চট্টগ্রাম শনিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২২

সর্বশেষ:

১২ ডিসেম্বর, ২০২১ | ৫:১৮ অপরাহ্ণ

আবসার মাহফুজ

প্রফেসর হাসিনা জাকারিয়া বেলার ‘বেগম রোকেয়া পদক’ প্রাপ্তি

বাংলাদেশে যে কয়জন নারী ছাত্রাবস্থায় পাকিস্তানী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে নানা আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের কাতারে থেকে রাজপথ কাঁপিয়েছেন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে অংশগ্রহণ করে বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছেন এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জনের পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশ গড়ার কাজে নানাভাবে ভূমিকা রেখেছেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়তে এখনো লড়ে যাচ্ছেন, তাঁদের একজন হচ্ছেন শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রফেসর হাসিনা জাকারিয়া বেলা, যিনি বেলা ইসলাম নামেই সমধিক পরিচিত।  শিক্ষা, সাহিত্য, সঙ্গীত, সংস্কৃতি, পরিবেশ সুরক্ষাসহ নানাক্ষেত্রেই রয়েছে তাঁর অনুপম অবদান। এজন্যে বেসরকারিভাবে নানা পুরস্কার ও স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। তবে দু:খজনভাবে তিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি এতোদিন। হয়তো বীরপ্রসবীনী চট্টগ্রামকে ভালোবেসে চট্টগ্রামে পড়ে থাকার কারণেই তাঁর মূল্যায়ন হয়নি। অথবা রাষ্ট্র তাঁর গুণ এবং অবদান সম্পর্কে অবহিত ছিল না। তবে দেরিতে হলেও রাষ্ট্র তাঁর অবদানের স্বীকৃতি দিল। দেশ গড়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার মূল্যায়ন করলো। নারী গুণীনদের জন্যে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ‘বেগম রোকেয়া পদক ২০২১’-এ ভূষিত করা হলো তাঁকে। শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্যে তাঁকে এ প্রেস্টিজিয়াস পুরস্কারটি দেয়া হলো। এজন্যে বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধন্যবাদার্হ। তিনি এই গুণীজনের গুণ ও দেশগড়ার কাজে তাঁর অবদানের নির্মোহ মূল্যায়ন করে স্বীকৃতি ও সম্মান দিয়েছেন। নারীশিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁর সাথে আরো চারজন বিশিষ্ট নারীকে ‘বেগম রোকেয়া পদক-২০২১’ প্রদান করা হয়েছে। তারা হচ্ছেন, যশোরের অর্চনা বিশ্বাস, চট্টগ্রামের শামসুন্নাহার রহমান পরাণ (মরোণোত্তর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রোকেয়া হলের প্রভোস্ট ড. জিনাত হুদা এবং কুষ্টিয়ার গবেষক ড. সারিয়া সুলতানা।

উল্লেখ্য, প্রফেসর হাসিনা জাকারিয়া বেলা বহুমাত্রিক গুণের আধারব্যক্তিত্ব। শিক্ষাবিস্তার, শিক্ষার মানোন্নয়ন, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চা ও প্রসার, প্রকৃতি ও পরিবেশের সুরক্ষার আন্দোলন গতিশীল করা সহ নানাক্ষেত্রেই রয়েছে তাঁর অসামান্য অবদান। কিন্তু তিনি এক নিভৃতচারী প্রচারবিমুখ মানুষ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী এই গুণীনের জন্ম ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে, দেশের এক ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে, যে পরিবার শিক্ষা-সংস্কৃতি, মুক্তচিন্তা আর অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ। তার পিতামহ ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রথম মুসলিম গ্র্যাজুয়েট। তিনি ঊনিশশতকের গোড়ার দিকে তৎকালীন অবিভক্ত আসাম সরকারের পুলিশ বিভাগের এসআই হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সঙ্গীত সাধনাও করতেন তিনি। পিতা রফিকুল ইসলাম ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে গ্রাজুয়েশন করেছেন কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তিনিও পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও সুপরিচিত ক্রীড়াবিদ ছিলেন। মা বেগম আজিজা খাতুন একজন লেখিকা, সংস্কৃতিমনা সমাজসেবী। বড়ভাই উস্তাদ আজিজুল ইসলাম খ্যাতিমান বংশীবাদক। বোনেরাও সৌখিন গাইয়ে। জীবনসঙ্গী ক্যাপ্টেন (অব) এম জাকারিয়া চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং চট্টগ্রাম ওয়াসারও চেয়াম্যানের দায়িত্ব পান করেছেন তিনি সুনামের সাথে। তিনিও অত্যন্ত সংস্কৃতিমনা ও সংগীত অনুরাগী।

