চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বর, ২০২২

সর্বশেষ:

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২ | ৮:৫৯ অপরাহ্ণ

অনলাইন ডেস্ক

বিশ্ব হার্ট দিবস

হৃদযন্ত্রের সুস্থতায় সচেতনতা জরুরি

‘প্রতিটি হৃদয়ের জন্য হৃদয় ব্যবহার করুন’ প্রতিপাদ্যে আজ পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব হার্ট দিবস-২০২২’। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুরুত্বের সঙ্গে দিবসটি পালন করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ২০০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে দিবসটি জাতীয়ভাবে পালন করে আসছে। দিবসটি পালন উপলক্ষে প্রতিবছরই সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। হৃদরোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে এবারও দেশের নানাস্থানে সেমিনার, সিম্পোজিয়ামসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এসব কর্মসূচির একটাই লক্ষ্য। তা হচ্ছে, হৃদরোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা।

 

বহুমাত্রিক কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্ব হার্ট দিবস পালনের ফলে হৃদরোগ ও সুস্থ হার্ট সম্পর্কে সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও সচেতন হবেন, সন্দেহ নেই। তবে, কাক্সিক্ষত ফল পেতে জনসচেতনতা সৃষ্টির কর্মসূচিসহ বছরব্যাপী নানামাত্রিক বাস্তবধর্মী উদ্যোগ থাকা জরুরি।

গবেষণায় উঠে এসেছে, বিশ্বের অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর প্রধান কারণ হৃদরোগ। প্রতিবছরে বিশ্বে প্রায় ১৮ দশমিক ৬ মিলিয়ন বা এক কোটি ৮৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় রোগটিতে। পৃথিবীব্যাপী মোট মৃত্যুর ৩২ শতাংশ হয়ে থাকে হৃদরোগ এবং রক্তনালির রোগের কারণে। হৃদরোগকে তাই বিশ্বের এক নম্বর ঘাতক ব্যাধি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হৃদরোগের অন্যতম কারণ ধূমপান, ডায়বেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থুলতা, মেটাবলিক সিনড্রোম, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, কায়িক পরিশ্রমহীন আধুনিক জীবনযাপন, বায়ু দূষণ ইত্যাদি। জোরালো প্রতিরোধ উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হলে ২০৩০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ বিশ্বে হৃদরোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যাবে।

 

অসংক্রামক রোগের ১২.৫ ভাগ মৃত্যু হয় হৃদরোগে, যার মধ্যে শতকরা ৮২ ভাগ মৃত্যু হয় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগণের। কারণ এর চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল। সাধারণ কিংবা মধ্যবিত্ত রোগীর পক্ষে এ ব্যয় বহন করা অনেক সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বে হৃদরোগে মৃত্যুর শিকার মানুষদের শতকরা ৮০ ভাগই স্বল্প ও মধ্য আয়ের দেশের। বাংলাদেশেও হৃদরোগে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

উন্নত আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাত্রা, অস্বাস্থ্যকর জীবনাভ্যাস, অসচেতনতা এসব কারণে হৃদরোগ শুধু বড়দের নয়, শিশু-কিশোরদের মাঝেও দেখা যাচ্ছে। আমাদের দেশে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ১৭ ভাগই হৃদরোগের কারণে। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার চার থেকে পাঁচ ভাগই হৃদরোগ আক্রান্ত। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন গরেষণা-প্রতিবেদন অনুযায়ী, হৃদরোগে আক্রান্তের ৬০ শতাংশই হচ্ছে তরুণ।

 

যাদের বয়স ৪৫ বছরের কম। ট্রান্সফ্যাটযুক্ত খাদ্য গ্রহণই তরুণদের হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ। ট্রান্সফ্যাট একটি ক্ষতিকর খাদ্য উপাদান, যা হৃদরোগ ও হৃদরোগজনিত অকাল মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ায়। ডালডা বা বনস্পতি ঘি এবং তা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন খাবার, ফাস্টফুড ও বেকারি পণ্যে ট্রান্সফ্যাট থাকে। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের এক গবেষণা দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি ৫ জন তরুণের মধ্যে ১ জন হৃদরোগ ঝুঁকিতে রয়েছে। এটি অ্যালার্মিং। যদিও বিশ্বজুড়ে হৃদরোগ ও হৃদরোগজনিত অকাল মৃত্যুঝুঁকি কমাতে ২০২৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বিশ্বের খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে ট্রান্সফ্যাট নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তবে তা কতটুকু বাস্তবে রূপ পায় তা দেখার বিষয়। এছাড়া এ রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের মোট জনসংখ্যার ২৫ থেকে ৩০ ভাগ মানুষ।

 

দেশে হৃদরোগের এই চিত্র খুবই উদ্বেগকর। উল্লেখ্য, মানবদেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে হার্ট বা হৃৎপিন্ড। কিন্তু প্রয়োজনীয় সচেতনতা এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার নেতিবাচক প্রভাবে এই হৃদপিন্ড অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হৃদরোগের ঝুঁকির ব্যাপারটি নির্ভর করে একজন মানুষ কীভাবে জীবনযাপন করছে তার ওপর। অতিরিক্ত ধূমপান, শুয়ে-বসে সময় কাটানো, শরীর চর্চাহীন অলস জীবনযাপন ও চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণের কারণে চর্বি জমা হয়ে ধমনিগুলো সরু হতে থাকে।

হৃৎপিন্ডের রক্তনালিতে রক্ত চলার পথ বা ধমনির ভিতর রক্ত প্রবেশের পথ আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে হৃৎপিন্ডকে অক্সিজেন দিতে ব্যর্থ হলেই ঘটতে পারে হার্ট অ্যাটাকের মতো জটিল রোগ। আবার ঝুঁকিপূর্ণ কর্মস্থল এবং বিভিন্ন মানসিক চাপও হৃদপিন্ডকে অসুস্থ করে তুলে। তাই জীবনাচার হার্টবান্ধব করার পাশাপাশি দেশে সুস্থ হার্টবান্ধব সামাজিক ও কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করাও জরুরি।

 

আমরা মনে করি, হার্ট সুস্থ রাখতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও উন্নত চিকিৎসাসেবাসহ নানা বিষয়ে সরকারের সুচিন্তিত পদক্ষেপ থাকা উচিত। কী কী কারণে হার্ট অসুস্থ হয়, অসুস্থ হলে কী কী সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে এবং ওষুধ সেবনে কী ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে প্রভৃতি বিষয় সাধারণ মানুষকে সচেতন করা গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই। একইসঙ্গে হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণে থাকার পরিবেশও সৃষ্টি করতে হবে। টেনশনমুক্ত পরিবেশে কাজ করার ও জীবন-যাপনের সুযোগ অবারিত করতে হবে। নিশ্চয়তা থাকতে হবে স্বাস্থ্যকর খাবারের। ছোট মাছ, ফলমূল, শাক-সবজিসহ বিভিন্ন দেশীয় খাবারের দিকে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্যে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে।

 

ফরমালিনসহ ক্ষতিকর কেমিক্যালের ব্যবহার, ভেজাল খাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠোর পদক্ষেপ। কোমল পানীয়, এনার্জি ড্রিংকস, ফাস্টফুড-জাঙ্কফুড, ফ্রোজেন ফুড প্রভৃতির ক্ষতিকর দিক সাধারণ মানুষের সামনে নানাবিধ কর্মসূচির মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে। সুস্থ হার্টের জন্যে নিয়মিত হাঁটা জরুরি। এ জন্যে নাগরিকসাধারণের জন্যে হাঁটার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

 

পূর্বকোণ/সাফা/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট