চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ

মাহমুদ আহমদ

‘সবার ওপরে মানুষ সত্য, তাহার ওপরে নাই’

মধ্যযুগের কবি চন্ডীদাশ তার এক কবিতায় যথার্থই লিখেছেন ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য, তাহার ওপরে নাই’। বিশ্ববিবেকের কাছে চন্ডীদাসের সেই অমর বাণীর আজ যেন কোনো মূল্যই নেই। সম্প্রতি গুজব ছড়িয়ে নিরীহ মানুষ হত্যা করে দেশে এক অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরী করা হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিজের সন্তানকে ভর্তি করাতে যাওয়া এক নারীকে ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। হায় মানবতা! আল্লাহপাকের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষকে কতই না নির্মমভাবে হত্যা করা হল। নিরীহ এই মায়ের নির্মম ও মর্মান্তিক মৃত্যুর সংবাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও হত্যা, ধর্ষণ, শিশুনির্যাতন, গণপিটুনীতে হত্যা ইত্যাদির খবর পাওয়া যায়। আমরা আজ এতটাই অবক্ষয়ে নিমজ্জিত যে, ভালমন্দ বিবেচনা করার বিবেকটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছি।

আল্লাহপাক আমাদের দু’টো হক আদায় করার আদেশ দিয়েছেন, একটি হল আল্লাহর হক আর অপরটি হল বান্দার হক। ইসলামের শিক্ষা হল, তুমি যা নিজের জন্য পছন্দ কর তা অন্যের জন্যও পছন্দ কর। পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক বলেন, ‘আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তার সাথে অন্য কিছুকে শরীক করো না, পিতা-মাতার সাথে সদয় ব্যবহার কর এবং নিকটাত্মীয়, এতিম, অভাবী, আত্মীয় প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, সঙ্গী-সহচর, পথচারী ও তোমাদের অধিকারভুক্তদের সাথেও (সদয় ব্যবহার কর)। নিশ্চয় অহংকারী ও দাম্ভিককে আল্লাহ পছন্দ করেন না’ (সূরা নেসা, আয়াত: ৩৬)। এই আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, শুধু নিজের ভাই, আত্মিয়-স্বজন, পরিচিতগণ এবং প্রতিবেশী ও অধিনস্তদের সাথে উত্তম ব্যবহার করো না, কেবল তাদের প্রতিই সহমর্মিতা প্রদর্শন করো না আর তাদের সাহায্যের প্রয়োজন হলে কেবল তাদেরই সাহায্য ও যথাসাধ্য উপকার সাধন করো না বরং যাদেরকে এবং যেসব প্রতিবেশীদের তোমরা চেন না, যাদের সাথে তোমাদের কোনো আত্মীয়তা বা উঠাবসার সম্পর্ক নেই, যাদের সাথে তোমাদের ক্ষণিকের পরিচয় হয়েছে মাত্র এদের ক্ষেত্রেও যদি তোমার সহমর্মিতা এবং তোমার সাহায্যের প্রয়োজন পরে, তোমার মাধ্যমে যদি তারা কিছুটা হলেও উপকৃত হতে পারে তবে তাদের সেই উপকার সাধন কর। ইসলামের শিক্ষা কতই না চমৎকার। এই শিক্ষার বাস্তবায়ন করলে নিসন্দেহে একটি সুন্দর ইসলামী সমাজ গড়ে উঠবে। আজ আমাদের মনমানসিকতা এমন হয়েছে যে, নিজেদের প্রতিবেশীর কথা তো দূরে নিজ রক্তের সম্পর্ককেও বজায় রাখতে চাই না। সবাই যেন নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। অন্যের কোনো উপকারের বা খোঁজ খবর নেয়ার চিন্তা একেবারেই নেই। আমার পাশের ঘরের পরিবারটি যে কষ্টে দিনাতিপাত করছে তার খেয়াল রাখছি না। আমরা যাই করি না কেন আল্লাহতায়ালা কিন্তু সবই দেখছেন, তিনি ঠিকই আমাদের কাছ থেকে এর হিসাব নেবেন।