প্রফেসর হাসিনা জাকারিয়া মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, এই জনপদের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে চাইলে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠিত করতে হলে, অবশ্যই সোনার মানুষ তৈরি করতে হবে। আর এ জন্যে সুশিক্ষার বিস্তারে সুশিক্ষিত মানুষ তৈরি করতে হবে, যারা দেশকে ভালোবাসবে, দেশের মানুষকে ভালোবাসবে, জাতির জনকের স্বপ্ন পূরণে আত্মনিবেদিত হবে। এমন চিন্তা-ভাবনা থেকেই তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। সব প্রতিকূলতাকে জয় করে একজন সত্যিকারের আদর্শ শিক্ষক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছেন তিলে তিলে। স্নাতকোত্তর শেষ করে কৃতিত্বপূর্ণ ফল নিয়ে তিনি বিসিএস শিক্ষাক্যাডারে অবতীর্ণ হন। বিসিএসে কৃতীত্বপূর্ণ ফল নিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষক হিসেবে তার কর্মজীবনের শুরুটা হয় অন্যতম দেশসেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে। এরপর তিনি আরেক দেশবিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সিলেটের এমসি কলেজসহ কয়েকটি কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। আশির দশকের গোড়ার দিকে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্যে লন্ডন চলে যান। সে সময় পড়াশোনার পাশাপাশি সঙ্গীত সাধনায়ও প্রবৃত্ত হন। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন স্থানে আমন্ত্রিত হয়ে সংগীত পরিবেশন করেন। প্রসঙ্গত, নজরুল সঙ্গীত ও শাস্ত্রীয় সংগীতে তার পারদর্শীতা অনন্যসাধারণ। বর্তমান প্রজন্মের কাছে বিষয়টি অজ্ঞাত থাকলেও একসময় সংগীতপিপাসু ও সংগীত-সাধকদের কাছে তার যশখ্যাতি এবং সম্মান ছিল আকাশচুম্বী।

