চট্টগ্রাম রবিবার, ০৭ মার্চ, ২০২১

২২ জুলাই, ২০১৯ | ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী

কভারতে আজমগড়ী হযরতের যেয়ারত

কালান্তরে দৃষ্টিপাত

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
এরই মধ্যে আমরা ৩ জনের জন্য রাতের খাবারের আয়োজন করা হয় বুঝতে পারি। রাতের খাবার হয়ে গেলে ডা.আবদুল বারী আমাদেরকে তাদের সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেহমান খানায় পৌঁছে দেন রাতে অবস্থানের জন্য। রাতের খাবারকালীন ডা. বারী আমাদের পরবর্তী প্রোগ্রাম জেনে নেন। আমরা সকালে গুন্ডা থেকে লক্ষেèৗ যাব। লক্ষেèী ঘুরে ফিরে বিকেলে শতাব্দী এক্সপ্রেস ট্রেনে আমাদের দিল্লি গমনের জন্য টিকেট করা আছে বললাম। তখন ডা. বারী ফজরের নামাজ পড়ে তাদের ঘরে আসতে বলেন। আমরা ফজরের নামাজের পর পর আবার আজমগড়ী হযরতের যেয়ারতে যাই। যেয়ারতের পর সরাসরি ডা. বারীর কাছে চলে আসি। তখন তিনি ফজরের নামাজের পর বৈঠকখানায় আমাদের অপেক্ষায় ছিলেন। আমাদেরকে চা নাস্তা দিয়ে আতিথেয়তা করেন। আমরা বারে বারে চেষ্ঠা করলেও কোন হাদিয়া নিলেন না। এমনকি রাতে অবস্থান করা কক্ষ ভাড়াও না। ডা. বারী পরামর্শ দিলেন, সকাল ৭টা ২০ মিনিটে গুন্ডা থেকে ১৩০ কি.মি দূরত্বে লক্ষেèৗ গমন করতে একটি ভাল মানের ট্রেন আছে। ঐ ট্রেনটি আমাদের জন্য উত্তম হবে। এতে আমরা বিলম্ব না করে টেক্সী নিয়ে ৩/৪ কি.মি দূরত্বে ট্রেন স্টেশনে চলে যাই। গুন্ডা উত্তর প্রদেশের বিভাগীয় শহর। জিগর মেমোরিয়াল কলেজসহ আজমগড়ী হযরতের জামাতার এ এরিয়া অনেকটা মুসলিম অধ্যুষিত। ঘন ঘন ৫/৭ টি মসজিদ রয়েছে। তবে মান সম্পন্ন আবাসিক হোটেল রেস্টুরেন্ট নেই।
আমরা গুন্ডা ট্রেন স্টেশনে পৌঁছে সাধারণ টিকেট কেটে ২/৩ ঘণ্টার যাত্রায় লক্ষেèৗ রওনা হয়ে যাই। লক্ষেèৗতে ঘুরে ফিরে বিকেলে শতাব্দী এক্সপ্রেস ট্রেনে দিল্লি রওনা হই। দিল্লিতে যেয়ারতে সময় কাটাই । সেরহিন্দ ও আজমীর গমন করি।
২য় বার যেয়ারতে গমন: ৫ বছরের ব্যবধানে ২০০২ খ্রিস্টাব্দে ১০ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ভাগিনা হাসানকে নিয়ে বাংলাদেশ বিমানে চট্টগ্রাম থেকে কলকাতা রওনা হই। আগের বারের মত আলমগীর সাহেবের মধ্যস্থতায় কলকাতা অমলেন্দু বাবুর মাধ্যমে ট্রেনের টিকেট সংগ্রহ করি। কলকাতা যেয়ারতে সময় কাটাই। পরদিন বুধবার সকালে ফুরফুরা গমন করি। সন্ধ্যায় হোটেল ছেড়ে দিয়ে হাওড়া ট্রেন স্টেশনে চলে যাই। যেহেতু আগের বারের মত আমাদের ট্রেন রাত ৮ টায় দূন এক্সপ্রেসে। বড় ব্যাগ নিয়ে হাওড়া ট্রেন স্টেশনে পৌঁছার সাথে সাথে ট্রেনের টিকেটের ৩/৪ জন দালাল আমাদের ঘিরে ধরে। জানতে চায় আমরা কোথায় যাব ! তাদের