একটি হাদিসে এভাবে বর্ণিত হয়েছে- হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন, ‘মহাপরাক্রমশালী আল্লাহতায়ালা কিয়ামতের দিন বলবেন, হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ ছিলাম তুমি আমার সেবা শুশ্রƒষা কর নি। বান্দা বলবে, হে আমার প্রভু, তুমি সারা বিশ্বের প্রতিপালক আমি তোমার সেবা শুশ্রƒষা কীভাবে করতে পারি? আল্লাহ্ তা’লা বলবেন, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ ছিল তুমি তা জানতে পেরেও তার সেবা শুশ্রƒষা কর নি। তুমি তার শুশ্রƒষা করলে তুমি আমাকে তার পাশে পেতে- এটি কি তুমি জানতে না? হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলাম তুমি দাও নি। এটি শুনে আদম সন্তান বলবে, হে আমার প্রভু! তুমি তো রাব্বুল আলামীন আমি কীভাবে তোমাকে খাওয়াতে পারি। আল্লাহতায়ালা বলবেন, তোমার কি মনে নেই আমার অমুক বান্দা খাবার চেয়েছিল, তুমি তাকে খাবার খাওয়াওনি। তুমি যদি খাবার খাওয়াতে তাহলে তুমি আমার কাছে এর প্রতিদান পেতে তুমি কি এটি জানতে না। হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে পানি চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে পানি পান করাও নি। আদম সন্তান বলবে, হে আমার প্রভু! তুমিই তো সারা বিশ্বের প্রতিপালক তোমাকে কীভাবে আমি পানি পান করাতে পারি। এতে আল্লাহতায়ালা বলবেন, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে পানি চেয়েছিল কিন্তু তুমি তাকে পানি পান করাও নি। তুমি তাকে পানি পান করালে এর প্রতিদান তুমি আমার কাছে পেতে’ (মুসলিম, কিতাবুল বিরের ওয়াস সিলা, বাব ফাজলে ইয়াদাতিল মারীয)।

আরেক বর্ণনায়, হজরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন, ‘সকল সৃষ্টিজীব আল্লাহর পরিবার। অতএব আল্লাহতায়ালার কাছে তার সৃষ্টজীবের মাঝে সে-ই প্রিয়ভাজন যে তার সৃষ্টজীবের সাথে দয়ার্দ্র আচরণ করে এবং তাদের প্রয়োজনের প্রতি যত্নবান থাকে’ (মিশকাত, বাবুশ শাফকাতু ওয়ার রাহমাহ্ আলাল খালক)।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহতায়ালা এই ঘোষণা দিয়েছেন যে, তিনি ‘সৎকর্মপরায়ণদের ভালবাসেন’ (সূরা মায়েদা, আয়াত: ৯৩)। তাই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ভালবাসা লাভ করতে হলে তার নির্দেশিত পথে আমদের জীবন পরিচালনা করতে হবে। আর আল্লাহতায়ালার বিধি বিধানের মাঝে ইহসান বা অনুগ্রহ হচ্ছে বড় এক নির্দেশ। তিনি চান, তার বান্দারা যেন একে অপরের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করে, সৎ হয়, পবিত্র জীবন যাপন করে, অন্যকে ভালবাসে। কে কোন জাতির বা কোন ধর্মের তা যাচাই করে ব্যবহার করার কথা বলা হয় নি। সৎকর্মশীল আমরা তখনই হতে পারি যখন আমাদের হৃদয়ে মানবজাতির জন্য অফুরান ভালবাসা সৃষ্টি হবে। এক আল্লাহপ্রেমিকের একান্ত বাসনা এটাই যে, সে যেন আল্লাহতায়ালার প্রকৃত প্রেমিক হতে পারে।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত হুযায়ফা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল করিম (সা.) বলেন, ‘তোমরা অন্যের দেখাদেখি এ কথা বলো না যে, মানুষ আমাদের সাথে সদ্ব্যবহার করলে আমরাও সদ্ব্যবহার করবো। আর তারা আমাদের প্রতি অন্যায় করলে আমরাও তাদের সাথে অন্যায় করব। বরং তোমরা নিজেদের তরবিয়ত এভাবে কর যেন মানুষ তোমাদের সাথে সদ্ব্যবহার করলে তোমরা তাদের সাথে ইহসান করবে। আর তারা তোমাদের সাথে র্দ্ব্যুবহার করলেও তোমরা অন্যায় আচরণ করবে না। (তিরমিযি, কিতাবুল বিররি ওয়াস সিলাতি ওয়াল আদাবি)। কতই না সুন্দর এ শিক্ষা, যা থেকে বুঝা যায়, আমাদের সাথে যদি কেউ সাধারণ নেকীও করে, তাহলে আমিও যেন তার সাথে ইহসান সুলভ আচরণ করি। যে আমার সাথে সামান্য ভাল ব্যবহার করেছে তার সাথে এর কয়েক গুণ বেশি ভাল করতে হবে। আর এখানেই শেষ নয়, বরং বলা হয়েছে যদি আমাদের সাথে কোনো মন্দ আচরণও কেউ করে, তার পরও আমি যেন তার প্রতি কোনো অন্যায় না করি।

