চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

২৩ জুলাই, ২০১৯ | ১:০৫ পূর্বাহ্ণ

মোহাম্মদ খালেদ বিন চৌধুরী

সিডনীতে সন্তানদের স্কুলে ভর্তি

অস্ট্রে লি য়াতে কেউ স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে পড়তে যেতে চাইলে ও স্কুলে যাবার মত ছেলে মেয়ে সাথে নিয়ে যেতে চাইলে, তাদের ভর্তি সংক্রান্ত সব কাজ আগে শেষ করে তবেই ভিসার জন্য আবেদন করতে হয়। আপনার স্কুলে ভর্তি করানোর বয়সী সন্তান নিয়ে অস্ট্রেলিয়া যাবেন, কিন্তু স্কুলে ভর্তি করাবেন না, তেমন বাচ্চার জন্য ভিসা চাইলে ইমিগ্র্যাশন ডিপার্টমেন্ট আপনাকে ভিসা দিবে না। এমনকি প্রতিবন্ধী বাচ্চা হলে ও বিশেষায়িত স্কুলে ভর্তি করিয়েই তবে ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে। এসব কাজ দেশে থেকেও করা যায়। একেবারে নিজে নিজে। আমি নিজে নিজে কোন এজেন্সির সহায়তা ছাড়া আমাদের পাঁচজনের জন্য অস্ট্রেলিয়ান ভিসার এপ্লাই করেছি।
চট্টগ্রাম এর একটি এজেন্সি আমাদের পাঁচ জনের ভিসা সাপোর্ট এর জন্য দেড় লক্ষ টাকা চেয়েছিল। নিজে করতে গেলে আপনার যা দরকার তা হল, ইংরেজির দক্ষতা, একটু আই টি দক্ষতা এবং যদি সে দেশে কোন ফি জমা করতে হয়, তবে সেটি পাঠানোর সুযোগ। ভর্তির নিয়ম হল আপনি যে স্টেইট এ ভর্তি করাবেন, সেই স্টেইট এর শিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইট থেকে ফরম নিয়ে ও এক সেশন এর সেশন ফি জমা করে ভর্তির কনফার্মেশন লেটার এনে ভিসার দরখাস্তের সাথে জমা দিতে হয়। এসব আপনি ঘরে বসে ও করতে পারেন। আমি ঘরে বসেই তা করেছি। তবে হ্যাঁ, যারা অস্ট্রেলিয় সরকারের অথবা অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি নিয়ে পড়তে যায়, তারা ভাগ্যবান। তাদের সন্তানদের কোন টিউশন ফি দিতে হয়না। তাছাড়া, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে যারা ‘স্কিল মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম’ এর আওতায় অস্ট্রেলিয়া যায়, তাদের সন্তানরাও বিনা বেতন এ সরকারি স্কুলে পড়তে পারে। কিন্তু আমার স্ত্রী যেহেতু বাংলাদেশ সরকারের বৃত্তি নিয়ে পড়তে গেছে তাই আমার তিন সন্তানের টিউশন ফি জমা দিয়ে ভিসার কাজ করতে হয়েছে । আট-নয় মাসে বাংলাদেশী প্রায় ৫/৬ লাখ টাকা দিতে হয়েছে। মূলত, অস্ট্রেলিয়াতে ‘ভিসা সাব-ক্লাস’ অনুসারে সন্তানদের পড়াশুনার খরচে বিশাল পার্থক্য হয়ে থাকে।
আগেই বলেছি , স্টুডেন্ট যে এলাকায় বসবাস করেন, সে এলাকায় কোন স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করাতে হয়। তাই স্কুলে ভর্তি করানোর আগে বাসা কোথায় পাচ্ছি, সেটাই বিবেচ্য বিষয়। আমি যেখানে বাসা পেলাম, তার চেয়ে উপযুক্ত জায়গা আর কেউ সিডনী শহরে প্রথম ভাড়াটিয়া হিসেবে কেউ পেয়েছে কিনা সন্দেহ। এ বাসা খুঁজে দেয় এবং নেবার বাবস্থা করে দেয় আমার খালাত শ্যালক মিজান। তাঁর কাছে আমি ও আমার পরিবার অত্যন্ত ঋণী।
