চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১১ আগস্ট, ২০১৯ | ১২:৪৫ এএম

মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম

আমাদের কোরবানির ঈদ

পবিত্র ঈদ-উল-আজহা মুসলমানদের দুটি প্রধান ধর্মীয় উৎসবের অন্যতম। যা কুরবানীর ঈদ বা বকরি ঈদ নামে বিশেষভাবে পরিচিত। আরবা ‘আযহা’ এবং ‘কুরবানী’ উভয় শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ‘উৎসর্গ’, ‘কুরব’ ধাতু থেকে ‘কুরবানী’ শব্দটির উৎপত্তি। এর অর্থ আত্মত্যাগ উৎসর্গ বা নৈকট্য বা অতিশয় নিকটবর্তী হওয়া ইত্যাদি। ইসলামের পরিভাষায় কোরবানী বলা হয় ঐ নির্দিষ্ট প্রাণীকে যা একমাত্র আল্লাহপাকের নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ে আল্লাহপাকের নামে জবেহ করা।
প্রচলিত অর্থে কোরবানী হলো পবিত্র ঈদ-উল-আজহা উপলক্ষে জিলহজ¦ মাসের দশ থেকে বার তারিখের মধ্যে আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি লাভের জন্যে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তির নির্দিষ্ট জন্তু জবেহ করা। কোরবানী দেওয়ার মাঝে আল্লাহপাকের নৈকট্য ও সন্তুষ্টি হাসিল করা যায় বলে এর নামাকরণ। সুবহানাল্লাহ। পবিত্র আল কোরআনে ঘোষিত হয়েছে আমি প্রত্যেক জাতির জন্য কোরবানীর নিয়ম করেছি, যাতে আমি তাদেরকে জীবনোপকরণ স্বরূপ যেসব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছি, সেগুলো জবেহ করার সময় আল্লাহপাকের নাম উচ্চারণ করা। (সূত্র সূরা আল হজ¦ আয়াৎ-৩৪) ‘ঈদ উল আযহা বা কুরবানীর ঈদ সারা পৃথিবীর মুসলিমজাহানে ‘আত্মত্যাগ ও আত্মৎসর্গের দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণের তাগিদ সঞ্চারিত করে। সুবহানাল্লাহ। ইসলামে ঈদ-উল-আজহার তাৎপর্য অপরিসীম। কয়েক হাজার বছর আগে ঈদ উল আজহা পালনের ইতিহাস সূচিত হয়। এটা আনন্দ উদযাপন যেমন তেমনি ত্যাগ ও মহিমার দিন। ত্যাগ এই অর্থে যে, এদিনে সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে কোরবানী করার অবিস্মরণীয় ইতিহাস রচিত হয়েছে। সুবহানাল্লাহ। এই কোরআন বা উৎসর্গের রয়েছে অর্থবহ এক ঐতিহাসিক পটভূমি। কোরবানীর মাধ্যমে ত্যাগ ও উৎসর্গের দ্বারা আল্লাহপাকের নৈকট্য লাভ করাই মূল লক্ষ্য। উৎসর্গকারীর উদ্দেশ্যে ত্যাগ ও ধৈর্য্য, সংযম ও আত্মোৎসর্গ এবং তার কাছে উপস্থিত হয় এবং এটাই তিনি গ্রহণ করে উৎসর্গকারীর কল্যাণ ও মঙ্গল সাধন করে থাকেন। এই সম্পর্কে হুজুর পূরনূর (সা.) বলেছেন – “আদম সন্তান কোরবানীর দিন যেসব নেকির কাজ করে থাকে। তৎমধ্যে আল্লাহপাকের কাছে সবচেয়ে পছন্দীয় আমল হলো কোরবানী করা। সুবহানাল্লাহ। কিয়ামতের দিন কোরবানীর পশু তার শিং, পশম ও খুরসহ উপস্থিত হবে। এবং কোরবানীর রক্ত জমিনে পড়ার পূর্বেই তা আল্লাহপাকের কাছে কবুল হয়ে যায়। অতএব তোমরা এই পুরুষ্কারে আন্তরিকভাবে খুশী হও।’ (সূত্র তিরমিজি, ইবনে মাজা ও মিশকাত। আল্লাহপাকের প্রেমে উদ্বেলিত হয়ে যারা হালাল পশু কোরবানী করবে তাদের মঙ্গলের অধিকার সম্পর্কে হুজুর পূরনূর (সা.) বলেছেন, “ যে ব্যক্তি এই আশায় কোরবানী করে যে আল্লাহপাক তাকে জান্নাত প্রদান করবেন। তাহলে কোরবানীর পশুর প্রথম রক্তের ফোটা মাটিতে পড়তেই আল্লাহপাক তার জীবনের সমস্ত গুণাহ মাফ করে দিবেন। সুবহানাল্লাহ।
মানবজীবনে দুইটি প্রবৃত্তি আছে – একটি জীববৃত্তি আর অন্যটি বুদ্ধিবৃত্তি। পশুবৃত্তিকে সংযত রেখে বুদ্ধিবৃত্তির প্রয়োগে মানবজাতি যখন জীবনকে সুন্দর সুষ্ঠু ও সৎপথে পরিচালিত করে। তখন একে আদর্শ জীবন বলে অভিহিত করা যায়। আর এই কল্যাণময় জীবন প্রতিষ্ঠাকল্পে মানুষকে জীবনে অনেক সময় কঠিন ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। এই ত্যাগ, উৎসর্গ বা কোরবান হচ্ছে পশু প্রবৃত্তিরই কোরবান। হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর প্রাণপ্রিয় পুত্রকে কোরবানী দিতে উদ্যত হওয়ার ঐতিহাসিক স্মরণীয় ঘটনাকে কেন্দ্র করেই মুসলমানদের উৎসর্গ অনুষ্ঠান পালিত হয় এবং ঈদ-উল-আযহাতে আত্ম কোরবানীর প্রতীক স্বরূপ পশু কোরবানী দেওয়া হয়। তাই কোরবানীর আবেদন হচ্ছে মানবতাকে সঠিক মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে আল্লাহ পাকের নৈকট্য লাভের লক্ষ্যে সম্পূর্ণরূপে সৃষ্টিকর্তার কাছে আত্মসমর্পণ করা। প্রকৃতপক্ষে কোরবানীর ঈদ বা ঈদ উল আজহা আত্মশুদ্ধি আত্মতৃপ্তি ও আত্মত্যাগের এক সুমহান বার্তা নিয়ে আসে। কোরবানীর শিক্ষায় উজ্জীবিত হলে সব গুণাহ বঞ্চনা, সামাজিক অনাচার ও রিপুর তাড়না বা শয়তানী কুমন্ত্রণা থেকে নিজেদের রক্ষা করা সম্ভব হবে। মানুষের মনের মাঝে যে পশুশক্তি সুপ্ত বা জাগ্রত অবস্থায় বিরাজমান। তা অবশ্যই কোরবানী করতে হবে। বছর ঘুরে ঈদ উল আজহা মুসলিম জাহানে এসে, মুসলমান জাতির ঈমানী দুর্বলতা, চারিত্রিক কলুষতা দূর করে ত্যাগের উজ্জ্বল মহিমায় তাদের ঈমানী শক্তিকে বলিয়ান নিখুঁত ও মজবুত করে। মুসলমানগণ এই কোরবানীর মাধ্যমে সমাজে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার দীক্ষা নেন। সুবহানাল্লাহ। সমাজের বুক থেকে অসত্য অন্যায়, দুর্নীতি ও অশান্তি দূর করার জন্য নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার প্রেরণা লাভ করেন।
এই পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যথার্থই বলেছেন -“কোরবানী হত্যা নয়। সত্যগ্রহ শক্তির উদ্বোধন। আল্লাহ রাব্বুল আমাদেরকে ঈদ উল আজহার প্রকৃত মমার্থ কোরবানীর তাৎপর্য অনুধাবন করার শক্তি প্রদান করুন।
আমিন সুম্মা আমিন ওয়াচ্ছালাম।

The Post Viewed By: 185 People

সম্পর্কিত পোস্ট