চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৫ আগস্ট, ২০১৯ | ১২:৪৮ পূর্বাহ্ণ

ড. শিরীণ আখতার

বঙ্গবন্ধু এক অমলিন আদর্শের নাম

আগস্ট বাঙালির শোকের মাস। অশ্রুসিক্ত রক্তাক্ত অধ্যায়ের অন্য নাম ১৫ই আগস্ট। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কময় রাত এটি। যে রাতে স্ত্রী-সন্তানসহ সপরিবারে নিহত হয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে এমন আরেকজন মহান নেতার আর্বিভাব ঘটেনি। শোকে স্তব্দ হয়ে গেছিল সেদিনের সেই ভয়াল রাতে। পিতা হারানোর শোক আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি এ জাতি। কী নিষ্ঠুর, কী ভয়াল, কী ভয়ঙ্কর সেই রাত। মুজিবকে হারিয়ে সেদিন হেরেছিল বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ সৃষ্টির পূর্বাপর দুটি ঘটনা কোনোভাবেই সাধারণ চোখে দেখার সুযোগ নেই। একটি হচ্ছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং অন্যটি পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা। তাই মুক্তিযুদ্ধকে অবহেলার চোখে দেখা ও বিবেচনা করা যেমনটি অন্যায় ঠিক তেমনি পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টকেও অবজ্ঞার চোখে দেখা অন্যায়। বাঙালি কতটা লোভী ও ক্ষমতান্ধ হলে এমন নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটাতে পারে তা ভাবতেও গা শিউরে ওঠে। বছর ঘুরে রক্তের কালিতে লেখা সে দিন-রাত আবার ফিরে এসেছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, ইতিহাসের এই নৃশংসতম হত্যাকা-টি ছিল একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনারই অংশ। সদ্য স্বাধীন দেশ গঠনে যখন সরকার ব্যস্ত, তখনই হত্যা করা হলো দেশের স্থপতিকে। এ হত্যাকা-ের নেপথ্যে ছিল দেশকে অস্থিতিশীল করার, ভিন্ন পথে ধাবিত করার এক গভীর ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি যেমন ছিল, তেমনি ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতিতে লুকিয়ে থাকা কিছু সুযোগসন্ধানী ও নিচু মানুষ। স্বাধীনতার পর থেকেই সুযোগ খুঁজতে থাকে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র, নানা ছত্রচ্ছায়ায় তারা সংগঠিত হতে শুরু করে। আর তাদের সঙ্গে হাত মেলায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী কিছু আন্তর্জাতিক শক্তি। আর তারই শিকার হন শেখ মুজিবুর রহমান। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তি বা তাঁর পরিবারকে হত্যার প্রয়াস ছিল না, ছিল জাতির স্বাধীনতার স্বপ্নকেই হত্যার অপচেষ্টা। ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে খুন করে তারা একটি আদর্শকে খুন করতে চেয়েছিল। কিন্তু আদর্শের মৃত্যু নেই- এই সত্যটি তারা উপলব্ধি করতে পারেনি।
বস্তুত পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট বাংলাদেশ নামক কল্যাণরাষ্ট্রটির হত্যারই একটি অপচেষ্টা, ঘাতকের এটা জানা ছিল যে বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতে সামরিক সন্ত্রাস, উগ্র-মৌলবাদ আর সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যের বাংলাদেশ তৈরি সম্ভব নয়। বাংলাদেশ দশকের পর দশক ধুঁকে ধুঁকে মরেছে। আর আকাশে ধ্বনিত হয়েছে খুনিদের উল্লাস ও আস্ফালন। তাই বাঙালি জাতীয়তাবাদের মতো লাখো শহিদের রক্তে রঞ্জিত রাষ্ট্র বাংলাদেশেরও মৃত্যুঘণ্টা বাজানোর চেষ্টা হয় ওই দিন। বাংলাদেশের ভিত্তি যে শাসনতন্ত্র তা ভূলুণ্ঠিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয় তখনই। তাই একুশ বছর হীন চক্রান্ত করে ঠেকিয়ে রাখা হয় আওয়ামী লীগকে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়াকেও তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিলম্বিত করেছিল। একাত্তরের ঘাতকদেরকে বসানো হয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতায়। তাই এই অমানবিক হত্যাকা-কে বাংলাদেশের হত্যাকা-ই বলা চলে। বাংলাদেশের মূলনীতিগুলোকে হত্যা করার অপচেষ্টা। পঁচাত্তরের ঘাতকদের প্রকৃত লক্ষ্য ছিল বাঙালি ও বাংলাদেশকে অভিভাবকহীন করা।
একথা অনস্বীকার্য যে, ‘মুক্তিযুদ্ধ’ বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধ ইত্যাদি ঘটনাবলির ভিতর দিয়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা। সে সময়ই তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অবিকল্প নেতা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নয় মাস কারান্তরালে থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযোদ্ধাদের বুক জুড়ে ছিল বঙ্গবন্ধুর উজ্জ্বল উপস্থিতি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো, তিনি আমাদের বাঙালি জাতিসত্তাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাঙালির দীর্ঘদিনের আত্মানুসন্ধান, দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও সংগ্রামের অমোঘ পরিণতি হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। আসলে জাতির মুক্তিসংগ্রামে নেতা একজনই। দীর্ঘ আপসহীন রাজনৈতিক কর্মকা-, নিরঙ্কুশ জনসমর্থন এবং সর্বোপরি জাতির ক্রান্তিলগ্নে ঐতিহাসিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে তিনি পরিণত হয়েছিলেন এ জাতির অবিসংবাদিত নেতায়।
বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, জনগণের প্রতি ভালোবাসা আর একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। যতদিন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি পৃথিবীর বুকে পরিচিত থাকবে, ততদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পৃথিবীর বুকে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বিংশ শতাব্দীর বাঙালির নবজাগরণের প্রতিভূ বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রধান পুরুষ তিনি। বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংকট মোচনে তার অবদান বিশ্বস্বীকৃত। কিন্তু এমন মানুষটিও স্বাধীনতাবিরোধীদের ষড়যন্ত্রের কবল থেকে বাঁচতে পারেননি। তবে হত্যাকা- ঘটিয়ে শারীরিক বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে দিয়ে জনগণের সার্বভৌমত্বের ক্রিয়াশীলতা সাময়িকভাবে থমকে দেয়া সম্ভব হলেও, ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক চেতনা’ শাশ্বত কারণে খুনিচক্র তা চিরতরে স্তব্ধ করতে পারেনি। কারণ তিনি জনগণের নেতা ছিলেন, জনসমর্থনই ছিল তাঁর মূল প্রেরণা। বঙ্গবন্ধুর মতো এমন তেজস্বী, দূরদর্শী ও সৎ সাহসী রাজনৈতিক নেতার আবির্ভাব এই বাংলায় আর কখনও ঘটেনি। ছাত্র অবস্থায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া শেখ মুজিবুর রহমান ’৫২’র ভাষা আন্দোলনে একজন সংগ্রামী নেতা। বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ৬ দফার প্রণেতাও ছিলেন তিনি। ষাটের দশক থেকেই তিনি পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অগ্রনায়কে পরিণত হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭০’র নির্বাচনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে এদেশের গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষা ও নির্ভরতার প্রতীকে পরিণত করেন।
তিলে তিলে বঙ্গবন্ধু নিজেকে গড়ে তুলেছেন, পাশাপাশি একদিকে ছাত্র সংগঠন আরেক দিকে গণসংগঠনের জন্ম, বিকাশ ও শক্তিশালীকরণের মধ্য দিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে একটি ঘুমন্ত জাতিকে তিনি জাগিয়েছিলেন। স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা, পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন। পাকিস্তানের অন্ধকার কারা প্রকোষ্ঠে ৯ মাস বন্দি থেকেছেন। পৃথিবী থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিল। ইয়াহিয়া খানের সামরিক আদালত তাঁকে মৃত্যুদ- দিয়েছে। তার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছে। তবুও তিনি তাঁর দেশ, মাটি, মানুষ ও স্বাধীনতাকে ভালোবেসেছিলেন।
