চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

সর্বশেষ:

২৪ জুলাই, ২০১৯ | ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ

রেজা মুজাম্মেল

স্বাস্থ্যহানিকর ধূমপান এবং জনসচেতনতা

সিগারেটের প্যাকেটে ভয়াবহ একটি দৃশ্য থাকে। এটি সচরাচর সবার দৃষ্টিতে পড়েই। এই দৃশ্য দেখে হৃদরোগীরা জ্ঞান হারানোর সম্ভাবনা থাকে। ভয় পেতে পারে কোমলমতি শিশুরা। অভিন্ন শঙ্কা থাকে বৃদ্ধদের ক্ষেত্রেও। তবে বিষ্ময়কর বিষয় হলো- ধূমপায়ী কিন্তু এই ছবি দেখে দেখেই অবলীলায়, সহাস্যে ধূমপান করে যাচ্ছেন। নিজের মধ্যে হয়তো ধূমপানের ভয়াবহতা নিয়ে এতটুকু ভ্রুক্ষেপ নেই, হয়তো নেই কোনো অনুশোচনাও। ধূমপান করে আসছি, তাই করছি এবং আগামীতেও করব গোচের চিন্তা-ভাবনা। এ চিন্তা-চেতনায় নিজে তো বটেই, সঙ্গে নিজের পরিবারের ছোট্ট সেই শিশু, পরিবারের অপরাপর সদস্য এবং আশপাশে থাকা মানুষদেরও সমানভাবে ক্ষতি করে চলেছেন। তবুও কেন ধূমপান? প্রশ্নটি সহজ হলেও খানিকটা কঠিনও বলা যায়।
দুই. ধূমপানের ভয়াবহতা নিয়ে কমবেশি সকলেই অবগত। এ নিয়ে নানা কথা, আলোচনা ও সমালোচনা প্রতিনিয়তই হয়ে থাকে। কিন্তু ধূমপানকারীর সংখ্যা কমছে বলে মনে হয় না। পক্ষান্তরে, প্রতিবছরই বাজেটের সময় সিগারেটসহ তামাক জাতীয় নানা পণ্যের ওপর কর বৃদ্ধি করা হয়। তবুও ধূমপায়ীদের সংখ্যা কমছে না, বরং জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। তবে ভয়াবহ ও চরম আশঙ্কার বিষয় হলো মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদেরও ধূমপান করতে দেখা যাওয়া। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তো আছেই। কারণ শিক্ষার্থীদের হাতে ধূমপান এবং তামাকজাত পণ্য বড়ই বেমানান।
তিন. দূর অতীতে ধারণা করা হতো, দেশের অনেক মানুষ ধূমপান বা তামাকজাত পণ্য ব্যবহারের কুফল বা ভয়াবহ পরিণতির কথা জানে না। তাই তারা ধূমপান করছে। দূর অতীত সময়ের অবস্থান, প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এ কথা হয়তো মানার মত ছিল। কিন্তু এখন দেশে শিক্ষিতের হার প্রতিনিয়তই বাড়ছে। (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৮ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিসাব মতে, দেশে স্বাক্ষরতার হার ৭২ দশমিক ৯ শতাংশ) শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল- সর্বত্র শিক্ষার আলোয় আলোকিত হচ্ছে। এটি অবশ্যই দেশের অগ্রগতির ইতিবাচক দিক। তাই ক্রমশ ধূমপায়ীর সংখ্যা কমার একটা ধারণা ছিল অনেকের। কিন্তু না। এ চিন্তা-চেতনা সুদূরপরাহত। বরং এখন শিক্ষিত তরুণ, কিশোর, আবাল বৃদ্ধ- সব বয়সী ও শ্রেণী-পেশার অনেকেই ধূমপান করছেন।
চার. তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার এবং এর অবস্থান নিয়ে দু’টি জরিপ প্রতিবেদন এখানে প্রণিধানযোগ্য। দু’টিই সাম্প্রতিক সময়ে দু’টি উন্নয়ন সংস্থা প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব থিয়েটার আর্টস (বিটা) এর উদ্যোগে ‘চট্টগ্রাম শহরের তামাক বিক্রয় কেন্দ্রসমূহের তামাকের বিজ্ঞাপন, প্রণোদনা গবেষণা’ শীর্ষক জরিপ পরিচালিত হয়। জরিপটি গত এপ্রিল মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে। এর আগে ২০১৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর এবং ৬ অক্টোবর থেকে ৯ অক্টোবর নগরের এক হাজার বিক্রয়কেন্দ্রের ওপর এ জরিপ পরিচালনা করা হয়। জরিপের ফলাফল মতে, ‘চট্টগ্রাম মহানগরের ৪১টি ওয়ার্ডে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়কেন্দ্র আছে ১৬ হাজার ৫৯টি। এর মধ্যে লাইসেন্সবিহীন বিক্রয়কেন্দ্র আছে ১১ হাজার ৪৬২টি। রাস্তার পাশে তামাকজাতপণ্য বিক্রয়কেন্দ্র আছে ৩ হাজার ৩৯৪টি, তামাক বিক্রয় হয় এমন চায়ের দোকান ৪ হাজার ৩০টি। তাছাড়া ৫ হাজার ৮৭৯টি ক্ষুদ্র মুদি দোকান, ৯২৪টি সুপার মার্কেট, ৬৬৭টি তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়কেন্দ্র, ১৯৬টি রেস্টুরেন্ট এবং ৬৯৪টি ভাসমান বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকজাতদ্রব্য বিক্রয় করা হচ্ছে। জরিপে আরো বলা হয়, ৮৮৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০০ গজের মধ্যে তামাকপণ্য বিক্রয়কেন্দ্র ৫ হাজার ৫৩৬টি, ১০০ গজের মধ্যে তামাকজাতপণ্য বিক্রি হওয়া হাসপাতাল ১৬২টি, তামাকজাতপণ্য বিক্রিতে নিয়োজিত ১৮ বছরের কম বয়সী ৬৪৬ জন ও বিক্রয়স্থলে দৃশ্যমান বিজ্ঞাপন দেখা গেছে ১২ হাজার ১৬৫টি বিক্রয়কেন্দ্রে।’ জরিপের ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেছিলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি চসিকের সকল শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ১০০ গজের মধ্যে কোনো তামাকজাত পণ্য বিক্রয় করা যাবে না। থাকলে সেগুলো অবশ্যই উচ্ছেদ করা হবে। তাছাড়া ট্রেড লাইসেন্সবিহীন কোন দোকান থাকলে সেগুলো লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে।’ তবে এ ব্যাপারে এখনো কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি বলেই মনে হয়।
দ্বিতীয় জরিপটি ছিল ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডসের (সিটিএফকে) সহযোগিতায়, ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা) ‘বিগ টোব্যাকো টিনি টার্গেট ঃ বাংলাদেশ’ শীর্ষক। গত ২৬ মে আনুষ্ঠানিকভাবে জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে। জরিপে দেখা যায়, ‘চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটি জেলার ৯০ শতাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও খেলার মাঠের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকপণ্যের বিক্রয় কেন্দ্র আছে। গড়ে ৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও খেলার মাঠে এ সীমার মধ্যে তামাকপণ্য বিক্রিয় করা হচ্ছে। ৭৭ শতাংশ বিক্রয় কেন্দ্রে শিশুদের চোখের সমান্তরালে (১ মিটার) তামাকপণ্য প্রদর্শিত হচ্ছে এবং ৩৩ শতাংশ বিক্রয় কেন্দ্রে চকলেট, মিষ্টি বা খেলনার পাশে তামাকপণ্য দেখা গেছে। ৪০টি নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও খেলার মাঠে এ জরিপ পরিচালিত হয়।’ জরিপ মতে, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও খেলার মাঠের ১০০ মিটারের মধ্যে ৯৬ শতাংশ বিক্রয় কেন্দ্রে তামাক পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হচ্ছে। ৮৪ শতাংশ বিক্রয় কেন্দ্রে তামাকপণ্যের স্টিকার, ডেমো প্যাকেট, ফেস্টুন, ফ্লায়ার প্রদর্শনের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। ১৪ শতাংশ বিজ্ঞাপন হচ্ছে পোস্টারে, ১ শতাংশ হচ্ছে ছাতায় তামাক কোম্পানির ব্রান্ডিং এবং ১ শতাংশ বিলবোর্ডোর মাধ্যমে। ৯৮ শতাংশ বিক্রয় কেন্দ্রে একক শলাকা সিগারেট বিক্রি করায় শিশুরা টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে ধূমপান করছে। এ ছাড়া তামাকপণ্য বিক্রিতে প্রণোদনামূলক কার্যক্রম, উপহার ও মূল্যছাড় দেওয়া হয়।’ উপরের দু’টি জরিপ প্রতিবেদনেই ধূমপানের অবস্থান, শিক্ষা-স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক ধূমপান বিক্রির অবস্থা, ধূমপায়ীর বয়সসহ নানা চিত্র উঠে এসেছে।
পাঁচ. তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩) এর ধারা ৫ মতে, কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান প্রিন্ট বা ইলেক্ট্রিক মিডিয়া, বই, লিফলেট, পোস্টার, ছাপানো কাগজে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন, প্রচারণা ও পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারবেন না। কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই ধারা লংঘন করলে অনুর্ধ ৩ মাস কারাদন্ড বা অনধিক ১ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দ-ে দ-িত হইবেন। পক্ষান্তরে, সরকার ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ধুমপানমুক্ত দেশ করার অঙ্গীকার প্রকাশ করেছে। এ ব্যাপারে আইনও আছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
অভিযোগ আছে, ধূমপানের প্রচারণা, পৃষ্ঠপোষকতা ও বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ থাকলেও তা মানছে না কেউ। নগর জুড়ে প্রশাসন, আদালত, হাসপাতাল, ক্লিনিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দেদারসে ধূমপান করা হয়। সঙ্গে থাকে বিজ্ঞাপনও। এ নিয়ে প্রশাসনের মাঝে মাঝে অভিযান থাকলেও তা যথেষ্ট অপ্রতুল বলে ঠেকে। বলা যায়, এ ব্যাপারে যথাযথ ও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। ফলে ধূমপানকারীরা যেখানে-সেখানে তা পান করছে। তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন ও ব্যবহার বন্ধে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) যদি প্রয়োজনীয় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তাহলে বিষয়টির ভয়াবহতা কমত। সম্পূর্ণ নিমূল না হলেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো।
ছয়. ধূমপানের কারণে কারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এ নিয়ে চিকিৎসকদের গবেষণামূলক বক্তব্য থাকতে পারে। কিন্তু সাধারণ দৃষ্টিতে বলা যায়, ধূমপানে অতিমাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু এবং কিশোররা। বাসায় ধূমপান করে নিজের চোখের সামনে দেখে দেখে নিজের সন্তানের ক্ষতি সাধন করা হচ্ছে। এটি বড় নির্মম হলেও বাস্তব। কিন্তু কেন? কেন আমরা নিজেই নিজের সন্তানের ক্ষতি করছি। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে ভাবা উচিত। ধূমপানের নেতিবাচক দিক এবং কুফলসমূহ জানতে হবে সকলকেই এবং সেটি আমাদেরই প্রয়োজনে, প্রজন্মের স্বার্থে। অতএব আর নয় ধূমপান। সুস্থ থাকুক আমাদের সন্তান। ভাল থাকুক আগামীর প্রজন্ম। সুন্দর হোক ভবিষ্যত স্বপ্ন।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 432 People

সম্পর্কিত পোস্ট