চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৯ জুন, ২০১৯ | ১২:২২ পূর্বাহ্ণ

আবসার হাবীব

যমুনা নদীতে কয়েক ঘন্টার আনন্দ-ভ্রমণ

চলমান জীবন

গোপালপুর …….
চট্টগ্রাম ঢাকা হয়ে এখানে আসা ৭ জুন ২০১৯, দুপুরে, অর্থাৎ খাঁ বাড়িতে।। যমুনা নদীর পাড়ের নিকটবর্তী একটি গ্রাম গোপালপুরে। বেলকুচি। এনায়েতপুর। চৌহালী। সিরাজগঞ্জ উপজেলা। সিরাজগঞ্জ জেলা সদর। এইসব গ্রাম জনপদের সহজ সরল মানুষ সুন্দর জীবন পাড় করে দিয়েছে যুগে যুগে। পাওয়া না পাওয়ার মধ্যে তাদের সুখের নহর বহমান। এই শহর-গ্রাম মিশাল জীবনেও স্বাদ আমাকে মুগ্ধ করেছে। পাকা আম-কাঁঠালের ঘ্রাণ প্রাণভরে নিশ^াস নিয়েছি। এইতো বাংলার মধুমাস। সড়ক অলি-গলি বাড়ির উঠোন হাতের নাগালের মধ্যে ঝুলে আছে। আম-কাঁঠাল-লিচু। আম কেজি আট-দশ টাকা। তাই তো বাড়ির উঠোনে চালে পাকা আম-কাঁঠাল পচে পড়ে আছে। কোনো ধরনের কৃত্রিম ক্যামিকেল ছাড়া আম-কাঁঠাল-লিচু খাওয়ার তৃপ্তিই আলাদা। মন খুলে গান করতে ইচ্ছে করছে, ‘আহা, কী আনন্দ আকাশে বাতাসে’, জীবনেও।
এখানে যমুনা নদী ছাড়াও আছে বড়াল, ইছামতি, করতোয়া, ফুলজোড়া নদী। উল্লেখ্য, শাহজাদপুর উপজেলায় রবীন্দ্রনাথের কাছারিবাড়ি অবস্থিত। এখানে থেকে পনেরো কিলোমিটার দূরে। সেখানেও একদিন ঘুরে আসি। ঢোকার সময় ফটকের পাশে লেখা আছে, এখানে করতোয়া নদী ছিল। শুকিয়ে গেছে।
এই এলাকার দুঃখ ভাঙন। আমি কোথাও গেলে মানুষের সুখটুকু ভালো দিকগুলো খোঁজার চেষ্টা করি। মানুষের জীবনের আলোটুকু বুঝতে চাই। দেখতে চাই। দুঃখটুকু কেউ কেউ অন্যকে বলে একটু হালকা হতে চায়। কেউ শুনে হয়তো সমবেদনা প্রকাশ করে। কিন্তু সমাধান তো দিতে পারবো না! ভাঙনের সমস্যার সমাধান সরকার এবং প্রকৃতির খেয়াল খুশির উপর নির্ভরশীল। এক সময় পাট ক্রয় ও বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কলকাতা নারায়ণগঞ্জের পরেই সিরাজগঞ্জ বন্দরের স্থান ছিল। এখনো কুটির শিল্প বিশেষ করে তাঁতের শাড়ি, লুঙ্গি, গ্রামীণ চেকের জন্য বিখ্যাত।
বেড়াতে যাওয়া আনন্দ …….
বেড়াতে যাওয়ার আনন্দের কোনো তুলনা হয় না। একদিনের জন্য যাই, আর এক মুহূর্তের জন্য যাই! ঘর থেকে এক পা বাইরে ফেলেই আর পেছন ফিরে না তাকানো মানেই আনন্দ ভ্রমণ। দলবদ্ধ ভাবে কিছুটা আনন্দ, কিছুটা পারিবারিক বন্ধনের ঘাটছাড়া বাঁধার গেড়োটা আরো দৃঢ় হয়। নদীর তীরে ভাসানো জলযান মানুষের মনকে অনেক বড়ো করে দেয়। তার উপর যদি হয় বিকেলের চমৎকার রোদ্দুর। খোলা আকাশের নীচে নদীতে ভাসানো পরিবার-স্বজন নিয়ে দুলতে দুলতে যাওয়া – এই যে সাঁঝ-বিকেলের খোলা মনের কথার পিঠে কথা সাজানো কখনো কখনো আমরা ভুলতে পারবো।
খাঁ বাড়ি থেকে যমুনায় …….