প্রকৃত অর্থে বঙ্গবন্ধু কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। ব্যক্তিত্বে, উচ্চতায়, বজ্রকণ্ঠে, দ্ব্যর্থহীন তর্জনীতে আর রাজনৈতিক সংগ্রামের সফলতাই তিনি শুধু একটি জাতিকে গৌরবের মহিমায় মহিমান্বিত করেননি, মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর স্বাধীনতার প্রশ্নে, দেশের মাটি ও মানুষের আস্থা, বিশ্বাস ভূলুণ্ঠিত করতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। তিনি ছিলেন দৃঢ় ও আপসহীন। এমন নেতার আবির্ভাব সহস্র বছরে একটি জাতির জীবনে ঘটে কিনা, জানা নেই।
মানুষ হিসেবে, একজন বাঙালি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর জীবনদর্শন কত গভীর ছিল, রাজনীতিক কুশীলব হিসেবে তিনি মানুষের ভালোবাসার সাথে নিজেকে কতটা সম্পৃক্ত করেছিলেন প্রকৃতপক্ষে তা-ই তাঁকে অমর করে রেখেছে। তাঁর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র শুরুতেই তাঁর সেই পরিচয় পাই। তিনি বলেছেন ‘একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসেবে যা কিছু বাঙালিদের সাথে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।’
ইতিহাসের মহানায়ক, বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু এদেশের স্বাধীনতার স্থপতিই ছিলেন না, প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামেই তাঁর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। এই মহানায়কের জন্ম না হলে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারত না। কূটনীতি ও রাষ্ট্রাচারের ক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধুর বিশাল ব্যক্তিত্ব ও সহনশীল আচরণ পরিলক্ষিত হয়েছে। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখেনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্বে, সাহসিকতায় এই মানবই হিমালয়।’
ব্যক্তিগত গুণাবলী, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং অসামান্য চরিত্রমাধুর্যের সৌরভে অবিস্মরণীয় নেতাদের কাতারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। তাঁর সমগ্র জীবন ছিল ইতিহাসের অতুলনীয় এক মহাকাব্যের মতো। বঙ্গবন্ধু কেবল একজন ভালো মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন যে কারও আদর্শ হওয়ার মতো। এই প্রজন্মের ছেলেরা যখন এখনকার রাজনীতিবিদদের প্রতি বিতৃষ্ণা জাগিয়ে রাজনীতি থেকে দূরে সরতে চায়, তখন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ তাদেরকে তাঁর দেখানো পথে চলতে উৎসাহ জাগায়।
বাঙালি জাতির সৌভাগ্য যে এমন এক মহান নেতা পেয়েছিলেন। একই সাথে আমাদের দুর্ভাগ্যও যে তাঁকে আমাদের হারাতে হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে না থাকলেও ইতিহাসের মহাসড়কের পথ ধরে বঙ্গবন্ধু নিজস্ব পথ তৈরি করে দিয়ে গেছেন। তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক জীবন ও ব্যাক্তিগত জীবনদর্শন তিনি আমাদের জন্য তথা সমস্ত বাঙালি জাতির জন্য অপার আদর্শ হিসেবে রেখে গেছেন। সে আদর্শ ধারণ করে বাঙালি এগিয়ে যেতে পারে সামনের দিকে।
