চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৫ আগস্ট, ২০১৯ | ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ

মোহীত উল আলম

বঙ্গবন্ধু ও যুবসমাজ

বাংলাদেশের শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী (নওফেল) এম. পি. ফেইস বুকে ছাত্রসমাজের শিক্ষা ও রাজনীতি নিয়ে একটি পর্যবেক্ষণ রেখেছেন। তিনি বলেছেন যে যুবসমাজ বিশেষ করে ছাত্রলীগের নেতা ও সদস্যদের মধ্যে একটি প্রবণতা লক্ষ্য করে তিনি চরম উদ্বিগ্ন হচ্ছেন। সেটি হচ্ছে ছাত্রলীগসহ শিক্ষার্থী যুবসমাজ জ্ঞানচর্চার দিকে ধাবিত না হয়ে হুজুগে রাজনীতি ও স্লোগান-নির্ভর কর্মধারায় মনোযোগ দিচ্ছে। ফলে তিনি মনে করছেন, এই অপ-প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট হয়ে ছাত্রসমাজ তাদের মাহেন্দ্রক্ষণকে বাজে ভাবে নষ্ট করছে। তারা পড়ালেখা ছেড়ে টেন্ডার ব্যবসাসহ লেজুড়বৃত্তিতে অকাতরে জড়িয়ে পড়ছে। উপমন্ত্রীর এই উপলব্ধির সঙ্গে সমাজের সচেতন অংশ কমবেশি সবাই একমত পোষণ করেছেন। সেভাবে লাইকও পড়েছে, মন্তব্যও এসেছে।
আজকে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর ৪৪বছর পার হলো। তাঁর সময়ে বাংলাদেশ যে অবস্থানে ছিল এখন আর সে অবস্থানে নেই। তাঁরই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে তৃতীয় কাতার থেকে দ্বিতীয় কাতারে পৌঁছে গেছে। ষোল কোটির ছোট্ট দেশটি এখন সার্বিক দারিদ্রের চেহারা বদলে ফেলতে পেরেছে। গড়ে উঠেছে একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্য, দারিদ্র দূরীকরণের সাফল্য, স্বাস্থ্যখাতে সাফল্য এবং যোগাযোগের সড়ক ও সেতু বানানোর সাফল্য বিশে^র বিভিন্ন নজরদারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রশংসা পাচ্ছে। তবে এখনো অনেক কাজ বাকি বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাকে বাস্তবে রূপ দিতে।
আমার এ লেখার উদ্দেশ্য হলো শিক্ষা উপমন্ত্রীর পর্যবেক্ষণের আলোকে বঙ্গবন্ধু ঠিক যুব ও ছাত্রসমাজ নিয়ে কী চিন্তা করেছিলেন তার একটা সাক্ষ্য তুলে ধরা।
১৯ শে আগস্ট, ১৯৭৩-এ ঢাকায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “১৯৪৮-৪৭ সালে আমরা কিছু কিছু সংগ্রাম শুরু করলাম। ৪৮ সালে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠিত করে। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের যে ধারণা তা স্পষ্ট হয়ে গেল। ১৯৪৮ সালে তারা আমার ভাষা, আমার কৃষ্টির ওপর আঘাত করল। বাংলা ভাষাকে ভুলিয়ে আমাদের উর্দু শেখানোর চেষ্টা করল। জিন্নাহ্ সাহেবকে ঢাকায় আনা হলো। এই রেসকোর্স ময়দান যখন নাম ছিল এখানে বক্তৃতা করে জিন্নাহ্্ সাহেব বলেছিলেন উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে। তার বিরুদ্ধে কথা বলা তখন বড় সাংঘাতিক ব্যাপার ছিল। মাথা থাকত কিনা জানতাম না। প্রতিবাদ করেছিলাম আমি ওখানে দাঁড়িয়ে, প্রতিবাদ করেছিল বাংলার ছাত্রসমাজ সেই যুগে, প্রতিবাদ করেছিল বুদ্ধিজীবী সমাজ। জনগণ তখন বুঝতে পারে নাই, আমাদের ওপর হলো অত্যাচার। ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ তারিখে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদ করে আমাদের আন্দোলন শুরু হয়। ৯ ঘটিকার সময় আমি গ্রেফতার হয়ে যাই, আমার সহযোগীরা গ্রেফতার হয়ে যায়।”