গোপালপুরের খাঁ বাড়ি, মানে আমার বেয়াই খোকন ভাইয়ের বাড়ি থেকে – দুইটি গাড়ি করে বেরুলাম। আঁকাবাঁকা পিচকরা রাস্তা। কিছু কিছু অংশ ভাঙাচোরা। তবে একটি বিড়ম্বনার আছে, অংশ রিক্সা ভ্যান। ব্যাটারি চালিত চালকসহ মোট সাতজন বসতে পারে। মনে হলো মানুষের চেয়ে রিক্সা বেশি। ইঞ্জিনের রিক্সাগুলো বেপরোয়া ভাবে চলে। বুক কাঁপানো ভয়। মুহূর্তে মনে পড়ে গেল কক্সবাজারের হাজার হাজার ইজিবাইকের কথা। পাশর্^ বিড়ম্বনা সর্বক্ষেত্রে আছে। ভ্রমণে আনন্দে। বিড়ম্বনাও থাকে। এই হলো ভ্রমণের সুখ-দুঃখ। ‘এক পলকে একটু দেখা’র সুখটুকু মানুষ আজীবন মনে রাখে।
খোকন ভাইয়ের পুরো পরিবার ভ্রমণবিলাসী। বই পড়েন প্রচুর। বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যকদের নিয়ে দেশে বিদেশে অনেক ভ্রমণ করেছেন। অনুষ্ঠান করেছেন বিশেষ করে বিদেশে। তিনি আবার হোটেল ব্যবসার সাথে জড়িত। কক্সবাজারের নিজ নামে খ্যাত হোটেল ‘কক্স টুডে’-এর একজন পার্টনার পরিচালক। ঢাকার বনানীতে গ্যালাক্সী আবাসিক হোটেলেরও একজন পার্টনার। সবকিছু মিলে ভ্রমণটা খোকন ভাইয়ের জীবনের অংশ হয়ে আছে।
যমুনা নদীতে …….
যমুনা নদীর থেকে এই এলাকা রক্ষার জন্য দুইটি বাঁধ তৈরি করা হয়। এতে রক্ষা পেয়েছে খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতাল। এটা এনায়েতপুর পীর সাহেব হাসপাতাল নামে দেশে বিদেশে পরিচতি লাভ করেছে। এখানেও দেখলাম বেশকিছু বিদেশী ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়া করছে। এ হাসপাতাল খ্যাতি পেয়েছে ক্যানসারের ক্যামো কেন্দ্রের জন্য। খুব পরিচ্ছন্ন। কয়েক ঘন্টার জন্য গিয়েছিলাম। একটি নার্স কলেজ। নিজস্ব আবাসিক এলাকাও আছে। ব্যাংক ও মার্কেটও আছে। বাইরে সুন্দর বাগান।
এই বাঁধের জন্য হাসপাতালসহ বিস্তীর্ণ এলাকা ও জনপদ রক্ষা পেয়েছে। সিরাজগঞ্জ বেলকুচি থানা ও হাজুগড়া – দুইটি বাঁধের জন্য – গোপালপুর, এনায়েতপুর, চৌহালী পূর্বে ভুয়াপুর পর্যন্ত। বাঁধ এখন এই এলাকার মানুষের জন্য প্রধান বিনোদন কেন্দ্র। পরিবার-পরিজন, ছেলে-মেয়ে নিয়ে বিকেল হলেই ছুটছে সবাই। যমুনা ব্রিজের যমুনা নদীতেও চর পড়েছে। ইঞ্জিনচালিত ছোট-বড়ো নৌকা ভেসে বেড়াছে। স্রোত-টানও আছে। ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ গান ধরেছে। হৈ-হুল্লা করেছে। পানি ছুঁয়ে দেখছে। ঢেউয়ে, হাওয়ায় হাওয়ায় নৌকা দুলছে আর দুলছে। আহা, কি মুক্ত বাতাস।
গাড়ি বেড়িতে থামলো। আমরা নামলাম। খোকন ভাই অতি পরিচিত। বন্ধু ও আত্মীয় মানুষ। উৎসাহ নিয়ে একটি বড়ো ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া করে ফেলেন। কীর্তি দেখলাম কোথা থেকে নিয়ে এলো বাদাম ও কলা। এতো ছোট বাদাম আগে আর কখনো দেখিনি। বন্ধু-আত্মীয়রা নিয়ে এলো স্থানীয় ভাবে তৈরি সাদা খুড়মুড়ি। ঘন্টা খানেক যমুনা নদীতে উত্তর-দক্ষিণে ঘুরলাম। পরিষ্কার স্বচ্ছ জল। কর্ণফুলী বা বুড়িগঙ্গার মতো নোংরা পরিবেশ এখনো হয়ে উঠেনি। ভ্রমণকারী-পর্যটকরা সচেতন না হলে পরিবেশ ধ্বংস হবেই। একের দেখায় অন্যেরা খাওয়ার-দাওয়ার বর্জ্য না ফেললে হয়তো পরিবেশ দূষণের শিকার হবে না এই যমুনা। যমুনা নদী নিয়ে আমাদের অনেক গর্ব। ঊনসত্তুরের গণ-আন্দোলন, সত্তুর, একাত্তরে শ্লোগানে শ্লোগানে আমাদের জাতিসত্তার সাথে একাকার হয়ে আছে। আমরা তখন স্কুলে পড়তাম। শ্লোগান দিতাম :
