগণও করে যেতে পারেন নি। তাঁর মতো আরেকজন ‘চট্টলদরদী’র দেখা পেতে চট্টগ্রামবাসীকে অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে। এই মহৎপ্রাণ চট্টলদরদী ২০০৭ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ওমরাহ পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশের সময় রাত সাড়ে বারোটায় মহানবীর স্মৃতিধন্য পবিত্র মক্কানগরীর জিয়াদ হাসপাতালে ৮৬ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

লেখক : চর্মরোগ ও ডায়াবেটিস-এ ¯œাতকোত্তর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক, চট্টগ্রাম।

The Post Viewed By: 66 People

সম্পর্কিত পোস্ট