আমি আগের এপিসোডে বলেছি যে, সিডনি শহরে নতুন প্রবাসী হিসেবে বাড়ি ভাড়া পাওয়া কত খানি যে কষ্টের ব্যাপার, তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। আমি ইয়াসমিন এর খালাত ভাই, মিজান ভাই এর সহায়তায় যে বাসা পাই, তা থেকে প্রাইমারি স্কুল এক মিনিট আর হাই স্কুল তিন মিনিটের হাঁটা দূরত্বে। দুটিই সরকারি বিদ্যালয়। আমি দুই মেয়েকে সরকারি প্রাইমারি স্কুল-এ ভর্তি করাই। দু’মাস আগের বাংলাদেশের বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে পরের ক্লাস-এ তারা ভর্তি হল। সেখানে কোন সমস্যা হয়নি। বড়জনকে হাই স্কুল-এ ভর্তি করাতে গিয়ে ভিন্ন অভিজ্ঞতা হল। তাকে নবম শ্রেণীর ফলাফল এর ভিত্তিতে দশম শ্রেণীতে ভর্তি করানো যাচ্ছে না । করাতে হবে নবম বা অষ্টম শ্রেণীতে। তাও আবার প্লেইসমেন্ট টেস্ট দিয়ে প্লেইসমেন্ট টেস্টএর রেজাল্ট এর উপর ভিত্তি করে। এই টেস্ট-এ ইংরেজি ও গণিত বিষয়ের দক্ষতা যাচাই করা হয়। এই টেস্ট-এ ভাল না করলে ওকে অষ্টম শ্রেণীতেই ভর্তি হতে হবে।
এ প্লেইসমেন্ট টেস্ট সব স্কুল-এ নেয়া হয় না। ক্লাস্টার ভিত্তিক ১০-১৫ টি স্কুল মিলে যে কোন একটি স্কুল-এ এই পরীক্ষা নেবার ব্যবস্থা থাকে। সংশ্লিষ্ট স্কুল সেই স্কুল-এর সাথে কথা বলে টেস্ট এর জন্য দিন নির্ধারণ করে। যথারীতি মেয়েকে নিয়ে টেস্ট এর দিন সকাল ১০ টার মধ্যে সেই স্কুলে গিয়ে হাজির হলাম। যাবার সময় ইয়াসমিনের মামাত ভাই মাহদি গাড়িতে করে আমাদের বাপ মেয়েকে পৌঁছে দিলেন। তাঁর জরুরি কাজ থাকার কারণে আমাদের পৌঁছে দিয়ে চলে গেলেন। আমি স্কুলে পৌঁছে মেয়ের নাম-ঠিকানা রিসেপ্সন-এ এন্ট্রি করার পর এক ভদ্রলোক আসলেন। ৫০-৫৫ বয়স হতে পারে। মেয়েকে ডেকে নিয়ে গেলেন। ৩৫-৪০ মিনিটের মধ্যে মেয়ে পরীক্ষা দিয়ে বের হল। এর কিছুক্ষণ পর পরীক্ষক আমার কাছে এসে আমাকে ও মেয়েকে অভিনন্দন জানিয়ে ফলাফল জানালেন। সে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হতে পারবে। ভদ্রলোককে দেখে ব্রিটিশ অরিজিন এর বলে মনে হল। বিদায় নেবার সময় আমি তাঁর কাছ থেকে জানতে চাইলাম বাসে করে বাসায় ফেরত আসার কোন উপায় আছে কিনা। উনি বললেন, তা সময় সাপেক্ষ এবং দুইটি বাস বদলাতে হবে। তবে স্কুলের বিকল্প গেইট ধরে গেলে যাত্রা সহজ হবে। তিনি সৌজন্যতাবশত আমাদেরকে স্কুলের বিকল্প গেইট দেখিয়ে দেবার জন্য ২/৩ মিনিট হেঁটে আমাদের সাথে এলেন। সেই গেইট সাধারণত বন্ধ থাকে। কার্ড পাঞ্চ করে খুলতে হয়। উনি না এলে স্কুল-এর মূল গেইট দিয়ে অনেক ঘুরে আমাদের বের হতে হত। বিকল্প গেইট ধরে যাবার কোন উপায় ছিলনা। ভদ্রলোককে তাঁর সৌজন্য-এর জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম।
এই শিক্ষকের সৌজন্য অনুকরণীয় এ কারণে যে, তিনি আমার ব্যক্তিগত গাড়ি না থাকার কথা জেনে আমাকে সংক্ষিপ্ত পথ দেখিয়ে দিতে এসে আমাকে আর আমার মেয়েকে কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করলেন। আমার মেয়ে এই স্কুলের শিক্ষার্থী নয়, আমরা গিয়েছি প্লেইসমেন্ট টেস্ট-এ অংশ নিতে। তা সত্বেও, তিনি যে সৌজন্য ও আন্তরিকতা দেখালেন, তা একজন শিক্ষক হিসেবে আমার নিজের কাছে ও অনুকরণীয় হয়ে রইল।
অস্ট্রেলিয়া তে জাতীয় পর্যায়ে ৩, ৫, ৭, ৯ এই বেজোড় ক্লাসগুলোতে ন্যাপ্লান নামে একটি পরীক্ষা হয়ে থাকে। এ পরীক্ষাতে গণিত, ইংরেজি ও ক্রিটিকেল এনাল্যাইসিস-এর দক্ষতা যাচাই করা হয়। এই ন্যাপ্লান এর ফলাফল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া হয়। স্বল্প সময়ের জন্য পড়তে গেলেও আমার মেয়ে এ পরীক্ষা দেবার সুযোগ পেয়েছিল, যা সত্যিই ভাগ্যের বিষয়। আরও আনন্দের বিষয় হল, ভর্তি হবার দু’মাসের মধ্যে সে এই ন্যাপ্লান পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে পাশ করে গেল।

লেখক : প্রধান, ইংরেজি বিভাগ, বি জি সি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 401 People

সম্পর্কিত পোস্ট