চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৮ জুন, ২০১৯ | ১:৩৮ পূর্বাহ্ণ

ডা. হাসান শহীদুল আলম

এক বছর উপজেলা হাসপাতালে ইন্টার্নশীপ সম্পর্কে একটি পর্যালোচনা

চিকিৎসা শ্রমিকের দিনলিপি

জ্যৈষ্ঠের শেষ সপ্তাহ। ১৪২৬ বঙ্গাব্দ।
সম্মানিত পাঠকবৃন্দের অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে এমবিবিএস ডিগ্রী অর্জনের ক্ষেত্রে ইন্টার্নশীপ দুই বছর মেয়াদে উন্নীতকরণ এবং এর এক বছর উপজেলা হাসপাতালে ইন্টার্নশীপে সংযুক্ত থাকার বিষয়ে করণীয় নির্ধারণের জন্যে যথারীতি দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন করছে। যে উদ্দেশ্য সমূহ সামনে রেখে সরকার উল্লিখিত পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সেগুলো আপাতত : নি¤œরূপ :
১) গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসক সংকটের সুরাহা হবে ২) গ্রামীন জনগণের আর্থ সামাজিক পরিস্থিতি দেখে ডাক্তাররা সামাজিক পরিস্থিতি ভেদে যে চিকিৎসার তারতম্য হয় সে ধারণা পাবে যা ভবিষ্যতে তাদের কাজে লাগবে ৩) একজন বিসিএস ক্যাডারের চিকিৎসককে বেতনের চাইতে ইন্টার্নশীপ সময়ে যেহেতু অনেক কম ভাতা দেয়া হয় এতে সরকারের অনেক টাকা সাশ্রয় হবে।
সরকারের সদিচ্ছার সাথে একমত হয়ে সরকারের উল্লিখিত কার্যক্রমের বিরোধীতা না করে উপজেলা পর্যায়ে প্রাইমারী স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিপর্যস্ত পরিস্থিতির পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন মনে করছি।
মেডিক্যাল ইন্টার্নশীপ সম্পর্কিত তথ্যাদি :
ক) মেয়াদ : এমবিবিএস কোর্সের পাঠ্যসূচীতে বলা আছে, এমবিবিএস উত্তীর্ণ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা এক বছরের জন্য হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেবেন খ) প্রশিক্ষণের স্থান সমূহ : মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১১ মাস এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ ১৫ দিন গ) ছুটি : এক বছরে ১৫ দিন ঘ) সম্মানী : মাসিক ১৫০০০ টাকা ঙ) কাজের সময় : ইন্টার্নী চিকিৎসকদের অন্তঃবিভাগ, বহিঃর্বিভাগ ও জরুরী বিভাগে প্রশিক্ষকের নির্দেশনা অনুযায়ী সময় ধরে কাজ করতে হবে (বাস্তবে নির্ধারিত সূচীর অতিরিক্ত কাজ তাদের করতে হয়, এমনকি টানা ২৪ ঘণ্টাও তাদের কাজ করতে হয়)। চ) সুযোগ সুবিধা : তাদের কাজ অনুযায়ী অপ্রতুল এবং এটা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উপর ছ) প্রশিক্ষণের বিষয় সমূহ : এক বছর বা ৫২ সপ্তাহকে মূলত মেডিসিন, সার্জারী ও গাইনী এই তিনটি বিষয় ধরে সময় ভাগ করা হয়। জ) তদারকি : একজন ইন্টার্নী চিকিৎসক ঠিকমতো প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন কিনা তা লগ বইয়ে লিখবেন সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষক ঝ) সনদ : বিএমডিসি প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী এমবিবিএস পাশ করার পর প্রশিক্ষণার্থীদের এক বছরের জন্য সাময়িক সনদ দেয়া হয়। সফলভাবে ইন্টার্নীশীপ শেষ করলে সাময়িক সনদ ফেরৎ নিয়ে পেশা চর্চার স্থায়ী সনদ দেয়া হয়। ঞ) উদ্দশ্য : বিএমডিসির কাগজপত্রে ইন্টার্নীশীপের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে – ১) চিকিৎসা সম্পর্কিত-রোগীর সমস্যা সঠিকভাবে অনুধাবন