চট্টগ্রাম সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৯ আগস্ট, ২০১৯ | ১২:৩২ এএম

মো. দিদারুল আলম

চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে হবে

তৈরি পোশাকশিল্পের পর চামড়াশিল্প বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত। এ শিল্পের শতভাগ কাঁচামাল দেশেই উৎপাদিত হয়। কাঁচামাল উৎপাদনের এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে গ্রামবাংলার অসংখ্য ক্ষুদ্র প্রান্তিক কৃষক ও খামারি জড়িত। কাঁচামালের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে দেশে যেমন পশুপালনের পরিধি বাড়বে, তেমনি বাড়বে দুধ ও মাংস উৎপাদন। পুষ্টি সমস্যার সমাধান হবে বহুলাংশে। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সচল হবে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা। এছাড়া ট্যানারি ও পাদুকা শিল্পেও ঘটবে অভাবনীয় উন্নয়ন। সেই সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়বে দেশের রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থান। কিন্তু এবার কী দেখলাম! পানির দামেও কেউ চামড়া কিনছে না। তাই মৌসুমী ব্যবসায়ীরা রাস্তায় চামড়া ফেলে দিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

বরাবরের মতো এবারও কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণে ব্যবসায়ীদের স্বার্থই সংরক্ষিত হয়েছে। গত ৬ আগস্ট বাণিজ্যমন্ত্রী ও বাণিজ্য সচিবের সঙ্গে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য প্রস্তুতকারক কোম্পানি এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে চূড়ান্ত হয়েছে চামড়ার দাম, যা মূলত গত বছরের মতোই। গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুট ঢাকায় ৪৫-৫০ টাকা, ঢাকার বাইরে ৩৫-৪০ টাকা। খাসির চামড়া সারাদেশে প্রতি বর্গফুট ১৮-২০ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৩-১৫ টাকা। ব্যবসায়ীরা অবশ্য এই দাম আরও কমাতে চেয়েছিলেন। তাদের মতে, গত কয়েক বছর ধরেই চামড়ার বাজারে মন্দা চলছে। বাস্তবে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের দাম বেশি। কেননা, কৃত্রিম চামড়ার কারণে প্রকৃত চামড়াজাত পাদুকাসহ অন্যবিধ পণ্য দ্রব্য বর্তমানে বিলাসপণ্য হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে।
কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে বরাবরের মতো এবারও সক্রিয় ছিল চামড়া সিন্ডিকেট। তাদের দাবি ও চাপের মুখে তাই এবারও চামড়ার দাম বাড়ানো গেল না। কিন্তু এবার এই বেধে দেওয়া দামে তো কেউ চামড়া বিক্রি করতে পারেনি। ১ লক্ষ টাকার গরুর চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে তিনশো টাকায়। যে মৌসুমী ব্যবসায়ী তিনশো টাকায় ক্রয় করেছে সে তো একশো টাকায়ও বিক্রি করতে পারেনি।

মূল্য বিপর্যয়ের কারণে চামড়া খাতে প্রায় সাড়ে ৫শ’ কোটি টাকার রফতানি আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, চামড়া বাজারের সার্বিক এ জের শেষ পর্যন্ত এ খাতের রফতানি আয় কমতে পারে। কারণ ট্যানারিগুলোর মালই হচ্ছে কাঁচা চামড়া। যা বিপুলসংখ্যক বিনষ্ট করা হয়েছে। চট্টগ্রামে রাস্তায় ফেলে নষ্ট করা হয়েছে এক লাখ পিস চামড়া।
দুই সিন্ডিকেটের কারসাজিতে কোরবানির পশুর চামড়ার ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়েছে। এমন দাবি করেছে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন। চট্টগ্রামে কোটি কোটি টাকার চামড়া ফেলে দেয়া হয়েছে।
বিপুলসংখ্যক এ চামড়া রাস্তায় ফেলে, নদীতে ভাসিয়ে ও মাটির নিচে চাপা দেয়া হয়। কাঁচামাল হিসেবে এসব চামড়া ট্যানারিগুলোতে আসত। নষ্ট চামড়াগুলো যথাসময়ে কেনা সম্ভব হলে বিদেশে রফতানি করে সাড়ে পাঁচশ’ কোটি টাকা আয় হতো। কিন্তু এবার তা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন এ খাতের সঙ্গে জড়িতরা। সরকার ট্যানারী শিল্পের কথা বিবেচনা করে সাভারে আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে ট্যানারীপল্লি করে দিল। ছিল ক্ষতিপূরণ, অনুদান, ঋণ সহযোগিতা কাঁচা চামডা রপ্তানি করা যাবে না, সব বাহিনী দিয়ে সীমান্ত বন্ধ করে দিতে হবে, তারা যাতে নামমাত্র মূল্যে চামডা কিনতে পারেন। তারা আড়তদারদের বকেয়া টাকা আটকে রাখছে বছরের পর বছর। সরকার কাঁচা চামড়া রফতানির সুযোগ দিয়ে আড়তদারদের সুবিধা করে দিয়ে ভালো করেছে।

