চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

৯ আগস্ট, ২০১৯ | ১:০২ এএম

মুহাম্মদ মোরশেদ আলম

‘নিজগুণে ক্ষমা করবেন’ হাকিম ভাই

গত ৩০ জুলাই আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন ‘নিজগুণে ক্ষমা করবেন’ খ্যাত বরেণ্য সাংবাদিক আতাউল হাকিম। তিনি একাধারে সাংবাদিক, রম্য লেখক সর্বোপরি একজন ক্রীড়াবিদ ছিলেন। নব্বইয়ের শেষের দিকে শ্রদ্ধেয় নওশের আলী খান (চিফ রিপোর্টার, দৈনিক পূর্বকোণ) যখন আমাকে দৈনিক নয়াবাংলায় যোগদানের সুযোগ দিয়ে সাংবাদিকতা পেশায় নিয়ে এলেন তখন থেকেই হাকিম ভাইয়ের সাথে পরিচয়। এর আগে দৈনিক আজাদী ও দৈনিক পূর্বকোণে তাঁর লেখা, বিশেষ করে রম্য রচনাগুলো পড়ে বেশ মজা পেতাম। যেহেতু আমি নিজেও একজন স্পোর্টসম্যান ছিলাম সেই সুবাদে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সদস্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্লাবের সিনিয়র-জুনিয়র সকলের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিশেষ করে হাকিম ভাই আগে থেকেই প্রেস ক্লাব বার্ষিক ক্রীড়ায় ব্যাডমিন্টন ও টেবিল টেনিসে একক ও দ্বৈতে রাজত্ব করছিলেন। তাঁর পার্টনার ছিলেন তারই এক সময়ের সহকর্মী শহীদুল ইসলাম বাচ্চু (বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী)। ক্যারমও ভালো খেলতেন। আমি শুরুতেই ব্রিজ, দাবা ও ক্যারমে দ্বৈতে রানার্স আপ হয়ে সবাইকে চমকে দেই। সেই থেকে প্রেস ক্লাবে দেখা হলে হাকিম ভাই বলতেন, ‘আঁরার নিয়াজ মোরশেদ’।
হাকিম ভাইয়ের সঙ্গে পূর্বকোণে প্রায় দেড় বছর কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। এ অল্প সময়ের দু’টি ঘটনার কথা উল্লেখ করব। একদিন সন্ধ্যায় অফিসে ঢুকতেই হাকিম ভাই বললেন, ‘মোরশেদ, চলো তোমাকে নিয়ে একটু বের হব।’ তিনি আমাকে নিয়ে পূর্বকোণের বাইরে এসে একটা রিকশায় উঠলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোথায় যাচ্ছি?’ তিনি উত্তর দিলেন না। রিকশা গিয়ে থামল মিষ্টির দোকান বনফুলের (শপিং কমপ্লেক্সের বিপরীতে) সামনে । বনফুল থেকে একটা ২ পাউন্ডের পেস্ট্রি কেক কিনে পুনরায় ওই রিকশায় আমরা পূর্বকোণ ডেস্কে ফিরে এলাম। তখনও আমার কৌতুহলের শেষ নেই। তিনি ডেস্কের সবাইকে তাঁর টেবিলের সামনে ডেকে বললেন, ‘আজ অমাদের ওমর সাহেবের (প্রয়াত আ জ ম ওমর) বিবাহবার্ষিকী।’ ওমর ভাইকেও ডাকলেন। তারতো চোখ ছানাবড়া। সবাই মিলে কেক কাটা হলো। হাকিম ভাই কেকের টুকরো তুলে দিলেন ওমর ভাইয়ের মুখে। আমরা হাততালি দিয়ে উইশ করলাম। এই হলেন আমাদের হাকিম ভাই। যারাই তাঁর সন্নিধ্যে এসেছেন তারাই বলতে পারবেন কত প্রাণবন্তু মানুষ ছিলেন তিনি। যেখানেই যেতেন আড্ডায় মাতিয়ে রাখতেন। নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে সবাইকে চা-নাস্তা করাতেন। এ ধরনের আরো কিছু মানুষ যেমন সুফিয়ান ভাই, আব্বাস ভাই (প্রেস ক্লাব সভাপতি), নাসির ভাই (এম নাসিরুল হক), মোয়াজ্জেম ভাই আছেন, এরা যেখানেই যান আড্ডা জমে ওঠে। প্রয়াতদের মধে ছিলেন শ্রদ্ধেয় আখতারুন্নবী, নূর মোহাম্মদ রফিক প্রমুখ।