করে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, রোগীর ইতিহাস সঠিকভাবে নেয়া ও সংরক্ষণ, আস্থার সঙ্গে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা সম্পন্ন করা, দক্ষতার সঙ্গে পরীক্ষাগারে কাজ করা, চিকিৎসার পরিকল্পনা গ্রহণ এবং চিকিৎসা প্রদান ২) যোগাযোগ সম্পর্কিত : রোগী ও তার আত্মীয় এবং সহচিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের সঙ্গে যথাযথ যোগাযোগের দক্ষতা অর্জন করা ৩) আলোচনা : রোগী ও তার আত্মীয়ের সঙ্গে নৈতিক ও আইনগত বিষয় নিয়ে কার্যকর আলোচনা করায় সমর্থ হওয়া।
এক বছর উপজেলা হাসপাতালে ইন্টার্নীশীপ : পর্যালোচনা
ক) উপজেলা হাসপাতালসমূহে রোগীর সংখ্যানুপাতে চিকিৎসকদের অপ্রতুল পোস্টিং থাকা : এর ফলে রোগীর চাপ বেশী থাকে। এরূপ পরিস্থিতিতে রোগের ইতিহাস নেয়া, সমস্যা অনুধাবন, ক্লিনিকাল পরীক্ষা, চিকিৎসা পরিকল্পনা ইত্যাদি কার্যক্রমসমূহ সঠিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। এর ফলে সঠিক চিকিৎসা দেয়া একজন ইন্টানীর পক্ষে সম্ভব হয় না। তাদের অভিজ্ঞতা অর্জনে ঘাটতি হবে।
খ) বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ না থাকা অথবা থাকলেও পদশূন্য থাকা : এর ফলে প্রাইমারী লেভেলে চিকিৎসার মান নি¤œমুখী হয়েছে এবং এর ফলে ইন্টার্নীদের অভিজ্ঞতা অর্জনে ঘাটতি হবে। গ) চিকিৎসক সহকারীর অপ্রতুলতা : ১) রোগীর সংখ্যানুপাতে স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহকারী, নার্স, আয়া, ওয়ার্ড বয়, ক্লিনার, এমএল এমএস ইত্যাদির পদ ও সরবরাহ অপ্রতুল থাকা। ২) সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি পরিচালনায় দক্ষ লোকের অভাব থাকা। ফলতঃ এ সমস্ত যন্ত্রপাতির ক্লিনিক্যাল ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাইমারী লেভেলে রোগীদের কিভাবে সুচিকিৎসা দেয়া যাবে সে ব্যাপারে ইন্টার্নীদের অভিজ্ঞতা অর্জন ব্যাহত হবে। ঘ) চিকিৎসা সরঞ্জামাদির অভাব ও ওষুধের অ প্রতুল সরবরাহ : ১) আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম বা যন্ত্রপাতি না থাকা এবং থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণের যথার্থ ব্যবস্থা না থাকা ২) সরকারী ওষুধের নি¤œমান ও অপ্রতুল সরবরাহ। ফলতঃ রোগ নির্ণয় যথার্থভাবে করা এবং সঠিক মানের ওষুধ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাইমারী লেভেলে চিকিৎসা দেবার অভিজ্ঞতা থেকে ইন্টার্নীরা বঞ্চিত হবে। ঙ) হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি : ১) চিকিৎসা যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না থাকা। ২) এ্যাম্বুলেন্স বিকল হলে জরুরী ভিত্তিতে সারানো ব্যবস্থা না থাকা এবং বিকল্প জরুরী পরিবহনের ব্যবস্থা না থাকা। ফলতঃ রোগীর আত্মীয় স্বজন বিকল্প পরিবহনের ব্যবস্থা করতে যে সময়ক্ষেপণ করবে তাতে ক্রিটিক্যাল কেয়ার এর রোগী সুচিকিৎসা না পেয়ে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে হয়তো মৃত্যুমুখে পতিত হবে। প্রাইমারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এরূপ বিপর্যস্ত পরিস্থিতি দেখে ইন্টার্নী চিকিৎসকদের অসহায় নিরব দর্শক হওয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর থাকবে না। ট্রেনিং গ্রহণ তো দূরের কথা। চ) কোন রেফারেল পদ্ধতি না থাকা : প্রাইমারী স্বাস্থ্য পরিচর্যার রোগীদের