বাংলাদেশ থেকে পাকা চামড়ার পাশাপাশি এখন জুতা, ট্রাভেল ব্যাগ, বেল্ট, জ্যাকেট ও ওয়ালেট বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। এছাড়াও চামড়ার নানা ফ্যান্সি পণ্যের চাহিদাও রয়েছে বিদেশে। বাংলাদেশে প্রচুর হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো এসব পণ্য তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করছে। বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বড় বাজার হলো- ইতালি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি, পোলান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। এর বাইরে জাপান, ভারত, নেপাল ও অস্ট্রেলিয়াতেও চামড়াজাত পণ্যের বাজার গড়ে উঠেছে সাম্প্রতিক সময়ে। বিশ্বে বাংলাদেশি চামড়াজাত পণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হলো জাপান। মোট রপ্তানি পণ্যের ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশই যায় জাপানের বাজারে। এর অন্যতম কারণ হলো বাংলাদেশি চামড়ার জুতার ক্ষেত্রে শুরু থেকেই জাপান ‘ডিউটি ফ্রি’ ও ‘কোটা ফ্রি’ সুবিধা দিয়ে আসছে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ পিস কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হয়। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। আর এই চামড়ার প্রায় অর্ধেকই পাওয়া যায় কোরবানি ঈদের সময়। সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও প্রতি বছর ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন জোড়া জুতা তৈরি হয় বাংলাদেশে। বলা বাহুল্য অভ্যন্তরীণ চাহিদার শতকরা ৫০ ভাগই মেটানো হয় দেশে তৈরি জুতা দিয়ে।

বর্তমানে বিশ্ববাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ২২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজার রয়েছে। বিশাল ওই বাজারে বাংলাদেশ মাত্র ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করে। বাংলাদেশ এ শিল্পের কাঁচামাল সমৃদ্ধ একটি সম্ভাবনাময় দেশ। উৎকৃষ্ট মানের পশু চামড়া উৎপাদনে বহুকাল ধরে এদেশের সুখ্যাতি রয়েছে সারা পৃথিবীতে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পাদুকা ও চামড়াজাত পণ্যেরও রয়েছে বিপুল চাহিদা। পণ্যের মানোন্নয়ন এবং পণ্যের বহুমুখী ও বৈচিত্র্যকরণ করা সম্ভব হলে আমাদের চামড়াশিল্প যেমন আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাবে তেমনি রপ্তানিও বাড়বে। সিন্ডিকেট প্রথা বাতিল ও টাস্কফোর্স গঠন করা গেলে চামড়া শিল্পের এবং এ শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে ২০২১ সালের মধ্যে এ খাতে ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির পাশাপাশি সম্ভাবনাময় এ শিল্প খাতে ৫০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য মিলিয়ে ১২৩ কোটি ডলার রপ্তানি আয় করেছে, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৬ শতাংশ বেশি। চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয় ১০০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে সাড়ে ১৩ শতাংশ বেশি।
মহান আল্লাহ আর্থিক সামর্থ্যবান মানুষের ওপর কোরবানি ওয়াজিব করেছেন। এই কোরবানির সাথে গরিব-এতিম-মিসকিনদের হকও জড়িয়ে রেখেছেন। ছোটবেলা থেকে আমরা দেখে আসছি, কোরবানির পশুর চামড়ার বিক্রিলব্ধ টাকা এতিম, গরিব-মিসকিনদের বিতরণ করা হয় এবং বিভিন্ন মাদরাসা ও এতিমখানায় দেয়া হয়। অনেক মাদরাসা ও এতিমখানা চালানোর আয় অনেকটা আসে কোরবানির চামড়া থেকে। সেই চামড়ার মূল্য কমতে কমতে পাঁচ বছরের মাথায় মাত্র অর্ধেকে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আশ্চর্য হলো, গরিবের হক মেরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চামড়া ব্যবসায়ীরা এবার মুনাফাখোরির যে মহড়া দেখিয়েছে, তাতে গোটা বিশ্বে বাঙালি মুসলমানের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণœ হয়েছে।
সারা দেশে চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কোরবানিদাতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। কোরবানিদাতারা পশুর চামড়া বিক্রির টাকা এলাকার এতিমখানা, লিল্লাহ বোর্ডিংসহ গরিব-দুঃখী মানুষের মধ্যে বিতরণ করেন। এবার চামড়ার দাম কমে যাওয়ায় দুস্থ-অসহায়দের ভাগে টাকা কম পড়েছে।
এই শিল্পকে সময়মতো প্রণোদনা দিলে বৈদেশিক মুদ্রা কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব। তা না করে নামমাত্র মূল্যে চামড়া বিক্রি করে গরিবের সম্পদ সুকৌশলে লুট করা হচ্ছে। ধনীরা কোরবানি দিয়ে গোশত খাচ্ছেন ঠিকই, অন্য দিকে গরিবের হক বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে পানির দরে। এতে বঞ্চিত হচ্ছে দেশের অনেক এতিমখানা ও মাদরাসা। দুর্বলদের পাশে সাধারণত কেউ থাকে না। তেলা মাথায় তেল ঢালতে চায় সবাই। গরিবের অধিকার কেড়ে নিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়া অমানবিক।
সত্ত্বর সিন্ডিকেট প্রথা বাতিল ও এই শিল্পের জন্য যা যা করা প্রয়োজন তা করে এ শিল্পকে এড়িয়ে নিয়ে যেতে হবে সরকারকেই। অন্যথায় এটিও পাট শিল্পের মতো ধ্বংস হয়ে যাবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

The Post Viewed By: 124 People