বঙ্গবন্ধুর এ থিসিসটা হলো বাংলাদেশ উজ্জীবনের প্রথম সূত্র। জিন্নাহ্র দ্বি-জাতিতত্ত্বভিত্তিক ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ থেকে ভাষাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী চেতনায় উপনীত হবার কারণেই বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়। এ আন্দোলনে আওয়ামীলীগ ছিল নেতৃত্বে এবং বঙ্গবন্ধু ছিলেন তার যোগ্য নেতা। দেশ গড়ার কাজে তরুণ প্রজন্ম তথা ছাত্রলীগকে নিজেদের উজাড় করার জন্য তিনি আহ্বান জানান: “ছাত্র ভাইয়েরা ও বোনেরা, খেয়ে দেয়ে শুয়ে পোড়ো না। তোমরা আমার ছেলেরা তোমরা আমার ছেলের মতো। শাসন করা তারই সাজে সোহাগ করে যে। আমি তোমাদের শাসন করতে চাই সোহাগও করতে চাই। তোমাদের আত্মসমালোচনা কর, আত্মসংযম কর, তারপরে আত্মশুদ্ধি কর, তারপরে রাস্তায় নামো মানুষ বুঝবে, মানুষ ভালোবাসবে, মানুষজন তোমাদের সাথে যোগ দিবে। নাইলে হবে না।”
পুরো ভাষণটি ঐতিহাসিক বর্ণনায় বিস্তৃত এবং বঙ্গবন্ধু যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে ছাত্রমহলের কাছে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ও তার থেকে শিক্ষাগ্রহণের কথা বলেছেন। কিশোর-তরুণ-যুবসমাজ যেমন যে কোন সমাজ বদলের হাতিয়ার, তেমনি তাদের অভিজ্ঞতার অভাবে অনেক সময় তারা বিপথেও পরিচালিত হতে পারে। এ ভাষণটির মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ তরুণপ্রজন্মকে ইতিহাসজ্ঞানে সমৃদ্ধ করার অর্থ হলো এ কথা পরিষ্কার করা যে বাংলাদেশ একটি ঐতিহাসিক পরম্পরা থেকে সৃষ্টি হয়েছে। হুজুগে কিছু হয় নি এবং আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এ সত্য উপলব্ধি করার প্রয়োজন এখনো ফুরিয়ে যায়নি, কেননা দ্বি-জাতিতত্ত্বের তাগিদ জনমনের একটি অংশে ভ্রান্তিজনকভাবে মিশে গেছে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় বিশ^াসের সঙ্গে। পাকিস্তান যে ইসলাম নয়, বা ইসলাম যে পাকিস্তান নয়, কিংবা বাংলাদেশ যে অসাম্প্রদায়িক হলেও অনৈসলামিক দেশ নয় এ ধন্ধটা অনেকের কাছে অদ্যাবধি পরিষ্কার নয়। এই ভ্রান্তি দূরীকরণের প্রচেষ্টা বঙ্গবন্ধুর ছাত্রলীগের প্রতি নি¤েœাক্ত উপদেশ থেকে লক্ষ করা যায়: “আমি তোমাদের বলি তোমাদের আন্দোলন করতে হবে, সংগ্রাম শেষ হয় নাই সংগ্রাম শুরু হয়েছে। আগেও বলেছি এটা দেশ গড়ার সংগ্রাম। সমাজতন্ত্র করতে হলে সমাজতন্ত্রের ডিসিপ্লিন দরকার।”
বঙ্গবন্ধু ছাত্রদেরকে দেশ গড়ার সংগ্রামের কথা বলছেন। এ সংগ্রামটা শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শিক্ষানীতি, ভৌত-সুবিধাদি, মেধা এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অর্থনৈতিক অবস্থানের সরাসরি সম্পর্ক। দারিদ্র থেকে উত্তরণের একটি উপায় মেধা এবং শ্রমদিয়ে লেখাপড়ায় উন্নতি করে জীবিকা অর্জনের পথে সফলতা লাভ করা। আবার সামান্য-স্বচ্ছল কিংবা সম্পূর্ণ স্বচ্ছল পারিবারিক প্রেক্ষাপট থেকেও লেখাপড়ায় উন্নতি করে জীবনে সফল হওয়া যায়। তবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান চরিত্র হলো মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা না জাগিয়ে দুষ্ট অহংবোধ তৈরি করা। চলবে

লেখক: অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ ও ডিন, প্রিমিয়ার বিশ^বিদ্যালয় চট্টগ্রাম।

The Post Viewed By: 303 People

সম্পর্কিত পোস্ট