উল্লেখ্য, পারিবারিক পরিমন্ডলে প্রফেসর হাসিনা জাকারিয়ার সংগীতের হাতেখড়ি। একেবারেই পাঁচ/ছয় বছর বয়স থেকেই সংগীতে তার তালিম শুরু। প্রথমে তার সংগীতশিক্ষক ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় রাজেন্দ্র কর্মকার (রাজশাহী), জ্যোতিন্দ্র বাবু (পাবনা), সুখেন্দ্র চক্রবর্তী (চট্টগ্রাম) এবং পরে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে আগ্রা ঘরানার বিখ্যাত উস্তাদ বেলায়েত আলী খানের কাছে শিষ্যত্ব গ্রহণ করে নিয়মিত শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নেওয়া শুরু করেন তিনি। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি পিতার সরকারি কর্মস্থল পাবনার বনমালি ইনস্টিটিউটে দেশবরেণ্য অনেক শিল্পীদের উপস্থিতিতে প্রথম মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে অনেক প্রথিতযশা শিক্ষকদের কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীত ছাড়াও বিভিন্ন ধারার সংগীতে তালিম নেন। বিশেষত ওস্তাদ কাদের জামেরী (গজল, ঠুমরী, টপ্পা), শেখ লুৎফুর রহমান (নজরুল গীতি ও গণসংগীত) এবং তৎকালীন বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম ধারক ওয়াহিদুল হকের কাছে (রাগাশ্রিত রবীন্দ্রসংগীত ও টপ্পা)। তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানের ‘ট্যালেন্ট ফাইন্ডিং টিম-এর মনোনয়ন সর্বপ্রথম ঢাকা বেতার থেকে ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে উচ্চাঙ্গ সংগীত পরিবেশন করেন। চট্টগ্রাম বেতার স্থাপিত হওয়ার পরপরই একক কণ্ঠশিল্পী হিসেবে উচ্চাঙ্গ সংগীত পরিবেশন করেন। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় অনুষ্ঠিত নিখিল পাকিস্তান সংগীত সম্মেলনে উপমহাদেশের শীর্ষ সংগীতজ্ঞদের সাথে সংগীত পরিবেশন করেন। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে রেডিও পাকিস্তান করাচীর দুরপ্রাচ্য ও অভ্যন্তরীণ সার্ভিসের জন্য রাগ সংগীত, গজল ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম আর্ট কাউন্সিল ও চট্টগ্রাম বেতারের যৌথ উদ্যোগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘নিখিল পাকিস্তান সংগীত সম্মেলন’ উচ্চাঙ্গ সংগীত পরিবেশন করেন। ঢাকা বেতার আর টিভিতে স্পেশাল গ্রেড’র শিল্পী হিসেবে তিনি নিয়মিত উচ্চাঙ্গ, নজরুল, গজল ও নিজের সুরারোপিত বাংলা গান পরিবেশন করেন।  রাজশাহী, চট্টগ্রাম, ঢাকা বেতার, বিটিভিতে আয়োজিত দর্শকদের উপস্থিতিতে সরাসরি বিশেষ বৈঠকি অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করে শ্রোতাদের অবিভূত করেছেন একাধিকবার। ঢাকা বেতারের কমার্শিয়াল সার্ভিসে বরেণ্য সুরকার আজাদ রহমান ও সমর দাসের তত্ত্বাবধানে এবং তাদের সুরারোপিত বেশকিছু গান রেকর্ড করেন, যার অনেকগুলো ৭০’এর মাঝামাঝি সময়ে জনপ্রিয় হয়েছিল। তবে তার অনবদ্য সাধনচর্চা ছিল নজরুল ও শাস্ত্রীয় সংগীতের উপর। জাতীয় প্রেসক্লাব, বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্র, শুদ্ধ সংগীত প্রসার গোষ্ঠী, ছয়ানট, তবলা শিক্ষালয়, এটমিক এনার্জি কমিশন, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট প্রভৃতি জায়গায় আয়োজিত বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানগুলোতে সংগীত পরিবেশন করে সর্বমহলে হয়েছেন অত্যন্ত প্রশংসিত। তখনকার বহুল প্রচারিত ম্যাগাজিন, পত্রিকাসমূহ (বিচিত্রা, সাপ্তাহিক ললনা, ইত্তেফাক, সংবাদ, চিত্রালি, ঝিনুক, তারকালোক ইত্যাদিতে) তাকে নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন ও সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। প্রসঙ্গত, লন্ডন অবস্থানকালে তিনি বিবিসি টিভি (এশিয়ান সেকশন), করাচী ও ঢাকা বেতারে Far East I Trancription service এর জন্য সংগীত পরিবেশন, London Commonwealth Institute-এ বাংলাদেশের শিল্পী হিসেবে প্রতিনিধিত্ব, BBC বাংলা সার্ভিস-এ একাধিকবার উপস্থাপকদের সাথে বাংলা অনুষ্ঠান পরিচালনা, All Pakistan Music conference -এ উপমহাদেশের শীর্ষ সংগীতজ্ঞদের সাথে একাধিকবার অংশগ্রহণ (ঢাকা-চট্টগ্রামে),International Asian Cultural Society, Uk এর সদস্য সচিব ছিলেন। তার মতে, ‘সংগীত হল এক ঐশ্বরিক বিষয়। এর সাথে রয়েছে মানুষের আত্মিক বন্ধন। তাকে পেতে হলে চাই আজীবন সাধনা, একাগ্রতা, অনুশীলন, পরিশুদ্ধ মন আর সংগীতের বেদীতে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ।’