‘তোমার আমার ঠিকানা
পদ্মা মেঘনা যমুনা।’
যমুনা নদী দেখালাম আজ। সৌভাগ্য আমার। জল স্পর্শ করে অনুভব করলাম এই আমার দেশ। এই আমাদের নদীসত্তা। ভাঙাগড়ার মধ্যেই আমাদের জীবনপ্রবাহ চলমান। আমার দেশ, বাঙালির জাতিসত্তা নদীর মতো প্রবহমানতা নিয়ে এগিয়ে যাবেই। ভেতরে ভেতরে এতো ভালো লাগলো, ‘শুধু দু’নয়ন মেলে দেখেছি, আর ছবি তুলেছি। আহা, কি ভালোলাগা যমুনা দিয়েছো তুমি আমাকে। আমাদেরকেও।’
‘নীল! নীল! সবুজের ছোঁয়া কিনা, তা বুঝি না, ফিকে গাঢ় হরেক রকম কম-বেশী নীল! তার মাঝে শূন্যের আনমনা হাসির সামিল। ভাবি, বলি, সাগরের ইচ্ছে শাদা ফেনা থেকে যেন/….সময়ের নীলে শুধু উদ্দাম অবিরাম আলপনা আঁকা, কী যেন কী যেন ঠিক মন দিয়ে জানতে না জানতে….’ – এ এক অন্যরকম আনন্দ গান নিয়ে ঘরে ফেরা। তখন সন্ধ্যা নামে নামে আমরা যমুনা তীর থেকে ফিরে এলাম।
একটি সুখের কাহিনী …….
খোকন ভাইয়ের বাড়িতে যাওয়ার পেছনে, ছোট একটি সুখের কাহিনী আছে। এই কাহিনী সুন্দরের এবং মিলনের। আমার ছেলে কিসতাজ হাবীব কীর্তি এবং খোকন ভাইয়ের মেয়ে সোমাইয়া মুর্শিদা শৈলী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দুজনই স্থাপত্য বিদ্যায় লেখাপড়া করেছে এবং প্রভাষক হিসেবে স্ট্যামফোর্ট বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ায়। তাদের দুইজনের ইচ্ছের ডানায় ভর করে বর্তমানে ছুটে চলা। ওরা দু’জনেরই ভ্রমণে ক্লান্তি নেই। লেখাপড়ায় মনোযোগী। আড্ডায় সপ্রাণ উপস্থিতি। রাতজাগা পাখির মতো উড়ে উড়ে বেড়াতে ভালোবাসে। এটা আমাদের অনুভব। এটা ওদের প্রতি আমাদের ভালোবাসা।
সবকিছুর পরও যেন আমাদের মাথা উঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে করে রবীন্দ্রনাথের মতো :
‘মুক্ত কর ভয়
আপনা মাঝে শক্তিধর
নিজেরে কর জয়।’
পুনশ্চ : খালুজানের আমন্ত্রণ ……..
খালুজান ফজলুর রহমান খান-এর আমন্ত্রণে এতোদূর ছুটে আসা। তিনি মহিউদ্দিন খান খোকন ভাইয়ের পিতা। পর্দার আড়ালের খালাম্মার কথা, খোকন ভাই, শামীমা খান – তাদের দুই ছেলে-মেয়ে সোমাইয়া শৈলী, সাফিন আহমদ খান, আমি এবং আমার স্ত্রী শামীম আক্তার, ছেলে কিসতাজ হাবীব কীর্তি। এই আনন্দমিলন মেলায়, এই মুহূর্তে মনে পড়ছে আরো কয়েকজনের নাম রেখা, রেবা, রিমি, ঝুমকা, বিজয় আর অন্তরা, তিতুমীর আর নিশাত, জুবায়ের, আর এশা, শিউলি আরো বেশ কয়েকজন।
খালাম্মাদের ও আপাদের হাতের রান্না করা যমুনা নদীর কত রকমের মাছ যে খেয়েছি সে বর্ণনা করতে পারবো না। ভোজনরসিক না হয়েও তারপরও পেয়ে ভোজনরসিকের মতোই তৃপ্তি নিয়ে খেয়েছি। কোনো কোনো বেলায় ছয়-সাত রকমের মাছও। যমুনার চিতল মাছের বড়ো টুকরো এখনো চোখের উপর ভাসছে। আজ এ-বাড়ি। কাল ঐ-বাড়ি। এভাবেই তিনদিন খেলাম। আর তৃপ্তির ঢেকুর তুললাম। সকলের কাছে যে ভালোবাসা-দোয়া-¯েœহ পেয়েছি তার কোনো তুলনা না। এইতো মঙ্গলময় এবং সুন্দর জীবন। এইতো ভালোবাসা। এইতো শুভ কামনা। ভ্রমণ সুখ।

The Post Viewed By: 192 People

সম্পর্কিত পোস্ট