সমস্যাসমূহের শতকরা আশিভাগের সমাধান চিকিৎসা সহকারী এবং পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকার কাছে পাওয়া সম্ভব হলেও কোন রেফারেল পদ্ধনি না থাকাতে সকল রোগী এমবিবিএস চিকিৎসকের সাক্ষাৎ প্রার্থী হয়ে চিকিৎসকদের উপর চাপ সৃষ্টি করে এবং এর ফলে ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের সাক্ষাতের জন্য এমবিবিএস চিকিৎসক যথেষ্ট সময় দিতে পারে না। ফলতঃ এমবিবিএস চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণের সুযোগ থেকে ইন্টার্নী চিকিৎসকগণ বঞ্চিত হবে। ছ) আবাসন সমস্যা : উপযুক্ত বাসস্থান, রান্নার জন্য কুক, গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ না থাকা : এরূপ পরিস্থিতিতে বিকল্প থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা বা শহরের বাসা থেকে যাতায়াত করা উভয়ই ব্যয় সাপেক্ষ এবং সময়সাপেক্ষ হওয়ায় ইন্টার্নী চিকিৎসকদের পক্ষে মাসিক ১৫০০০ টাকা ভাতায় পোষানো সম্ভব হবে না। ফলতঃ তাদের পক্ষে ২৪ ঘণ্টা ডিউটি দেয়া সম্ভভ হবে না যেটা তারা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোনভাবে করতে সমর্থ হয়। জ) বিপর্যস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা : ১) সকল উপজেলায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সাথে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর সরাসরি সড়ক যোগাযোগ না থাকা, ২) অনেক অঞ্চল এতো দুর্গম যে পৌঁছতে দুপুর গড়িয়ে যায় ৩) বর্ষায় বন্যার কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে যাতায়াতের কোন ব্যবস্থা না থাকা। এরূপ পরিস্থিতিতে দুর্গম অঞ্চলে যাতায়াত দুঃসাধ্য, ব্যয় সাপেক্ষ ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় সেখানে চিকিৎসা দেয়া বা সেখানকার অভিজ্ঞতা অর্জন কোনটাই ইন্টার্নী চিকিৎসকের পক্ষে সম্ভব হবে না। ঝ) পরিবহনের অভাব : ১) সরকারী পরিবহন ব্যবহারে অন্যান্য বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তাগণ যে ধরনের সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকেন চিকিৎসকদের বেলায় তেমন সুযোগ সুবিধা না থাকা ২) মহিলা চিকিৎসকদের জন্য সরকারী পরিবহনের ব্যবস্থা না থাকায় বেসরকারীভাবে গাড়ী ভাড়া করে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পৌঁছতে দুপুর ফিরে আসতে সন্ধ্যানাগাদ প্রচুর সময়ের অপচয় হয় এবং নিরাপত্তা হীনতায় ভুগতে হয়। ঞ) নিরাপত্তার অভাব : কর্মস্থল, রাস্তা এবং আবাসন – এর কোথাও নিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকা বিশেষত মহিলা চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে : সিনিয়র চিকিৎসকগণ ও হাসপাতাল প্রশাসনের নিরাপত্তা বলয়ের মাঝে অবস্থান করার সুযোগ থাকে বিধায় মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসমূহে ইন্টার্নী চিকিৎসকগণ রাতদিন নির্ঘুম অক্লান্ত পরিশ্রম করে থাকে। কিন্তু উপজেলায় স্থানীয় মাস্তান, টাউট, বাটপার যারা দলীয় ছত্রছায়ায় থেকে উপজেলা প্রশাসনকে বৃদ্ধাংগুলি দেখিয়ে চলে তাদের অন্যায় আবদার রাখতে ব্যর্থ হয়ে উপজেলা হাসপাতালের বিসিএস ক্যাডারভুক্ত চিকিৎসকগণ যেখানে শারীরিক মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে থাকে সেখানে ইন্টার্নী চিকিৎসকদের নিরাপত্তা কতটুকু থাকবে সেটা ভাবার বিষয়।