থেকে জানতে পারলাম দূন এক্সপ্রেস বাতিল। ২ দিন আগে কলকাতা থেকে দিল্লিগামী রাজধানী এক্সপ্রেস রাতে একটি নদীর উপর ব্রীজ ভেঙ্গে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পড়ে। ৭০/৮০ জন যাত্রী মারা যায়। তৎমধ্যে বাংলাদেশী যাত্রীও। এতে ট্রেনের সিডিউল এলোমেলো হয়ে যায়। তখন দালালেরা জানতে চায় আমাদের গন্তব্য কোথায়! আমরা উত্তর প্রদেশের গুন্ডায় যাব বলায় দালালের একজন দৌঁড়ে কোথায় চলে যায়। ৪০/৫০ সেকেন্ডের ব্যবধানে ফিরে এসে জানান গুন্ডা গমনের টিকেট দেয়া যাবে। রাত ১০ টায় দৈনিক ভিত্তিতে হাওড়া থেকে গুন্ডা-লক্ষেèৗ হয়ে কাঠগুদাম (কধঃযমড়ফধস) এক্সপ্রেস রয়েছে। যে ট্রেনের সর্বশেষ গন্তব্য কাঠগুদাম। যা শৈল শহর ননীতালের নিকটে সমতলে। এ রকম গুন্ডা গমনে সরাসরি ট্রেন থাকার কথা আমার জানা ছিল না।
ফলে দ্বিতীয়বার গুন্ডা গমনেও দূন এক্সপ্রেসের টিকেট খরিদ করেছিলাম। কিন্তু কাঠগুদাম এক্সপ্রেস যে পথ দিয়ে যাবে ভাঙ্গা ব্রীজ সে পথে নয়। ভারতে ট্রেনের তৎকাল টিকেটের চড়া দাম দেয়ার পরেও আমাদের থেকে অতিরিক্ত জন প্রতি ১ হাজার রূপি করে নিল। আমাদের দূন এক্সপ্রেসের টিকেটগুলো দালারেরা নিয়ে গেল টিকেটের মূল্য সমন্বয় করে। আমাদের মনে কিছুটা সন্দেহ থাকায় দালালেরা মাত্র ২ ঘণ্টার ব্যবধানে রাত ১০ টার কাঠগুদাম এক্সপ্রেস ট্রেনের অঈ ঞড়ি ঞরবৎ ঝষববঢ়বৎ এ বসিয়ে দিল। আমি নিচে ভাগিনা হাসান উপরে। ট্রেনের সেবক আমাদেরকে জন প্রতি দু’টি চাদর ,একটি বালিশ,একটি কম্বল,একটি টাওয়েল দিয়ে যায়। যে গুলো ধোফা থেকে আনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মানসম্পন্ন। যথা সময়ে ট্রেন ছেড়ে দিল। পর দিন রাত ৯ টায় প্রায় ২৩ ঘণ্টা পর আমরা গুন্ডা ট্রেন স্টেশনে পৌঁছার প্রোগ্রাম। প্রায় ২ ঘণ্টা বিলম্বে অতি বৃষ্টির ভিতর আমরা গুন্ডা ট্রেন স্টেশনে নামি। গভীর রাত প্রচন্ড বৃষ্টি, ৩/৪ কি.মি দূরত্বে আজমগড়ী হযরতের মেয়ের শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার সাহস হচ্ছিল না। ফলে অনন্য উপায় হয়ে ট্রেন স্টেশনে জবঃরৎরহম ৎড়ড়স তালাশ করতে থাকি। ভারতের বড় বড় স্টেশনগুলোতে ট্রেন যাত্রীদের সাময়িক অবস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা কাউন্টারে গিয়ে জানতে পারলাম, এসি নন এসি কোন রুম খালি নেই। ফলে অনন্য উপায়ে বাধ্য হয়ে উড়ৎসরঃড়ৎু ৎড়ড়স এর দু’টি সিট নিতে হল।
গুন্ডা ট্রেন স্টেশন জংশন। এখানে ট্রেন স্টেশনে একটি এসি, একটি নন এসি জবঃরৎরহম ৎড়ড়স রয়েছে। আরও রয়েছে দু’টি উড়ৎসরঃড়ৎু ৎড়ড়স. এক একটি কক্ষে ৬টি করে সিট। উড়ৎসরঃড়ৎু ৎড়ড়স কক্ষগুলো বিশাল আকৃতির। এখানে যাত্রীদের কাপড় রাখার জন্য থাক, আলনা রয়েছে। একপাশে গোসলখানা ও টয়লেট পৃথক পৃথক।