শিক্ষায় দেশকে আলোকিত করার পাশাপাশি সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ এবং শুদ্ধ ও মননশীল সংগীতচর্চার মধ্য দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে তার অবদান অনস্বীকার্য। তবে বর্তমান প্রজন্ম তাকে একজন সংগীতজ্ঞের চেয়ে একজন উচুঁমাপের শিক্ষাবিদ হিসেবেই বেশি চেনেন, জানেন। বিশেষত ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজকে দেশসেরা এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পেছনে তার যে একক অবদান তা অস্বীকারের উপায় নেই, যদিও তার অবর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি এখন র‌্যাংকিং তালিকায় অনেক নিচে নেমে গেছে। ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ থেকে অবসর নেয়ার পরও তিনি খুলশীস্থ রেডিয়েন্ট স্কুল এন্ড কলেজ, আগ্রাবাদ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ এবং বাংলাদেশ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজসহ নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদ এবং শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত থেকে দেশে শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষা বিস্তারে অনন্য ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। পাশাপাশি শিক্ষকতা পেশার ধারাবাহিকতাও চলমান রেখেছেন। তিনি বর্তমানে সাদার্ন ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একজন দক্ষ শিক্ষা-প্রশাসক ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সেমিনার সিম্পোজিয়ামে অংশ নিয়েছেন তিনি। জাপান ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘টোকিও এডুকেশন কনফারেন্স’, ইংল্যান্ডের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক প্রশিক্ষক কনফারেন্স’, আর্লি চাইল্ড হুড ডেভালাপমেন্ট’ আয়োজিত ‘এশিয়া প্যাসিফিক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে’ অংশগ্রহণ করেছেন তিনি। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে এক্সচেইঞ্জ প্রোগ্রামে, শিক্ষাসফরে ইতালী, পশ্চিম জার্মানি, নেপাল, স্কটল্যান্ড, শ্রীলংকা সফর করেন। তার হাতে গড়া হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী আজ লোক-প্রশাসন এবং দেশে-বিদেশে বিভিন্ন উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করছেন। ব্যবসা-বাণিজ্য, সাংবাদিকতা, শিক্ষকতাসহ নানা পেশায় যুক্ত থেকে তার আদর্শে গড়া শিক্ষার্থীরা আজ দেশ-উন্নয়নে ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। এটাই তার শ্রেষ্ঠ পাওয়া, শ্রেষ্ঠ বিনিময়। আজীবন তিনি মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে এভাবে আলোকিত মানুষ তথা সুনাগরিক তৈরির মাধ্যমে দেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত করতে অবদান রেখে যাবেন। কোনো পদকে হয়তো এর মূল্যায়ন সম্ভব নয়, তবে ‘বেগম রোকেয়া পদক-২০২১’ এর মতো ‘একুশে পদক’ এবং স্বাধীনতা পদক’র মাধ্যমে তার কর্ম ও অবদানের স্বীকৃতি দরকার। এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এভাবে সত্যিকারের গুণীনদের মূল্যায়ন হলে রাষ্ট্রে গুণীনের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাবে। আখেরে দেশ উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে দ্রুত এগিয়ে যাবে। মসৃণ হয়ে যাবে জাতির জনকের স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়ার পথ।

প্রচারবিমুখ হওয়ার কারণে প্রফেসর হাসিনা জাকারিয়া বেলার অনেক বিষয় আজ অনেকের কাছে অজানা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন অধ্যায়ের সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে তিনি ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষকালে তিনি প্রগতিশীল আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ‘সংস্কৃতি সংসদের’ সহ-সভাপতি থাকার সুবাদে বিভিন্ন জায়গায় গণসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান ও দেশাত্মবোধক গান গেয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন অবিরত। ডাকসু অফিসে বসে প্রখ্যাত গণসংগীত শিল্পী শেখ লুৎফুর রহমানের শেখানো বিশেষ বিশেষ জাগরণী গান, যেমন- ‘লাঞ্চিত নিপীড়িত জনতার জয়’, ‘ব্যারিকেড বেয়োনেট বেড়াজাল’, ‘আমার প্রতিবাদের ভাষা আমার প্রতিরোধের আগুন, ‘মুক্তির মন্দির সোপানও তলে’ ইত্যাদি গণসংগীত শিল্পী মাহমুদুর রহমান বেনু, সহপাঠী নিলুফার ইয়াসমিন ও জিনাত রেহেনা, নিলুফার পান্না, শাহীন সামাদ ও প্রয়াত শিল্পী অজিত রায়সহ বহু মঞ্চে ও রাস্তাঘাটে পরিবেশন করেছেন। বস্তুত এই গানগুলোই পরবর্তীতে বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধের গান হিসেবে প্রচারিত হয়। এছাড়া আরো নানাভাবে তিনি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত থেকে বিজয় ত্বরান্বিত করতে ভূমিকা রেখেছেন। প্রসঙ্গ, প্রফেসর হাসিনা জাকারিয়া বেলার পরিবারও বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে যুক্ত ছিলো। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক তার বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায়, তাদের পারিবারিক গাড়িতে বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র/হাতবোমা বহন করে পরিকল্পিত স্থানে পৌঁছে দেয়া, নিকটবর্তী হোটেল আসকার দিঘির পাড়ে ‘গেইট অব লন্ডন’-এ অবস্থানরত পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যদের প্রতি গ্রেনেড ছুড়ে ঘায়েল করা, হালিশহর পান্নাপাড়া এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা ছোট ভাই ও বাসায় অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধা ছেলেদের সাথে নিয়ে অপারেশন চালানো ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্মৃতিকথাসহ তার অসংখ্য লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