হাকিম ভাইকে কেউ কি কখনো রাগাতে দেখেছেন? মনে হয় না। তবে আমরা একবার দেখেছি। ঘটনাটা বলি। একদিন সন্ধ্যায় পূর্বকোণে উনি নিজের চেয়ারে বসে আছেন। পাশে আমরা কয়েকজন এডিটোরিয়াল ডেস্কে কাজ করছি। হঠাৎ দেখলাম হাকিম ভাই একজন তরুণকে চিৎকার করে বলছেন, ‘বের হও, এ মূহূর্তে বের হও’। ততক্ষণে হাকিম ভাই দাঁড়িয়ে গেলেন, ক্রোধে তাঁর ফরসা চেহারা লাল হয়ে আছে। ওই তরুণটি ততক্ষণে চেয়ার ছেড়ে দরজা দিয়ে পালিয়ে গেল। শিফট ইনচার্জ ওমর ভাই (প্রয়াত আ জ ম ওমর) জিজ্ঞেস করলেন, ‘ব্যাপার কি?’ উত্তরে হাকিম ভাই বললেন, ‘ব্যাটা আমাকে দাওয়াত দিতে এসেছে, আর আমাকে কিনা জিজ্ঞেস করে স্যার, আপনার নামটা কি একটু বলবেন কার্ডে লেখার জন্য। আমাকে দাওয়াত দিতে এসেছে অথচ আমার নাম জানে না। এরচেয়ে বড় অপমান আর কি আছে?’ যা হোক এটা ছিল একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা।
ভোট আসলে অনেক মজা করতেন হাকিম ভাই। আমি একবার স্পোর্টস সেক্রেটারি পদে দাঁড়িয়েছি। একদিন ক্লাবে দেখলাম তিনি আর ও শ্রদ্ধেয় স. ম. আতিক সোফায় বসে আছেন। আমি তাদের জন্য চা-সিঙ্গারার অর্ডার দিলাম। তিনি তৎক্ষণাৎ বললেন, চা-সিঙ্গারায় হবে না। আমার গায়ে যে নতুন সার্টটি দেখছ, সেটি ফারুক দিয়েছে। তুমি কি দেবে? বলেই হা হা করে হাসতে লাগলেন। বলাবাহুল্য নির্বাচনে মো. ফারুক ছিলেন আমার প্রতিদ্বন্দ্বী।
প্রেস ক্লাব ও সিইউজে আয়োজিত হাকিম ভাইয়ের শোকসভায় গিয়েছিলাম। সহযোদ্ধারা তাকে নিয়ে অনেক স্মৃতিচারণ করলেন। হাকিম ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের অভয় বাণী শোনালেন নেতারা। বললেন, তোমাদের পাশে আমরা সব সময় আছি, থাকব। এর আগে নবী ভাই, ওমর ভাইসহ অনেকের শোক সভায় এ ধরনের আশ^াস শুনেছি। শোকসভায় হাকিম ভাইয়ের ছেলে বলেছেন, ‘আমার বাবা ব্যাংকে কিংবা কোনো বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকুরি করলে হয়তো অনেক বেশি বেতন পেতেন, সচ্ছলভাবে চলতে পারতেন। কিন্তু এভাবে সম্মান পেতেন না। মুত্যুর পরও আজ আপনারা তাকে যেভাবে মূল্যায়ন করলেন, সম্মান জানালেন তা আমাদের কাছে অনেক বড় পাওয়া।’
হ্যাঁ, যথার্থই বলেছে ছেলেটি। আমাদের অভাব আছে, দুঃখ আছে, হতাশা ও ক্ষোভও আছে। এরপরও সংবাদপত্র শিল্প একজন সংবাদিককের জন্য যা দিয়েছে তা হচ্ছে তাঁর ‘ওফবহঃরঃু’। হলুদ সাংবাদিকতার বিপক্ষে হাকিম ভাইয়ের মত একজন সৎ সাংবাদিকের জন্য এ পরিচয় অনেক মর্যাদাকর, যা তার ব্যাংকারপুত্র অকপটে স্বীকার করে নিলেন।
৩১ জুলাই হাকিম ভাইকে স্মরণ করে শহীদুল ইসলাম বাচ্চু ‘আমার শিক্ষক’ শিরোনামে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছেন। দীর্ঘ স্ট্যাটাসের শেষ দিকে তিনি লিখেছেন, ‘আমি ২০১০ সালে আমেরিকায় চলে আসার পর একবারও কথা হয়নি হাকিম ভাইয়ের সাথে। কতদিন ভেবেছি, কিন্তু কথা হয়নি। অসুস্থ ছিলেন জানতাম। কিন্তু এভাবে চলে যাবেন কল্পনাও করিনি। তীব্র এক আফসোস আমাকে আজ বারবার খোঁচা দিচ্ছে। প্রায় ১০টি বছর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।’
বাচ্চু ভাইতো সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে। আর আমরা যারা এই শহরে আছি তারা ক’জনই বা হাকিম ভাইয়ের খবর রেখেছি। আমিতো নিজেই একই গলিতে থেকেও ঈদেও যাইনি একটু দেখা করতে। নিজেকে আজ অপরাধী মনে হচ্ছে। আমরা ক্রমান্বয়ে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি। ছুটে চলেছি অবিরাম। নিজের পরিবার ছাড়া কারো খোঁজখবর নেয়ার ফুরসত নেই। যাও ছিটেফোঁটা খবর নেই নিজের স্বার্থের জন্য। এটাই রূঢ় বাস্তবতা।
হাকিম ভাই, আপনি আজ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আপনার কাছে ক্ষমা চাই। আশা করি, নিজগুণে ক্ষমা করবেন। মহান রাব্বুল আলামিন আপনাকে জান্নাতবাসী করুন। আমিন।

The Post Viewed By: 211 People

সম্পর্কিত পোস্ট