পরদিন শুক্রবার বিধায় আমরা সকালে গোসল করে নিই। ভিজা কাপড় পলিথিনের ব্যাগে করে রাখি। পাসপোর্ট ডলার রূপির সাথে রাখি। সকাল ৯ টার দিকে টেক্সী নিয়ে আজমগড়ী হযরতের কন্যার শ্বশুর বাড়ি চলে যাই। তাঁরা হাদিয়া টাকা নিতে পছন্দ করে না বিধায় নাস্তা কিনে নিই। তাদের ঘরে গিয়ে জানতে পারি আজমগড়ী হযরতের কন্যা মুছাম্মৎ মছরুরা খাতুন ২০০০ খ্রিস্টাব্দে ২১ নভেম্বর ৯০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলায়হে রাজেউন)। আমরা জুমা যেয়ারত আতিথেয়তায় সময় দিয়ে বিকালে ট্রেন স্টেশনে চলে আসি। এখান থেকে ট্রেনে লক্ষেèৗ রওনা হয়ে যাই।
লক্ষেèৗ ভারতের বিখ্যাত নবাবী শহর। এখানে যেয়ারতের, দেখার অনেক কিছু রয়েছে। লক্ষেèৗর সাথে দিল্লি কলকাতার উন্নতমানের ট্রেন এবং বিমানের ফ্লাইট রয়েছে।
পরদিন হতে আমরা শাহরণপুর, তানবন্দ, দেওবন্দ, সেরহিন্দ, চন্ডীগড়, কালকা, শিমলা, দিল্লি, আজমীর, জয়পুর, মুম্বাই, ঔরঙ্গাবাদ, খুলদাবাদ, হায়দারাবাদ হয়ে কলকাতা পৌঁছি।
৩য় বার যেয়ারতে গমন ঃ ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে ৩য় বার আজমগড়ী হযরতের যেয়ারতের সৌভাগ্য হয়। তখন সহযাত্রী ছিল তরিক্বতের ভাই চট্টগ্রাম কাঁতালগঞ্জ আবাসিক এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা আলহাজ্ব মুহাম্মদ আলমগীর আলম, তাঁর বন্ধু নিউ মার্কেটের স্বর্ণ ব্যবসায়ী আলহাজ্ব শাসশুল রহমান, আবদুল আজিজ ও মুহাম্মদ মুহসীন। আমরা কলকাতা থেকে ৭ জুন বৃহস্পতিবার দুপুরবেলা ১১টা ৪৫ মিনিটের জম্মু-তাওয়ি (ঔধসসড় ঞধরি) ট্রেনে অযোধ্যা রওনা হই অঈ ঞড়ি ঞরবৎ ঝষববঢ়বৎ এ। অমলেন্দু বাবু আমাদের জন্য টিকেট খরিদ করে রাখে। আমরা কলকাতা তার বাড়ি সংলগ্ন তারই গেস্ট হাউজে ছিলাম। পর দিন ৮ জুন শুক্রবার সকালে আমরা অযোধ্যা নেমে যাই। তথা হতে জিপ যোগে প্রায় ৫০ কি.মি দূরত্বে গুন্ডায় আজমগড়ী হযরতের কন্যার শ্বাশুর বাড়ি পৌঁছি। তখন জানতে পারি আজমগড়ী হযরতের ভাগিনা ও মেয়ের জামাই প্রফেসর ড. ইলতেফাক আহমদ ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে ২৭ মার্চ ১০১ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলায়হে রাজেউন)। তাপমাত্রা অত্যধিক প্রায় ৪২/৪৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস বা আরও বেশি। এমনি অবস্থায় জুমা, যেয়ারতে সময় কাটাই। অতঃপর বিকালের দিকে আমরা জীপ নিয়ে গুন্ডা ত্যাগ করে সড়কপথে রাত ১২ টার বেরেলী পৌঁছি। পর দিন টেক্সী নিয়ে দিল্লি। (চলবে)

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 441 People

সম্পর্কিত পোস্ট