প্রফেসর হাসিনা জাকারিয়া একজন দক্ষ সংগঠকও। ছাত্রাবস্থায় প্রগতিবাদী ও বাঙালি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন বিধায় তিনি একজন দক্ষ সংগঠক হয়ে উঠেছিলেন। উচ্চাঙ্গ সংগীতের প্রচার, প্রসার আর আমাদের দেশীয় সংগীত ও শুদ্ধ সংস্কৃতির বুনিয়াদ তৈরির লক্ষ্যে কিছু সংগীত অনুরাগী সহযোগিদের নিয়ে ঢাকায় তৈরি করেছিলেন ‘পাকিস্তান ক্ল্যাসিক্যালস’ নামে একটি সংগঠন। পরবর্তীতে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ‘বাংলাদেশ ক্ল্যাসিক্যালস’ নাম ধারণ করে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চা ও প্রসারে তার ভূমিকা অনন্যসাধারণ বলতে হবে। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে বিসিএস শিক্ষায় ক্যাডারভুক্ত হয়ে সরকারি কলেজে অধ্যাপনার সময় তিনি কুমিল্লা উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের মনোনীত একমাত্র সংগীত বিষয়ক পরীক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। পুরবী ললিতকলা একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষসহ জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে সংগীতবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের উৎকর্ষ সাধনে ভূমিকা রেখেছেন। সংগীত বিষয়ে তার লেখাগুলোও এদেশের অনন্য সম্পদ। তিনি দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি করেছেন। তার মধ্যে সংগীত বিষয়ক অনেক লেখাও রয়েছে। বিশেষত তার নিরিক্ষাধর্মী লেখা ‘শিল্পী, সুর ও সাধনা’ এবং বিশ্বনন্দিত ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সম্পর্কে লেখা ‘ঈশ্বর যার সুর’ ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। নজরুল সংগীত নিয়ে একাধিক লেখা পাঠকসমাজের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত হয়েছে। বেতারের মাসিক অনুষ্ঠান সম্বলিত পত্রিকা ‘এলান’-এ স্বরলিপিসহ নিজের সুরারোপিত বাংলা গান ও শুদ্ধ রাগভিত্তিক বাংলা খেয়াল ছাপানো হয়েছে। যদিও বেশকিছুদিন তিনি সংগীত থেকে দূরে ছিলেন, তবে আশার কথা তিনি এখন পুনরায় সংগীতের সাথে যুক্ত হয়েছেন। তিনি বর্তমানে নজরুল সঙ্গীত শিল্পী পরিষদের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি, বাংলাদেশ সংগীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি, নজরুল সংগীত শিল্পী সংস্থার উপদেষ্টা, বাংলাদেশ সংগীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি, নজরুল সংগীত শিল্পী সংস্থার উপদেষ্টা, হাটখোলা, কীডস কালচারাল ইনস্টিটিউট, বিস্তার, আমরা করবো জয়, সদারঙ্গ শাস্ত্রীয় সংগীত সংগঠনসহ বিভিন্ন সংগীত সংগঠনে যুক্ত আছেন। এতে দেশের সংগীতজগত আরো সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ পাবে নিশ্চয়ই।

প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষায়ও তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। দেশের অন্যতম শীর্ষ পরিবেশবাদী সংগঠন ‘পরিবেশ মানবাধিকার আন্দোলন-পমা’র চেয়ারপারসন তিনি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গণিতবিদ ও ভৌতবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. জামাল নজরুল ইসলামের মৃত্যুর পর থেকে আজ অবধি তিনি এ দায়িত্ব পালন করছেন নিষ্ঠার সাথে। এছাড়া ফোরাম চিটাগাং, ইকোনমিক এসোসিয়েশন, জাতীয়-আঞ্চলিক স্কাউটসহ আরো নানা সেবামূলক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে দেশ-উন্নয়নে অসামান্য ভূমিকা রেখে চলেছেন। তবে এই গুণীনের কর্মপ্রেরণার নেপথ্য উৎস হচ্ছেন ক্যাপ্টেন জাকারিয়া, তাঁর জীবনসঙ্গী। দেশ-উন্নয়নে তার অবদানও অসামান্য। প্রচারবিমুখ হওয়ার কারণে তাঁর অবদানের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি নেই। দেশের স্বার্থে তাঁর অবদানেরও মূল্যায়ন হওয়া উচিত। এটি সময়ের দাবি। আমরা আশা করতে চাই, রাষ্ট্র ও সরকার এই দুই গুণীজনসহ দেশের সব প্রচারবিমুখ গুণীজনদের খুঁজে বের করে যথাযথ মূল্যায়ন ও সম্মান জানাবে।  

পূর্বকোণ/পিআর

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 515 People

সম্পর্কিত পোস্ট