বঙ্গবন্ধুই একমাত্র নেতা যিনি একই সাথে বাঙালির অতীত ও ভবিষ্যতকে তাৎপর্যপূর্ণ করেছেন। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের পথিকৃত হিসেবে মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সংগ্রাম করে বাংলার মাটি ও মানুষের সাথে আজো তিনি মিশে আছেন। স্বাধীন বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তি। তাই যতদিন বাংলার মানচিত্র থাকবে, যতদিন বাঙালির ইতিহাস থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু থাকবেন অমর-অবিনশ্বর। বাংলার স্বাধীনতা, ভাষা, সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার মধ্যে একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালিরূপে বঙ্গবন্ধু থাকবেন চিরজাগ্রত। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানুষকে অহিংসা দিয়ে, মানবপ্রেম দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে সমাজে যে আদর্শ তৈরি করে গেছেন তার কোনো মৃত্যু নেই, ক্ষয় নেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা দলের সম্পদ নন। তিনি গোটা জাতির অহংকার। কিন্তু আমরা তাঁকে প্রকৃত সম্মান দিতে পারিনি আমাদের সংকীর্ণতার কারণে। জাতি হিসেবে সম্ভবত একমাত্র আমরাই তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিতে গিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়েছি নানা দল ও মতে। যে মাটিতে জাতির জনককে হত্যা করা হয়েছিল, সেই মাটিই তার দায় শোধ করেছে এই পৈশাচিক হত্যাকা-ের ঐতিহাসিক বিচার সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে। তাঁকে নিয়ে যত দ্বিধাই থাকুক―জীবিত মুজিবের চেয়ে মৃত মুজিব আরো বেশি প্রেরণার উৎসে পরিণত হয়ে উঠলেন, জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে মৃত বঙ্গবন্ধু অনেক বেশি শক্তিশালী, চিরস্থায়ী ও চিরঅম্লাান।
আসুন, আমরা জাতির পিতা হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে তাঁর স্বপ্ন ‘সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করি। ক্ষুধাম্ক্তু, দারিদ্র্যমুক্ত, শান্তিপূর্ণ, সুখি-সমৃদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার এ সংগ্রামে আমাদের অবশ্যই জয়ী হতে হবে। খুনিদের বিচারের মধ্যদিয়ে আমরা ইতিহাসের দায়মুক্তি পেয়েছি বটে কিন্তু এই দায়মুক্তির প্রকৃত সুফল আসবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার মাধ্যমে।
বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ছিলো বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর আদর্শ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতি হিসেবে আমরা জাতির জনকের খুনের দায় কিছুটা হলেও শোধ করতে পারব। আশার কথা, পঁচাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশে দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সংগ্রাম, নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও সরকার পরিচালনার কারণে জনগণের সার্বভৌমত্ব সফলভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি দেশের উন্নয়নের গতিকেও বেগবান করেছে। পাশাপাশি ত্যাগের মহিমায় দেদীপ্যমান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাসঙ্গিকতা সূর্যের মতো উজ্জ্বল স্থান লাভ করেছে।
ব্যক্তির মৃত্যু হয় কিন্তু চেতনার মৃত্যু হয় না। তাই বঙ্গবন্ধুর দৈহিক সমাপ্তিই তাঁর মৃত্যু নয় বরং তাঁকে হত্যা করার এক অক্ষম প্রচেষ্টা মাত্র। আসুন, সকলে মিলে ঐসব খুনিদের স্মরণ করিয়ে দিই, বঙ্গবন্ধু হচ্ছে গ্রীক পুরাণের ফিনিক্স পাখি, যে বারবার আগুনের ভিতর থেকে জন্ম নেয়। ভস্ম হয়ে গেলেও মরে না। কেননা বাংলাদেশ নামক যে রাষ্ট্র তার ভৌগোলিক উপস্থিতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবনব্যাপী সাধনারই ফল। যে কারণে তিনি মহানায়ক, তিনি বঙ্গবন্ধু, আমাদের জাতির জনক।

লেখক : উপাচার্য (চলতি দায়িত্ব) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; কথাসাহিত্যিক ও গবেষক।

The Post Viewed By: 212 People

সম্পর্কিত পোস্ট