ট) প্রশিক্ষণকালীন মর্যাদা না পাবার আশংকা : সিনিয়র চিকিৎসকদের ছাত্র শিক্ষক সম্পর্কসুলভ তত্ত্বাবধান এবং হাসপাতাল প্রশাসনের তদারকির মধ্যে অবস্থান করার সুযোগ থাকে বিধায় মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসমূহে ইন্টার্নী চিকিৎসকদের কখনও অমর্যাদাকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় না অথবা হলেও তার প্রতিকার তারা পেতে পারে। কিন্তু উপজেলায় প্রশাসন ক্যাডারের উপজেলার কর্মকর্তাগণ ক্ষমতার গর্বে সুযোগ পেলেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে যেখানে বিসিএস ক্যাডারভুক্ত চিকিৎসকদের হেস্তনেস্ত করতে থাকেন স্থানীয় জনগণের কাছে নিজেদের জ্যৈষ্ঠতা প্রদর্শনের জন্য সেখানে ইন্টার্নী চিকিৎসকগণ প্রশিক্ষণকালীন প্রাপ্য মর্যাদা পাবে কিনা সেটা চিন্তার বিষয়।
বাস্তবে যেটা হবে সেটা হচ্ছে সাধারণ রোগীদের নি¤œমানের চিকিৎসা দিয়ে বিদায় করা এবং ক্রিটিক্যাল কেয়ার এর রোগীদের মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করার মধ্যেই ইন্টার্নী ডাক্তারদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকবে। আর, ভোটের রাজনীতির বদৌলতে সরকার জনগণকে দেখাতে পারবে যে, গ্রামে চিকিৎসকদের উপস্থিত নিশ্চিত করা হয়েছে। শেষফল যা হবে তা হচ্ছে ইন্টার্নীশীপের মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ যথার্থ অভিজ্ঞতা অর্জন ব্যাহত হবে। সঠিক মানের নবীন চিকিৎসক তৈরী ব্যাহত হবে। সার্বিকভাবে দেশে চিকিৎসার মান নি¤œমুখী হবে।
উল্লিখিত সমস্যাসমূহের সমাধান : ক) স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করে যথার্থ পরিমাণ নিশ্চিত করতে হবে : বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী একটি দেশে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপি-এর কমপক্ষে ৫ শতাংশ এবং বাজেটের ১৫ শতাংশ হওয়া বাঞ্চনীয়। সে হিসেবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটের স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ দেয়া উচিৎ ছিলো প্রায় ৭০০০০ কোটি টাকা। কিন্তু বরাদ্দ দেয়া হয়েছিলো ২৩৩৮৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৪৬৬১৭ কোটি টাকা কম বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। এভাবে বিগত দশ বৎসরের হিসাবে দেখা যাচ্ছে এ সময়কালে স্বাস্থ্যখাতে ২ থেকে ৪ লাখ কোটি টাকা কম বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
খ) প্রাইমারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সচল করার মাধ্যমে : রোগীদের চাপে নিষ্পেশিত সেকে-ারী ও টারশিয়ারী খাত দুটিকে বিপর্যস্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতে হবে। গ) সমন্বয়হীনতা নিরসনকল্পে : উল্লিখিত সমস্যাসমূহের সমাধানের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন বা বিএমএ এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান সম্মিলিত যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে ঘ) চিকিৎসক সংকট নিরসনকল্পে : ১) উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেই বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের চিকিৎসকদের পোস্টিং দেয়া হোক ২) একত্রিশ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ৪ জন জরুরী মেডিক্যাল অফিসার, ৪ জন ইনডোর মেডিক্যাল অফিসার এর পোস্ট সৃজন করা হোক ৩) একজন আর এমও, একজন ইউএইচও পূর্বের মতোই থাকবেন ৪) সার্জারী, গাইনী, মেডিসিন, শিশু, এনেসথেসিয়া ইত্যাদি জুনিয়র কনসালটেন্ট পোস্টগুলো যেন সর্বদা পূর্ণ রাখা হয় ৫) সম্ভব হলে ইএনটি, আই, অর্থোপেডিক, চর্ম ও যৌন, হৃদরোগ, নিউরোসার্জারী ইত্যাদি জুনিয়র কনসালটেন্ট পোস্ট সৃজন করে নিয়োগ দেয়া যেতে পারে।