মানুষের প্রতি যারা অনুগ্রহশীল, তাদেরকে আল্লাহপাক অনেক ভালবাসেন। হাদিসে এসেছে, হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল করিম (সা.) বলেন, মুসলমান ঘরসমূহের মধ্যে সেই ঘর উত্তম, যে ঘরে অনাথ রয়েছে আর তার সাথে অনুগ্রহের আচরণ করা হয় এবং মুসলমান ঘরসমূহের মধ্যে সেই ঘর নিকৃষ্ট যে ঘরে এতিমের সাথে অন্যায় আচরণ করা হয় (ইবনে মাজা, কিতাবুল আদাব, বাব হাক্কুল ইয়াতিম)। তারপর এতিম শিশুদের সাথে সদ্ব্যবহারকারীকে রাসূল করিম (সা.) আরেকটি শুভসংবাদ দান করেছেন। হজরত আবু উমামা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল করিম (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি কেবলমাত্র আল্লাহর খাতিরে কোনো অনাথ ছেলে বা মেয়ে শিশুর মাথায় ¯েœহভরে হাত বুলায় তার বিনিময়ে সে সেই শিশুর প্রতিটি চুলের জন্য পুণ্য লাভ করবে। আর যে ব্যক্তি তার অধীনস্থ অনাথ ছেলে বা মেয়ে শিশু সন্তানের প্রতি অনুগ্রহ করে সেই ব্যক্তি আর আমি জান্নাতে এভাবে থাকব (তারপর রাসূল করিম সা. নিজের দুটি আঙ্গুল এক সাথে মিলিয়ে দেখালেন) (মুসনাদ আহমদ বিন হাম্বল, ৫ম খ-, পৃষ্ঠা ২৫০, বৈরুত থেকে প্রকাশিত)। ইসলামের ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি যে, একজন নারী এ কারণে নরকাগ্নিতে প্রবেশ করেছে যে, একটি বিড়ালকে সে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত রেখেছিল। অপরদিকে পিপাসার্ত একটি কুকুরকে পানি পান করানোর ফলে এক ব্যক্তি বেহেশত লাভ করেছে।

সৃষ্টির সেবা যে কত মহান কাজ, তা উল্লিখিত দু’টি ঘটনা দ্বারা সহজে অনুমেয়। ধর্ম, মানুষের সুখশান্তি ও পথ প্রদর্শন এবং আলোর সন্ধান দেয়। মানুষ সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করতে ভালবাসে এবং জীবন ধারণের জন্য একে অপরের ওপর নির্ভর করে। একা কেউই তার নিজ প্রয়োজনীয়তা মেটাতে পারে না। একে অপরের সহায়তা করবে এবং করে থাকে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের উচিত হবে, যার যতটুকু সাধ্য আছে সে অনুযায়ী মানুষের উপকার করা।

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 249 People

সম্পর্কিত পোস্ট