চট্টগ্রাম বুধবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৬ আগস্ট, ২০১৯ | ১২:৪৬ এএম

চামড়ার দামে নজিরবিহীন ধস

নাটের গুরুদের আইনের মুখোমুখি করুন

সিন্ডিকেটের কারসাজিতে এবারও কোরবানির চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে। তবে এবারের ধসটি হচ্ছে নজিরবিহীন। কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে এমন সংকট অতীতে কখনো দেখা যায়নি। বিক্রি করতে না পেরে মানুষ হাজার হাজার চামড়া ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে, না হয় মাটিতে পুঁতে ফেলেছে। দৈনিক পূর্বকোণে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত খবরে দেখা যাচ্ছে, বিক্রি করতে না পেরে শুধু চট্টগ্রাম মহানগরীতেই লক্ষাধিক চামড়া রাস্তা ও ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছেন কোরবানিদাতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। নষ্ট ও পচা এসব চামড়া হালিশহর ডাম্পিং স্টেশনে পুঁতে ফেলেছে চসিক। অতীতে চামড়ার বাজার উত্থান-পতন হলেও চামড়া বিক্রি করতে না পেরে রাস্তায় ফেলে দেয়ার নজির নেই। সন্দেহ নেই এই বিপর্যয় চামড়া শিল্পের জন্য অশনিসংকেত।
গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী কোরবানির কাঁচা চামড়ার বাজারে ভয়াবহ ধসের জন্য আড়তদার, ট্যানারি মালিক ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা পরস্পরকে দুষছেন। বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশনের মতে, চামড়ার পুরো বাজার নির্ভর করছে রপ্তানির ওপর। আগের চেয়ে রপ্তানি কমে গেছে। ফলে চামড়া সংগ্রহও কমাতে হয়েছে। এছাড়া আগের বছরের চামড়া বিক্রি করে শেষ করতে পারেনি অনেকে। আর অর্থের সংকট তো আছেই। চট্টগ্রামের মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বলছেন, আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দর অস্বাভাবিকভাবে কমিয়ে দিয়েছেন। তবে আড়তদারদের দাবি, চট্টগ্রামের চামড়া ব্যবসা এখন ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। গত বছরের প্রায় ৩০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। ২০০৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে এ পর্যন্ত ৫০ কোটি টাকারও বেশি পাওনা রয়েছে চট্টগ্রামের আড়তদারদের। এভাবে সারাদেশের আড়তদারদের বকেয়া পাওয়া রয়েছে শত শত কোটি টাকা। পুঁজি হারিয়ে অনেক আড়তদার দেউলিয়া হয়ে পড়েছেন। হাতে টাকা না থাকায় চাহিদা মতো চামড়া কিনতে পারেনি আড়তদাররা। পুঁজি না থাকায় চট্টগ্রামের আড়াইশ আড়তদারের মধ্যে অর্ধেকেরই বেশি এবার চামড়া ব্যবসা থেকে বিরত ছিলেন। চট্টগ্রাম চামড়া আড়তদার সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সমিতির অধীনে ১১২ জন ব্যবসায়ী আছেন। সমিতির বাইরে রয়েছেন আরও দেড় শতাধিক ব্যবসায়ী। ২৬০ জন ব্যবসায়ীর মধ্যে এবার চামড়া কিনেছেন ১১০ থেকে ২২০ জন আড়তদার। পুঁজি না থাকায় অন্যরা চামড়া কিনতে পারেননি। দেশের অন্যত্রও একই চিত্র। ফলে কোরবানির চামড়ার বাজারে নজিরবিহীন ধস নেমেছে এবার। উল্লেখ্য, ট্যানারি মালিকরা ব্যাংকঋণ এবং সরকারের কাছ থেকে নানা প্রণোদনা পান। তারপরেও তারা আড়তদারদের বকেয়া টাকা পরিশোধ না করার বিষয়টি বোধগম্য নয়।
এবার সরকার কোরবানি পশুর চমড়ার দাম নির্ধারণ করেছে ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৪৫-৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩৫-৪০ টাকা। এ ছাড়া খাসির চামড়া ১৮-২০ টাকা, বকরির ১৩-১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। দাম নির্ধারণের সময় উপস্থিত ছিলেন চামড়া খাত শিল্পের উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, রফতানিকারক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিরা। চামড়াসন্ত্রাস রোধে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হার্ডলাইনে থাকার নির্দেশও দিয়েছে সরকার। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সবকিছুই ‘কথার কথা’তেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। আর এ সুযোগে একটি অশুভ চক্র গরীব-মিসকিন ও এতিমের হক ধংসের পাশাপাশি আমাদের সম্ভাবনাময় চামড়া খাতকে চিরতরে ধংস করে দেয়া নীল নকশা বাস্তবায়নে উঠেপড়ে লেগেছে। এতে একদিকে নষ্ট হচ্ছে গরীবের হক, অন্যদিকে চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের চামড়াশিল্পেও। চামড়া পাচারের আশংকা তো আছেই। এই প্রেক্ষাপটে উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করার জন্য কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কিন্তু এই সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী নয় ও অদূরদর্শি বলে দাবি করেছেন আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা। ট্যানারি মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সরকারের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা না হলে দেশের চামড়াশিল্পের সর্বনাশ হয়ে যাবে। এই যুক্তির পেছনে সত্য কী তা জানা না গেলেও আমরা বলতে চাই, কারসাজির হোতাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দেশ ও জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হোক। চামড়ানীতি প্রণয়ন করে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হোক। খল ব্যবসায়ীরা নানা ছলে গরীবের হক মারার পাশাপাশি চামড়া পাচারের পথ মসৃণ করে দেবে। দেশের চামড়া শিল্পকে ধংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে, তা হতে দেয়া যায় না। এ ব্যপারে সরকারকে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। ভবিষ্যতে কোরবানির ঈদে চামড়া নিয়ে সব ধরনের কারসাজির পুনরাবৃত্তি রোধ করতে এর বিকল্প নেই। আমাদের বিশ^াস, সরকার সঠিক পথেই হাঁটবে।

The Post Viewed By: 106 People

সম্পর্কিত পোস্ট