ঙ) চিকিৎসা সহকারী সংকট নিরসন কল্পে : ১) উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নার্স, চিকিৎসা সহকারী, আয়া, ব্রাদার, ওয়ার্ড বয়, ক্লিনার, এমএলএসএস নিয়োগ দিতে হবে। ২) চিকিৎসা সহকারী ও পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকাদের নিজ নিজ ইউনিয়নে অবস্থিত স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মাতৃমঙ্গলকেন্দ্রে সার্বক্ষণিক দায়িত্বে নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। চ) চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ও ওষুধপত্র সংকট নিরসনকল্পে : ১) পর্যাপ্ত পরিমাণ সরকারী ওষুধ, সার্জিক্যাল সেলাইয়ের জিনিষপত্র, অক্সিজেন, রোগীদের জন্য সঠিক মানের ডায়েট নিশ্চিত করতে হবে। ছ) হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার ত্রুটি সারাতে : ১) স্বাস্থ্যকেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জরুরী ফান্ড রাখতে হবে ২) সব ধরনের অপারেশন – সার্জারী, গাইনী, অর্থোপেডিক্স চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। জ) আবাসিক সংকট নিরসন কল্পে : সার্বক্ষণিক পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ সরবরাহ সহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সীমানার ভেতরে চিকিৎসকের বসবাসের উপযোগী আবাসন নিশ্চিত করতে হবে। ঝ) বিপর্যস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য উপজেলার সাথে ইউনিয়ন সমূহের মধ্যে গাড়ী চলাচল উপযোগী রাস্তা থাকতে হবে। ঞ) পরিবহন সংকট নিরসনকল্পে : কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য সার্বক্ষণিক সরকারী পরিবহনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ট) নিরাপত্তা বিধান : কর্মস্থলে ও আবাসনে এবং গাড়ীতে যাতায়াতকালে সার্বক্ষণিক সরকারী বা বেসরকারী নিরাপত্তাকর্মীর পাহারা থাকতে হবে ঠ) চাকুরীগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠা : চিকিৎসক চাকুরীগত মর্যাদা আপ্রগেড করে সম্মানজনক অবস্থানে নেয়ার জন্য প্রশাসনিক পুনর্গঠন করতে হবে এবং কর্মরত অবস্থায় চিকিৎসকদের ম্যাজিস্ট্রেসী ক্ষমতা প্রদান করতে হবে।
উল্লিখিত পদক্ষেপসমূহ কার্যকরী হলে ফলাফল যা দাঁড়াবে :
ক) প্রাইমারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সমন্বয়হীণতার অবসান ঘটবে খ) গ্রামীণ জনগণ সঠিক মানের চিকিৎসা পাবে। গ) অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে ইন্টার্নী চিকিৎসকগণ যথাযথ অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। ঘ) সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা সংবলিত যথাযোগ্য আবাসন ও খাওয়া দাওয়ার নিশ্চয়তা পেলে ইন্টার্নীগণ উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চৌহদ্দীর ভেতরে সার্বক্ষণিক অবস্থা করতে পারবে। ঙ) সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা কর্মী সংবলিত সরকারী পরিবহনের ব্যবস্থা থাকলে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কম্যুনিটি হাসপাতালসমূহ দুর্গম অঞ্চলে অবস্থিত হলেও ইন্টার্নী চিকিৎসকগণ সেখানে গিয়ে সেবাদান ও অভিজ্ঞতা অর্ঝন দুটোই করতে পারবে। চ) চিকিৎসকদের চাকুরীগত মর্যাদা আপ্রগেড করা হলে এবং কর্মরত অবস্থায় ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রদান করা হলে ইন্টার্নীদের পক্ষে মর্যাদার সাথে চাকুরী করা সম্ভব হবে।
প্রাইমারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ কল্পে কতিপয় প্রস্তাব : ১) প্রতি তিন মাসে ১৫ দিনের জন্য গ্রামে চিকিৎসা দিতে হবে (ভিলেজ ট্যুর) অর্থাৎ আড়াই মাস শহরে চিকিৎসা দেবার পর ২ সপ্তাহ গ্রামে চিকিৎসা দিতে হবে। ২) এভাবে বৎসরের ২ সপ্তাহ ঢ ৪ বা ৮ সপ্তাহ বা ২ মাস প্রতিটি চিকিৎসককে গ্রামে চিকিৎসা দিতে হবে ৩) এভাবে ১২ বৎসরে ১২ ঢ ২ বা ২৪ মাস বা দুই বৎসর গ্রামে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। ৪) মফস্বলে পোস্টিং নিজ জেলা অথবা পাশর্^বর্তী জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। ৫) দায়িত্ব পালনের জন্য ইউএইচও এর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। ৬) ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও মাতৃমঙ্গল কেন্দ্র সমূহে স্বাস্থ্য সহকারী, স্বাস্থ্য পরিদর্শিক, পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শকগণ সার্বক্ষণিক রোগী দেখবেন এবং রোগীদের রোগের ইতিহাস, রোগ সংক্রান্ত বিবিধ পরিসংখ্যান সমূহ কম্পিউটার এ সংরক্ষণ করবেন। সেখান থেকে রেফারড রোগীসমূহকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে গিয়ে এমবিবিএস চিকিৎসকগণ দেখে আসবেন। ৭) ‘ভিলেজ ট্যু’র কে চাকুরীর নীতিমালায় গুরুত্ব সহকারে প্রাধান্য দিতে হবে এবং সকল চিকিৎসকদের জন্য পাশ করার পর বার বৎসর যাবৎ এটা বাধ্যতামূলক থাকবে। ৮) দীর্ঘ বার বৎসরে অর্জিত চব্বিশ মাসের ‘ভিলেজ ট্যুর’-এর অভিজ্ঞতার পর একজন মেডিক্যাল অফিসার দেশে বিদেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার উপর অনুষ্ঠিত সেমিনার সমূহে সরকারীভাবে আমন্ত্রিত হয়ে অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। তাঁর অভিজ্ঞতা এবং যোগ্যতাকে পদোন্নতির জন্য বিশেষভাবে সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
উপসংহার : এ পর্যন্ত যেটুকু আলোচনা হলো তার সারমর্ম হিসেবে উপসংহারে বলতে চাই যে, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নকল্পে প্রাইমারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে অবহেলা না করে সেখানে কর্মরত চিকিৎসক, হাসপাতাল, রোগী সকলের সমস্যার সমাধান করতে হবে। এটা না করে শুধু প্রশাসনিক কঠোরতা বা চাপ সৃষ্টি করলে ইন্টার্নী চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা অর্জন ব্যাহত হবে এবং সঠিক মানের নবীন চিকিৎসক তৈরী হবে না। এতে মেধাবী ছাত্রছাত্রীগণ মেডিক্যাল শিক্ষাগ্রহণে অনাগ্রহী হয়ে পড়বে যার সুদূরপ্রসারী ফল হিসেবে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার মান নিম্নাভিমুখী হয়ে পড়বে।

লেখক : বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাবিদ।

The Post Viewed By: 228 People

সম্পর্কিত পোস্ট